ইসলামের দৃষ্টিতে বরকত বলতে শুধু অর্থ-সম্পদের প্রাচুর্য বোঝায় না। জীবনে অল্প থাকলেও তাতে তৃপ্তি, পরিবারে ভালোবাসা, সুস্থতা ও মানসিক প্রশান্তি থাকা আল্লাহর বিশেষ বরকতের নিদর্শন হতে পারে। অনেক পরিবারে আয় ভালো থাকা সত্ত্বেও অশান্তি, পারিবারিক দ্বন্দ্ব ও অস্থিরতা দেখা যায়। কুরআন-সুন্নাহর আলোকে কিছু অভ্যাস ও আচরণ এ ধরনের পরিস্থিতির কারণ হতে পারে।
১. ঘরে ইবাদত ও জিকিরের চর্চা কমে যাওয়া
নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত ও আল্লাহর জিকির থেকে দূরে থাকা একটি পরিবারকে আধ্যাত্মিকভাবে দুর্বল করে দিতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
مَثَلُ الَّذِي يَذْكُرُ رَبَّهُ وَالَّذِي لاَ يَذْكُرُ رَبَّهُ مَثَلُ الحَيِّ وَالمَيِّتِ
‘যে ব্যক্তি তার প্রতিপালকের জিকির করে এবং যে জিকির করে না, তাদের দৃষ্টান্ত জীবিত ও মৃতের মতো।’
(সহিহ বুখারি: ৬৪০৭)
২. হারাম উপার্জন ও সন্দেহজনক অর্থ
সুদ, ঘুষ, প্রতারণা কিংবা অন্যায় পন্থায় অর্জিত অর্থ পরিবারে প্রবেশ করলে তা বাহ্যিক স্বচ্ছলতা আনলেও কল্যাণের নিশ্চয়তা দেয় না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
إِنَّ اللهَ طَيِّبٌ لَا يَقْبَلُ إِلَّا طَيِّبًا
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র এবং তিনি পবিত্র বস্তু ছাড়া গ্রহণ করেন না।’
(সহিহ মুসলিম: ১০১৫)
তাই পরিবারের উপার্জনের ক্ষেত্রে হালাল-হারামের বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি।
৩. গুনাহ ও আল্লাহর অবাধ্যতা
ঈমান ও তাকওয়ার সঙ্গে আল্লাহর রহমত ও বরকতের সম্পর্ক রয়েছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন—
وَلَوْ أَنَّ أَهْلَ الْقُرَىٰ آمَنُوا وَاتَّقَوْا لَفَتَحْنَا عَلَيْهِم بَرَكَاتٍ مِّنَ السَّمَاءِ وَالأَرْضِ
‘আর যদি জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত ও তাকওয়া অবলম্বন করত, তাহলে আমি তাদের জন্য আকাশ ও পৃথিবীর বরকতসমূহ খুলে দিতাম।’
(সুরা আল-আ‘রাফ: ৯৬)
৪. আত্মীয়দের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করা
অভিমান, অহংকার বা পারিবারিক বিরোধের কারণে আত্মীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া ইসলামে সমর্থিত নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার প্রতি গুরুত্ব দিয়েছেন।
হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি নিজের রিজিক প্রশস্ত হওয়া এবং জীবনে বরকত কামনা করে, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।
(সহিহ বুখারি ও মুসলিম)
৫. পরিবারের সদস্যদের মধ্যে অতিরিক্ত কলহ
স্বামী-স্ত্রী কিংবা পরিবারের অন্য সদস্যদের মধ্যে নিয়মিত ঝগড়া, কটু কথা, অপমান ও অসম্মান ঘরের শান্তি নষ্ট করতে পারে। মতপার্থক্য থাকলেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সংযম বজায় রাখা প্রয়োজন।
৬. আল্লাহর নিয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞতা
নিজের কাছে থাকা নিয়ামতগুলোর জন্য শুকরিয়া না করে সবসময় অন্যের সম্পদের সঙ্গে নিজের জীবন তুলনা করলে অসন্তুষ্টি বাড়তে পারে। আল্লাহ তাআলা বলেন—
لَئِن شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ
‘তোমরা কৃতজ্ঞ হলে অবশ্যই আমি তোমাদের আরও বাড়িয়ে দেব।’
(সুরা ইবরাহিম: ৭)
৭. অতিরিক্ত খরচ ও অপচয়
প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ব্যয় করা, লোক দেখানোর জন্য কেনাকাটা করা কিংবা সামর্থ্যের বাইরে জীবনযাপন পরিবারের ওপর আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে। তাই আয় অনুযায়ী ব্যয় করা এবং অপচয় থেকে বিরত থাকা গুরুত্বপূর্ণ।
৮. মিথ্যা ও প্রতারণার আশ্রয় নেওয়া
ব্যক্তিগত জীবন, ব্যবসা কিংবা কর্মক্ষেত্রে মিথ্যা বলা ও অন্যকে ঠকানোর মাধ্যমে অর্জিত সুবিধা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির কারণ হতে পারে। অন্যের অধিকার নষ্ট না করে সততা ও ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে চলা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
৯. দোয়া ও আল্লাহর ওপর ভরসা থেকে দূরে থাকা
জীবনের সংকটের সময় শুধু পার্থিব উপায়ের ওপর নির্ভর না করে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়াও জরুরি। নামাজ, দোয়া, ইস্তিগফার ও তাওয়াক্কুলের মাধ্যমে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করার চেষ্টা করা উচিত।
ঘরে শান্তি ও বরকতের জন্য যা করতে পারেন
নিয়মিত নামাজ আদায়, কুরআন তিলাওয়াত ও জিকিরের অভ্যাস গড়ে তোলা, হালাল উপার্জন নিশ্চিত করা, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ভালো আচরণ করা গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি অপচয় থেকে দূরে থাকা, ভুল হলে তওবা করা এবং আল্লাহর নিয়ামতের জন্য শুকরিয়া আদায় করাও জরুরি।
তবে জীবনে কোনো সমস্যা বা আর্থিক সংকট দেখা দিলেই সেটিকে নিশ্চিতভাবে ‘বরকত চলে যাওয়ার’ ফল বলা ঠিক নয়। জীবনের নানা পরীক্ষা ও সংকট স্বাভাবিকভাবেও আসতে পারে। ইসলামের শিক্ষা হলো—সঠিক আমল, হালাল জীবনযাপন, ধৈর্য এবং আল্লাহর ওপর ভরসার মাধ্যমে সেসব পরিস্থিতি মোকাবিলা করা।



