tanaka
প্রচ্ছদসর্বশেষ সংবাদঅর্থনীতিশিল্পখাতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহের আহ্বান ডিসিসিআইয়ের

শিল্পখাতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহের আহ্বান ডিসিসিআইয়ের

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সুদের হার কমানো এবং জ্বালানি নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে শিল্পখাতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশে নেমে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংগঠনটি।

শনিবার (২২ আগস্ট) রাজধানীর মতিঝিলে ডিসিসিআই অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এক সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ এসব কথা বলেন। ‘২০২৬ অর্থবছরের দ্বি-বার্ষিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি; প্রেক্ষিত রাজস্ব ও মুদ্রানীতি এবং বেসরকারিখাতের প্রত্যাশা’ শীর্ষক এ সেমিনারের আয়োজন করে ডিসিসিআই। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

সেমিনারে পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান ও ব্র্যাকের চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান, ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স (আইসিসি) বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান, পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) চেয়ারম্যান ড. জায়েদি সাত্তার, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান এবং ট্রান্সকম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সিমিন রহমান উপস্থিত ছিলেন।

বেসরকারি খাতের প্রত্যাশা তুলে ধরে তাসকীন আহমেদ বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ধীরে ধীরে সুদের হার কমিয়ে সহনীয় পর্যায়ে আনতে হবে। ইতোমধ্যে সুদের হার ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমানো হয়েছে। জ্বালানি নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে শিল্পখাতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।

তিনি বলেন, ঘোষিত ৫ হাজার কোটি টাকার সিএমএসএমই সহায়তা প্যাকেজ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন, স্বচ্ছ তদারকি এবং প্রকৃত উৎপাদনমুখী উদ্যোক্তাদের কাছে সহজে অর্থ পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, খেলাপি ঋণ কমানো এবং আর্থিক খাতের প্রতি জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। ব্যবসায়ীদের আস্থা ফিরিয়ে এনে স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

ডিসিসিআই সভাপতি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ঋণের উচ্চ ব্যয় এবং ব্যবসায়িক খরচ বেড়ে যাওয়ায় বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যে চাপ তৈরি হয়েছে। সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ২৫ দশমিক ৯ শতাংশ হলেও বেসরকারি খাতে তা মাত্র ৫ শতাংশে নেমে এসেছে, যা বিনিয়োগের জন্য উদ্বেগজনক।

তিনি বলেন, বাণিজ্য বাধা, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট, সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রতিবন্ধকতা, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং পণ্য পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যেও পড়েছে।

চলতি অর্থবছরের বাজেটে ব্যবসা সহজ করতে নেওয়া বিভিন্ন সংস্কারমূলক উদ্যোগের প্রশংসা করে তাসকীন আহমেদ বলেন, কোম্পানি নিবন্ধন প্রক্রিয়া ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে ৪৮ ঘণ্টায় সম্পন্ন করা, চামড়া, পাদুকা ও হোম টেক্সটাইল খাতে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা আরও তিন বছর বাড়ানো এবং রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতে ১০টি নতুন খাতকে শুল্কমুক্ত সুবিধার আওতায় আনার উদ্যোগ ইতিবাচক।

এ ছাড়া কর ব্যবস্থাপনায় অটোমেশন বাড়ানো, কাস্টমস প্রক্রিয়া দ্রুত করা এবং এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতি হিসেবে সম্ভাবনাময় দেশগুলোর সঙ্গে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ) ও মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) দ্রুত সম্পন্ন করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, বিনিয়োগ বাড়াতে দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকনির্ভরতা কমিয়ে পুঁজিবাজারকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। রপ্তানির ক্ষেত্রে লিড টাইম কমাতে শিল্পাঞ্চলগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন সেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) আওতায় লজিস্টিক ব্যবস্থার আধুনিকায়নে বড় বিনিয়োগ আকর্ষণের ওপরও জোর দেন তিনি।

সিএমএসএমই খাতের পরিস্থিতি তুলে ধরে তাসকীন আহমেদ বলেন, এ খাতে ঋণপ্রবাহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৫ শতাংশ। তবে বাস্তবে তা ১৬ দশমিক ৮ শতাংশে আটকে আছে। ব্যবসার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এ খাতে খেলাপি ঋণের হারও বেড়ে ২৪ দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রচলিত জামানতনির্ভর ঋণব্যবস্থার পরিবর্তে ডিজিটাল ক্রেডিট স্কোরিংয়ের মাধ্যমে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব দেন তিনি। পাশাপাশি সাশ্রয়ী দামে যন্ত্রপাতি কেনার জন্য বিশেষ তহবিল গঠনের কথাও বলেন।

জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের সৌরচালিত সেচব্যবস্থায় বিনিয়োগ সহজ করতে স্বল্পসুদের ঋণ চালুর প্রস্তাব দেন ডিসিসিআই সভাপতি। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি পর্যালোচনা করে অপ্রয়োজনীয় ভর্তুকির চাপ কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদে ভোক্তাদের জন্য স্থিতিশীল ও সহনীয় বিদ্যুতের দাম নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন।

তিনি আরও বলেন, বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানির মূল্য অস্থিরতা ও সরবরাহঝুঁকি মোকাবিলায় জ্বালানি আমদানির উৎস বহুমুখী করা প্রয়োজন। পাশাপাশি দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে দেশের অফশোর গ্যাস ও জ্বালানি অনুসন্ধান কার্যক্রম আরও জোরদার করতে হবে।

ডিসিসিআই সভাপতি বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা চ্যালেঞ্জপূর্ণ হলেও যথাযথ নীতিগত সমন্বয়, কার্যকর সংস্কার, জবাবদিহিমূলক বাস্তবায়ন এবং সরকারি-বেসরকারি খাতের নিবিড় অংশীদারত্বের মাধ্যমে এসব চ্যালেঞ্জকে সম্ভাবনায় রূপান্তর করা সম্ভব।