tanaka
প্রচ্ছদঅন্যান্যসচিবালয়ের প্রবেশপাশে অনিয়ম, গোয়েন্দা প্রতিবেদনের পর তৎপর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়

সচিবালয়ের প্রবেশপাশে অনিয়ম, গোয়েন্দা প্রতিবেদনের পর তৎপর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়

প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু বাংলাদেশ সচিবালয়ের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। গোয়েন্দা সংস্থার এক প্রতিবেদনে সচিবালয়ে প্রবেশপাশ ইস্যু থেকে শুরু করে দর্শনার্থীদের প্রবেশে নানা অনিয়মের তথ্য উঠে আসার পর বিষয়টি নিয়ে তৎপর হয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের একাংশের দায়িত্ব পালনে গাফিলতি এবং নিয়ম না মেনে বিভিন্ন ব্যক্তির সচিবালয়ে প্রবেশের অভিযোগও রয়েছে প্রতিবেদনে।

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কিছু নন-ক্যাডার কর্মকর্তা এমন ব্যক্তিদের জন্য প্রবেশপাশ ইস্যু করছেন, যাদের ক্ষেত্রে তাদের এ ধরনের পাশ দেওয়ার এখতিয়ার নেই। পাশাপাশি সচিবালয়ের একাধিক প্রবেশপথে দায়িত্ব পালনকারী কিছু পুলিশ সদস্য দর্শনার্থীদের নিয়মবহির্ভূতভাবে প্রবেশের সুযোগ দিচ্ছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, কয়েকজন সংসদ সদস্যের সঙ্গে একাধিক নেতাকর্মী সচিবালয়ে প্রবেশ করছেন। এমনকি ২০২৪ সালের আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু ছাত্রনেতাও নিয়মিত পাশ ছাড়াই সচিবালয়ে প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছেন বলে গোয়েন্দা সংস্থার পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিয়মিত সচিবালয়ে অফিস করছেন—এমন পরিস্থিতিতে প্রশাসনের এই গুরুত্বপূর্ণ ও কেপিআইভুক্ত স্থাপনার নিরাপত্তা নিয়ে গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনের পর বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

ওটিপি যাচাই শুরু

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব মো. আব্দুস সাত্তার বিষয়টির সত্যতা যাচাইয়ের উদ্যোগ নিয়েছেন। প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে ২০ থেকে ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ইস্যু করা সব ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড (ওটিপি) সংগ্রহ করা হয়েছে।

এ ছাড়া নির্ধারিত সময়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ থেকে ইস্যু করা প্রবেশপাশের ওটিপিও সংগ্রহ করে যাচাই-বাছাই শুরু হয়েছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থার এসব ত্রুটি দূর করতে গোয়েন্দা সংস্থা, পুলিশ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দফায় দফায় বৈঠক করেছেন। এরই মধ্যে প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।

বিষয়টি স্বীকার করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, ‘স্বরাষ্ট্র সচিব হিসাবে আমি সব অবহিত।’ তিনি জানান, যেসব ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোর পুনরাবৃত্তি যাতে না হয়, সে বিষয়ে কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

নির্দেশনার বিস্তারিত জানতে চাইলে তিনি নিচের পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।

নিয়ম না মেনে পাশ ইস্যুর অভিযোগ

সচিবালয়ে দায়িত্ব পালনকারী একাধিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা যুগান্তরকে জানান, গত কয়েক মাসে পুলিশের মাঠপর্যায়ের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীকে নিয়মের বাইরে গিয়ে মানুষকে সচিবালয়ে প্রবেশের সুযোগ দিতে দেখা গেছে। বিষয়টি নিয়ে আপত্তি জানানোর পর পুলিশ সদস্যদের কেউ কেউ অসন্তুষ্ট হন। পরে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হলে সচিবালয়ের প্রবেশপথ পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া হয় গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের।

তাদের পর্যবেক্ষণে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার রাকিবুল হাসানের বিরুদ্ধে ২৭ সেপ্টেম্বর দুটি প্রবেশপাশ ইস্যু করার তথ্য পাওয়া যায়। তিনি নন-ক্যাডার কর্মকর্তা হলেও প্রবেশপাশ ইস্যু করার এখতিয়ার তার নেই বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া স্থানীয় সরকার বিভাগের নন-ক্যাডার কর্মকর্তা ও সিস্টেম অ্যানালিস্ট মো. শফিকুল ইসলাম ২৮ সেপ্টেম্বর একটি প্রবেশপাশ ইস্যু করেছেন বলেও গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তারও এ ধরনের পাশ ইস্যুর আইনগত এখতিয়ার নেই বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তার মন্ত্রিসভায় কোনো উপমন্ত্রী নিয়োগ না দিলেও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর একান্ত সচিব (পিএস) জাহাঙ্গীর আলম ২৭ সেপ্টেম্বর ‘উপমন্ত্রীর পিএস’-এর নামে একটি প্রবেশপাশ ইস্যু করেছেন। পাশটির নিচে পদবি হিসেবে ‘উপমন্ত্রীর পিএস’ লেখা রয়েছে।

গাড়িতে করে একাধিক ব্যক্তির প্রবেশ

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে সংসদ সদস্যদের সচিবালয়ে প্রবেশের বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, সংসদ সদস্য ও তার একান্ত সচিবের (পিএস) নামে প্রবেশপাশ থাকলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের গাড়িতে করে ৬-৭ জনকে নিয়ে সচিবালয়ে প্রবেশের ঘটনা ঘটছে।

সচিবালয়ে প্রবেশের পর গাড়িটি বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। পরে একই গাড়িতে আবারও একাধিক ব্যক্তিকে নিয়ে সচিবালয়ে প্রবেশের অভিযোগ রয়েছে। দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ সদস্যরা যাচাই করতে চাইলে তাদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করা হয় বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া সচিবালয়ের বিভিন্ন ভবনের লিফট ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নিয়ম না মানার অভিযোগ রয়েছে। আগে থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তিদের পাশ কাটিয়ে অনেকে জোর করে লিফটে ওঠেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রবেশপাশ বিক্রির অভিযোগ

সচিবালয়ের নিরাপত্তায় নিয়োজিত কিছু পুলিশ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে প্রবেশপাশ বিক্রির অভিযোগও গোয়েন্দা প্রতিবেদনে এসেছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, কিছু কর্মকর্তা বিভিন্ন সরকারের সময়েই এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন।

বিশেষ করে স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষকরা তাদের কাছ থেকে প্রবেশপাশ কিনে সচিবালয়ে প্রবেশ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

সাংবাদিকদের জন্য জাতীয় প্রেস ক্লাবের বিপরীতে একটি প্রবেশপথ রাখা হলেও সেখানে নিয়মিতভাবে সাংবাদিকদের প্রবেশে বাধা দেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে। বিশেষ করে বয়স্ক ও অসুস্থ সাংবাদিকদের বৃষ্টির মধ্যেও মূল গেট ব্যবহার করতে বাধ্য করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে, সচিবালয়ে কর্মরত বিভিন্ন দালাল বিনা পাশে ওই গেট দিয়ে নিয়মিত প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

ছাত্রনেতাদের অবাধ প্রবেশের অভিযোগ

২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দাবিতে আন্দোলনে থাকা কিছু ছাত্রনেতার সচিবালয়ে প্রবেশ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে গোয়েন্দা সংস্থা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে অনেক সময় কোনো প্রবেশপাশের প্রয়োজন হচ্ছে না। দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যরা তাদের সচিবালয়ে প্রবেশের সুযোগ দিচ্ছেন।

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উঠে আসা এসব তথ্য যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে। সচিবালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় প্রবেশপাশ ইস্যু ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আরও সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।