tanaka
প্রচ্ছদটপ নিউজমূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও অর্থের জোগানই বড় চ্যালেঞ্জ, অর্থনীতিবিদদের সতর্কতা

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও অর্থের জোগানই বড় চ্যালেঞ্জ, অর্থনীতিবিদদের সতর্কতা

দীর্ঘ ১১ বছর পর সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বহুল প্রতীক্ষিত নতুন পে-স্কেল বা বেতন কাঠামো ঘোষণা করেছে সরকার। এতে সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরলেও সামষ্টিক অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপ এবং সরকারের অর্থায়নে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা।

তাদের মতে, দেশে বিদ্যমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না এনে বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করা হলে মানুষের হাতে অতিরিক্ত অর্থের প্রবাহ বাড়বে। এতে পণ্য ও সেবার চাহিদা বৃদ্ধি পেয়ে বাজারে মূল্য আরও বাড়তে পারে। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়তে পারে খাদ্য, বাসাভাড়া, পরিবহন, চিকিৎসা ও শিক্ষা খাতে। ফলে নির্দিষ্ট আয়ের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অর্থনীতিবিদরা আরও বলছেন, সরকারের আর্থিক সক্ষমতা যখন চাপের মধ্যে, তখন নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করাও বড় চ্যালেঞ্জ হবে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, একবারে পুরোপুরি বাস্তবায়ন না করে ধাপে ধাপে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর করা হবে। ফলে অর্থের জোগানে বড় ধরনের চাপ তৈরি হবে না।

নতুন বেতন কাঠামোকে স্বাগত জানিয়ে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন পে-স্কেল আরও আগেই হওয়া প্রয়োজন ছিল। তবে এর প্রভাবে বেসরকারি খাতেও বেতন বাড়ানোর চাপ তৈরি হবে। মূল্যস্ফীতির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বেসরকারি খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে, এমনকি সংবাদমাধ্যমেও বেতন কাঠামো পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। একই সঙ্গে সরকারি খাতে অপ্রয়োজনীয় লোকবল কমানো গেলে সরকারের ব্যয়ও কমানো সম্ভব হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হবে। এতে সরকারের অনুন্নয়ন ব্যয় বাড়তে পারে। আর অনুন্নয়ন ব্যয় বাড়লে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, বিশেষ করে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বরাদ্দে কাটছাঁটের চাপ তৈরি হতে পারে।

তিনি আরও বলেন, অতীতে সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর পর মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা গেছে। এবারও এমন ঝুঁকি রয়েছে। তাই সরকারি চাকরিজীবীদের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের কর্মীদের বেতন সমন্বয়ের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

নতুন পে-স্কেল নিয়ে প্রতিক্রিয়ায় সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, প্রায় এক দশক আগে সরকারি কর্মচারীদের বেতন কাঠামো পরিবর্তন করা হয়েছিল। এরপর মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি বাসাভাড়া, শিক্ষা, চিকিৎসা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে সরকারি কর্মচারীদের বেতন সমন্বয়ের প্রয়োজন ছিল।

তবে বেতন বাড়লেই মূল্যস্ফীতি কতটা বাড়বে, তা নির্ভর করবে অর্থের উৎস, বেতন বৃদ্ধির হার, বাস্তবায়নের গতি, বাজারে পণ্য ও সেবার সরবরাহ এবং মুদ্রা ও রাজস্বনীতির মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের ওপর। বেতন বৃদ্ধির ফলে বাজারে যে অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি হবে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে খাদ্যসহ প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ বাড়াতে হবে বলেও তিনি মত দেন।

ড. ফাহমিদা খাতুনের মতে, বাড়তি বেতন-ভাতার অর্থ ব্যাংক ঋণ বা নতুন টাকা ছাপানোর মাধ্যমে জোগান দেওয়া উচিত হবে না। বরং কর ফাঁকি রোধ, করের আওতা সম্প্রসারণ এবং অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় কমিয়ে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করতে হবে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস)-এর সাবেক মহাপরিচালক ড. এম কে মুজেরী বলেন, নতুন পে-স্কেল ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন হলে সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির প্রভাব কিছুটা নিয়ন্ত্রিত থাকবে। তবে এর ফলে বেসরকারি খাতে বেতন বাড়ানোর চাপ তৈরি হবে।

তিনি বলেন, বর্তমানে নানা সংকটের কারণে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মীদের বেতন বাড়ানোর সক্ষমতা সীমিত। ফলে নতুন পে-স্কেলের প্রভাব শুধু সরকারি কর্মচারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; সাধারণ মানুষ এবং শিল্প ও ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের ওপরও এর পরোক্ষ চাপ তৈরি হতে পারে।

সরকারের আর্থিক সক্ষমতা প্রসঙ্গে ড. মুজেরী বলেন, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর দাবি দীর্ঘদিনের। এ বিষয়টি বিবেচনা করা ছাড়া সরকারের সামনে খুব বেশি বিকল্পও ছিল না। আর্থিক পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকলেও কর্মচারীদের বেতন সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তার কারণে সরকারকে এই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, বর্তমানে ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি কম। ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙ্গা না হলে রাজস্ব আদায়ও বাড়বে না। তাই নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের জন্য স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে বরাদ্দ কমানো উচিত হবে না। একই সঙ্গে বেতন-ভাতা পরিশোধে নতুন টাকা ছাপানোর পথও এড়িয়ে চলতে হবে।

তিনি আরও বলেন, বেসরকারি খাত বর্তমানে নানা চাপে রয়েছে এবং নতুন বিনিয়োগেরও তেমন দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি না ফিরলে বেসরকারি উদ্যোক্তারা কর্মীদের বেতন বাড়াতে আগ্রহী বা সক্ষম—কোনোটিই নাও হতে পারেন।

বাংলাদেশ নিটপণ্য প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, নতুন বেতন কাঠামো বেসরকারি খাতেও বেতন বাড়ানোর চাপ তৈরি করবে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সামগ্রিকভাবে বেতন বাড়ানোর মতো সক্ষমতা বেসরকারি খাতের অনেক প্রতিষ্ঠানের নেই।

তিনি বলেন, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির প্রয়োজন রয়েছে। তবে বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এর ফলে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়তে পারে। অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংকটের কারণে বেসরকারি খাত এমনিতেই চাপে রয়েছে। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে বৈশ্বিক যুদ্ধাবস্থার প্রভাবে রপ্তানিও কমেছে। ফলে এ সময়ে বেতন বৃদ্ধির অতিরিক্ত চাপ নেওয়া বেসরকারি খাতের জন্য কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

সরকারের ব্যাখ্যা

সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য নতুন পে-স্কেল নিয়ে অর্থনৈতিক চাপের আশঙ্কা কমিয়ে দেখানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেছেন, নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়নের ফলে মানুষের হাতে অর্থের পরিমাণ বাড়বে এবং এতে মূল্যস্ফীতির কিছুটা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তবে পে-স্কেল একবারে বাস্তবায়ন না করে ধাপে ধাপে কার্যকর করা হলে সেই ঝুঁকি সহনীয় পর্যায়ে রাখা সম্ভব হবে।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গনি বলেন, দীর্ঘ এক যুগের বেশি সময় ধরে সরকারি কর্মচারীদের বেতন না বাড়ায় তাদের জীবনযাত্রার মানে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল। অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও কর্মচারীদের জীবনযাত্রার বাস্তবতা ও সরকারের আর্থিক সক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতেই নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সব মিলিয়ে, নতুন পে-স্কেল সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য স্বস্তির বার্তা দিলেও এর সফল বাস্তবায়নে সরকারের সামনে দুটি বড় চ্যালেঞ্জ—মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং টেকসই অর্থায়নের ব্যবস্থা করা। অর্থনীতিবিদদের মতে, সঠিক অর্থের উৎস নিশ্চিত করা, উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়ানো এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় কার্যকর সংস্কার আনা না গেলে নতুন বেতন কাঠামোর সুফল আংশিকভাবে মূল্যস্ফীতির চাপে ম্লান হয়ে যেতে পারে।