দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসে দুই বোন রিম ও ওয়ালার কবর জিয়ারত করতে চেয়েছিলেন ফিলিস্তিনি সাংবাদিক মুহান্নাদ কিশতা। কিন্তু সেখানে গিয়ে তিনি এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হন, যেখানে মানচিত্র থেকেই হারিয়ে গেছে সেই কবরস্থান।
খান ইউনিসের মান এলাকায় অবস্থিত শেখ মোহাম্মদ কবরস্থান সাম্প্রতিক স্যাটেলাইট চিত্রে আর দেখা যায় না। কবরস্থানের জায়গাজুড়ে এখন রয়েছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর সামরিক স্থাপনা, তাঁবু ও সাঁজোয়া যান। গত বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারি ধারণ করা উচ্চ রেজুলেশনের স্যাটেলাইট চিত্রে এই পরিবর্তন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কিশতা বলেন, “এই যুদ্ধে মৃতরাও রেহাই পায়নি। যদি গিয়ে দেখি আমার বোনদের কবরের কোনো চিহ্ন নেই, তাহলে সেই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।”
নতুন স্যাটেলাইট চিত্রে দক্ষিণ গাজার বিস্তীর্ণ এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়ার চিত্র উঠে এসেছে। অসংখ্য আবাসিক এলাকা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, আর বাস্তুচ্যুত মানুষদের আশ্রয় নিতে হয়েছে উপকূলজুড়ে গড়ে ওঠা অস্থায়ী তাঁবুশিবিরে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ধ্বংসযজ্ঞে হাজারো মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং গাজার ভৌগোলিক চেহারাও নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে। মানবাধিকার সংস্থা ইউরো-মেড মনিটরের দাবি, গাজার ৯৪ শতাংশ কবরস্থান সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক স্থানকে সামরিক ব্যবহারের জন্য রূপান্তর করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছে সংস্থাটি।
বিশেষ করে রাফাহ শহরের ধ্বংসের মাত্রা এতটাই ব্যাপক যে অনেক এলাকা আলাদা করে চেনা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাল আল-সুলতানের সৌদি পাড়া, যেখানে একসময় শত শত আবাসিক ইউনিট ছিল, এখন কেবল ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
২০২৪ সালে রাফাহ অভিযান নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ দেখা দিলেও ইসরায়েল সেখানে সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখে। বর্তমানে শহরের বড় অংশ ধ্বংস হয়ে গেছে এবং অনেক এলাকায় শুধু রাস্তার অস্পষ্ট রেখাগুলোই আগের বসতির অস্তিত্বের সাক্ষ্য বহন করছে।
রাফাহর পশ্চিমাংশে অবস্থিত ‘সুইডিশ ভিলেজ’ নামের জনপদও প্রায় সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেছে। ১৯৬৫ সালে আন্তর্জাতিক সহায়তায় গড়ে ওঠা এই বসতিতে প্রায় ১,৩০০ মানুষ বাস করতেন। একসময় সমুদ্রনির্ভর অর্থনীতি ও জেলে সম্প্রদায়ের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এলাকাটি এখন ইসরায়েলি সামরিক ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে। পুরো এলাকায় মাত্র কয়েকটি ভবন এখনও দাঁড়িয়ে আছে।
একইভাবে রাফাহ সীমান্ত ক্রসিংয়ের আশপাশের অবকাঠামোতেও বড় পরিবর্তন এসেছে। যাত্রী টার্মিনাল, প্রশাসনিক ভবন ও মানবিক সহায়তা ব্যবস্থাপনার স্থাপনাগুলোর জায়গায় এখন দেখা যাচ্ছে সামরিক পর্যবেক্ষণ পোস্ট ও নিরাপত্তা অবকাঠামো।
খান ইউনিসের পূর্বাঞ্চলের বানি সুহাইলা, আবাসান ও আল-জানা এলাকায় নতুন সামরিক করিডোর তৈরি করা হয়েছে। যুদ্ধের আগে এসব এলাকা ছিল ঘনবসতিপূর্ণ কৃষি ও আবাসিক অঞ্চল, যেখানে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার মানুষের বসবাস ছিল। ব্যাপক বোমাবর্ষণ ও সামরিক কার্যক্রমের কারণে অধিকাংশ পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
কাতারের অর্থায়নে নির্মিত হামাদ সিটিও ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। প্রায় ১৩৫ মিলিয়ন ডলারের এই আবাসন প্রকল্পে আধুনিক বহুতল ভবন ও প্রায় তিন হাজার আবাসিক ইউনিট ছিল। একসময় প্রায় ১৫ হাজার মানুষের আবাসস্থল থাকা এলাকাটি এখন ভাঙা কংক্রিটের স্তূপ ছাড়া আর কিছু নয়।
শিক্ষা খাতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র উঠে এসেছে। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, গাজার ৯৭ শতাংশের বেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। এর ফলে কয়েক লাখ শিশু দীর্ঘ সময় ধরে আনুষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে রয়েছে।
গাজার বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনেকগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে অথবা বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়কেন্দ্রে রূপান্তরিত হয়েছে। ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব গাজা, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় এবং দক্ষিণ গাজার আল-ইসরা বিশ্ববিদ্যালয়সহ একাধিক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে।
কৃষি খাতও ভয়াবহ সংকটে রয়েছে। রাফাহ ও খান ইউনিসের কৃষিজমি একসময় গাজার খাদ্য উৎপাদনের প্রধান উৎস ছিল। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে গাজার ৫ শতাংশেরও কম কৃষিজমি ব্যবহারযোগ্য অবস্থায় রয়েছে। গ্রিনহাউস ধ্বংস এবং আবাদযোগ্য জমির ক্ষতির ফলে খাদ্যসংকট আরও তীব্র হয়েছে।
স্থানীয় সাংবাদিক ওলা আবু মোআমের বলেন, “খাবারের জন্য মানুষের সংগ্রাম প্রতিদিন আরও কঠিন হয়ে উঠছে। অনেক পরিবার ত্রাণকেন্দ্র থেকে খালি হাতে ফিরে যাচ্ছে।”
বর্তমানে গাজার প্রায় ২৩ লাখ মানুষের মধ্যে প্রায় ১৯ লাখই বাস্তুচ্যুত। বহু পরিবারকে একাধিকবার স্থান পরিবর্তন করতে হয়েছে এবং জনসংখ্যার বড় অংশ নিজেদের ঘরবাড়ি হারিয়েছে।
স্যাটেলাইট চিত্রে আল-মাওয়াসি এলাকার ঘনবসতিপূর্ণ তাঁবুশিবিরগুলোর বিস্তারও স্পষ্ট দেখা যায়। সমুদ্রতীরবর্তী এই অঞ্চল এখন হাজার হাজার বাস্তুচ্যুত মানুষের অস্থায়ী আশ্রয়ে পরিণত হয়েছে।
এদিকে ফাঁস হওয়া এক ভিডিওতে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী Benjamin Netanyahu-কে গাজায় সামরিক নিয়ন্ত্রণ আরও বিস্তারের নির্দেশ দিতে দেখা গেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, গাজায় ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উপস্থিতি যুদ্ধবিরতি চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে।
জাতিসংঘে দায়িত্ব পালনকারী কূটনীতিক নিকোলাই ম্লাদেনভ সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতি স্থায়ী রূপ নিলে মানবিক সংকট আরও গভীর হতে পারে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, গাজার ট্র্যাজেডি শুধু ধ্বংস হওয়া ভবন বা অবকাঠামোর গল্প নয়; এটি হারিয়ে যাওয়া পরিবার, স্মৃতি, শৈশব ও জীবনের গল্পও।
সাংবাদিক মুহান্নাদ কিশতার কথায়, “স্যাটেলাইট ধ্বংসস্তূপের ছবি দেখাতে পারে, কিন্তু যে মানুষ নিজের বাড়িতে ফিরে গিয়ে কিছুই খুঁজে পায় না, তার অনুভূতি কোনো ছবিতে ধরা পড়ে না।”



