আয়কর রিটার্ন হলো করদাতার আয়, ব্যয়, সম্পদ ও দায়-দেনার তথ্য নির্ধারিত ফরমে উপস্থাপনের একটি প্রক্রিয়া। নাগরিক হিসেবে নির্ধারিত শর্ত পূরণ করলে আয়কর রিটার্ন দাখিল করা বাধ্যতামূলক। নিয়ম মেনে রিটার্ন দাখিল করলে বিভিন্ন সরকারি ও আর্থিক সেবাও গ্রহণ করা সহজ হয়।
২০২৬-২৭ করবর্ষের আয়কর রিটার্ন দাখিলের কার্যক্রম ১ জুলাই ২০২৬ থেকে শুরু হয়েছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, বছরজুড়েই রিটার্ন দাখিলের সুযোগ থাকছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন জমা দিলে করদাতারা প্রযোজ্য কর-সুবিধাও পেতে পারেন।
তবে অনেকেরই প্রশ্ন—কোন ধরনের আয় থাকলে রিটার্ন দাখিল করতে হবে? সাধারণভাবে একজন করদাতার আয় সাতটি প্রধান খাতে বিভক্ত। এসব খাতের যেকোনো একটি থেকে আয় থাকলে তা রিটার্নে যথাযথভাবে উল্লেখ করতে হয়। আয় দেখানোর ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও প্রমাণপত্র সংরক্ষণ করাও জরুরি।
যে ৭ খাতের আয় রিটার্নে দেখাতে হয়
১. চাকরি থেকে আয়
বেতন, ভাতা, বোনাস, সম্মানীসহ চাকরি বা চাকরিসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন উৎস থেকে পাওয়া আয় এ খাতের অন্তর্ভুক্ত।
২. ভাড়া থেকে আয়
বাড়ি, ফ্ল্যাট, দোকান, অফিস বা অন্য কোনো সম্পত্তি ভাড়া দিয়ে আয় হলে তা এ খাতে দেখাতে হয়।
৩. কৃষি থেকে আয়
কৃষিকাজ, ফসল উৎপাদন, কৃষিজ পণ্য উৎপাদন ও কৃষিসংশ্লিষ্ট অন্যান্য কার্যক্রম থেকে পাওয়া আয় এ শ্রেণিতে পড়ে।
৪. ব্যবসা থেকে আয়
ব্যবসা, পেশা, বাণিজ্য বা অন্য কোনো ব্যবসায়িক কার্যক্রম থেকে অর্জিত আয় এ খাতে অন্তর্ভুক্ত।
৫. মূলধনি আয়
কোনো সম্পদ বা বিনিয়োগ বিক্রি করে লাভ হলে নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী তা মূলধনি আয়ের আওতায় পড়তে পারে।
৬. আর্থিক পরিসম্পদ থেকে আয়
ব্যাংকের সুদ বা মুনাফা, লভ্যাংশ, সঞ্চয়পত্রের মুনাফা, বিভিন্ন সিকিউরিটিজ ও আর্থিক বিনিয়োগ থেকে পাওয়া আয় এ খাতে দেখানো হয়।
৭. অন্যান্য উৎস থেকে আয়
রয়্যালটি, লাইসেন্স ফি, সম্মানী, বিভিন্ন ধরনের ফি এবং নির্ধারিত অন্যান্য উৎস থেকে পাওয়া আয় এ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত।
আয় থাকলেই কি কর দিতে হবে?
এই সাত খাতের যেকোনো একটিতে আয় থাকলেই যে আয়কর পরিশোধ করতে হবে, বিষয়টি এমন নয়। আয়কর রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা এবং আয়কর পরিশোধ—দুটি আলাদা বিষয়। নির্ধারিত করমুক্ত সীমার মধ্যে আয় থাকলেও আইন অনুযায়ী কোনো কোনো ক্ষেত্রে রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক হতে পারে।
এ ছাড়া আয়কর নিবন্ধন বা টিআইএন থাকলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ক্ষেত্রে রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা তৈরি হতে পারে। আগের কোনো বছরে কর নির্ধারণ হয়ে থাকলে, ফার্মের অংশীদার হলে, কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার পরিচালক বা কর্মচারী হলে, সরকারি কর্মচারী হলে কিংবা আইনে নির্ধারিত অন্যান্য শর্ত পূরণ করলেও রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক হতে পারে।
২০২৬-২৭ করবর্ষে করমুক্ত আয়ের সীমা
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত নিয়ম অনুযায়ী সাধারণ পুরুষ করদাতার করমুক্ত আয়ের সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। নারী ও ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রবীণ করদাতাদের ক্ষেত্রে এই সীমা ৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা।
এ ছাড়া—
- তৃতীয় লিঙ্গ ও প্রতিবন্ধী করদাতার করমুক্ত আয়ের সীমা ৫ লাখ টাকা।
- গেজেটেড যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও জুলাই যোদ্ধাদের ক্ষেত্রে সীমা ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা।
- প্রতিবন্ধী সন্তান থাকলে পিতা-মাতা বা আইনগত অভিভাবক নিয়মিত করমুক্ত আয়ের সীমার অতিরিক্ত আরও ৫০ হাজার টাকা করমুক্ত সুবিধা পেতে পারেন।
তবে শুধু করমুক্ত সীমা বিবেচনা করেই রিটার্ন দাখিলের প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণ করা উচিত নয়। করদাতার আয়, পেশা, সম্পদ, লেনদেন এবং আইনে নির্ধারিত অন্যান্য শর্তের ওপর রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা নির্ভর করতে পারে। তাই নিজের ক্ষেত্রে রিটার্ন দাখিল করা বাধ্যতামূলক কি না, তা নিশ্চিত হতে প্রয়োজনে এনবিআরের সর্বশেষ নির্দেশনা বা সংশ্লিষ্ট কর কর্মকর্তার পরামর্শ নেওয়া উচিত।



