tanaka

রিয়াদে হামলার সতর্কতা জারির পরপরই বিস্ফোরণের শব্দ

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে বিমান হামলার সতর্কতা জারির পরপরই ভোরে একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির তথ্য পাওয়া যায়নি।...
প্রচ্ছদসারাদেশদুর্গম পাহাড়ে সুপেয় পানি, স্বস্তি ফিরেছে ৫০ পাহাড়ি পাড়ায়

দুর্গম পাহাড়ে সুপেয় পানি, স্বস্তি ফিরেছে ৫০ পাহাড়ি পাড়ায়

বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ি জনপদে সুপেয় পানির সংকট দীর্ঘদিনের। খাবার পানি সংগ্রহ করতে অনেক বাসিন্দাকেই প্রতিদিন এক থেকে তিন কিলোমিটার পর্যন্ত দুর্গম পাহাড়ি পথ পাড়ি দিতে হতো। কোথাও আবার পাহাড়ের ঢাল বেয়ে শত শত ফুট নিচে নেমে ঝিরি, ঝর্ণা কিংবা ছড়া থেকে পানি সংগ্রহ করতে হতো। অনিরাপদ এসব পানির ওপরই নির্ভর করতে হতো পাহাড়ি-বাঙালি জনগোষ্ঠীর অনেক পরিবারকে।

বর্ষাকালে ঝিরি-ছড়ায় পানি পাওয়া গেলেও তা অনেক সময় মাটি, কাদা ও ময়লায় দূষিত থাকত। আর শুষ্ক মৌসুমে দেখা দিত তীব্র পানির সংকট। পানি সংগ্রহের এই কাজে সবচেয়ে বেশি সময় ও শ্রম ব্যয় করতে হতো নারী ও শিশুদের। দুর্গম পাহাড়ি পথ দিয়ে ভারী কলসি কাঁধে পানি বহনের সময় তাদের নানা ধরনের ঝুঁকিও নিতে হতো।

তবে বিভিন্ন প্রযুক্তিনির্ভর পানি সরবরাহ ব্যবস্থা চালুর ফলে বান্দরবানের প্রত্যন্ত পাহাড়ি জনপদে বদলাতে শুরু করেছে সেই চিত্র। গভীর নলকূপ, গ্র্যাভিটি ফ্লো সিস্টেম (জিএফএস), রিংওয়েল ও রেইন ওয়াটার হারভেস্টিংসহ বিভিন্ন প্রযুক্তির মাধ্যমে দুর্গম এলাকায় নিরাপদ পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এতে জেলার অন্তত ৫০টি প্রত্যন্ত পাড়ার বাসিন্দারা বাড়ির কাছেই সুপেয় পানি পাচ্ছেন।

সম্প্রতি বান্দরবান সদর উপজেলার কয়েকটি দুর্গম ইউনিয়নের পাহাড়ি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, পাহাড়ের চূড়ায় বসবাসকারী মানুষের বাড়ির পাশেই স্থাপন করা হয়েছে পানির কল। সেখান থেকেই তারা খাবার পানি সংগ্রহ করছেন। রান্না, গোসল, কাপড় ধোয়া ও গৃহস্থালির অন্যান্য কাজেও ব্যবহার করছেন সেই পানি। কোনো কোনো এলাকায় পানির সহজলভ্যতার কারণে কৃষি ও সেচের কাজেও এর ব্যবহার বাড়ছে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের ‘বিভিন্ন প্রযুক্তির মাধ্যমে সুপেয় পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন প্রকল্প’-এর আওতায় এসব কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, এটি শুধু একটি পানি সরবরাহ প্রকল্প নয়; দীর্ঘদিনের পানি সংকট থেকে মুক্তির পাশাপাশি তাদের জীবনযাত্রায়ও পরিবর্তন আনছে।

বাড়ির পাশেই পানির কল

জেলা শহর থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরে পাহাড়ি গ্রাম টিএনটি মারমা পাড়া। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় ৬০ বছর বয়সী মাচিং মারমা বাড়ির পাশের পানির কল থেকে গোসল ও কাপড় ধোয়া শেষে কলসিতে পানি নিয়ে ঘরে ফিরছেন। এক বছর আগেও এমন সুবিধা তার কাছে ছিল অকল্পনীয়।

মাচিং মারমা বলেন, আগে খাবার পানি, গোসল ও কাপড় ধোয়ার জন্য পাড়া থেকে প্রায় ৮০০ ফুট নিচে পাহাড়ি পথে যেতে হতো। এখন বাড়ির পাশেই পানি পাওয়ায় সেই কষ্ট আর নেই।

পাড়াটির বাসিন্দা উয়ই চিং মারমা বলেন, পানি সহজলভ্য হওয়ায় সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন এসেছে নারীদের জীবনে। আগে দিনের বড় একটি সময় পানি সংগ্রহে চলে যেত। এখন সেই সময় পরিবারের অন্যান্য কাজ, সন্তানদের দেখাশোনা ও আয়মূলক কর্মকাণ্ডে ব্যয় করা সম্ভব হচ্ছে।

মানুচিং মারমা জানান, পাঁচ-ছয় মাস আগে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর তাদের পাড়ায় একটি নলকূপ স্থাপন করে। পরে পাইপলাইনের মাধ্যমে বাড়ির পাশে পানির কল বসানো হয়। এখন পাড়ার বাসিন্দারা সহজেই সুপেয় পানি সংগ্রহ করতে পারছেন।

পাড়ার কারবারি অংবাই মারমা জানান, আগে তাদের এলাকার মানুষের সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল পানির সংকট। বর্তমানে একটি গভীর নলকূপ ও পাইপলাইনের মাধ্যমে পাহাড়ি-বাঙালি মিলিয়ে প্রায় ৮০টি পরিবারের কয়েকশ মানুষ বাড়ির কাছেই সুপেয় পানি পাচ্ছেন।

বিভিন্ন প্রযুক্তিতে পানি সরবরাহ

বান্দরবান জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়, বিএডিসি ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের অর্থায়নে ‘স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়ন ও নিরাপদ পানি সরবরাহ প্রকল্প’-এর আওতায় প্রায় ৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে এসব কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বান্দরবানে ১২টি গ্র্যাভিটি ফ্লো সিস্টেম (জিএফএস) মেরামতের পাশাপাশি নতুন করে আরও ১০টি জিএফএস নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়া ৫৮৩টি রিংওয়েল নির্মাণ, ১৪০টি রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং সিস্টেম স্থাপন, ৫০টি গভীর নলকূপ নির্মাণ এবং পাড়া-ভিত্তিক পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে ৫০টি প্রোডাকশন টিউবওয়েল স্থাপন করা হয়েছে।

স্যানিটেশন সুবিধা সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে বিভিন্ন এলাকায় ৩০টি স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেটও নির্মাণ করা হয়েছে।

বান্দরবান জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপ-সহকারী প্রকৌশলী সাইদুল ইসলাম বলেন, স্থানীয় বাসিন্দাদের আবেদনের ভিত্তিতে জেলার অন্তত ৫০টি পাড়ায় নিরাপদ পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের বান্দরবান জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী অনুপম দে বলেন, ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের কারণে দুর্গম পাহাড়ি এলাকার সব জায়গায় একই প্রযুক্তি ব্যবহার করা সম্ভব নয়। তাই স্থানভেদে ভিন্ন ভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হয়েছে।

তিনি বলেন, প্রায় ৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে পুরোনো গ্র্যাভিটি ফ্লো সিস্টেম মেরামতের পাশাপাশি নতুন জিএফএস, রিংওয়েল, রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং সিস্টেম, গভীর নলকূপ ও পাড়া-ভিত্তিক পানি সরবরাহ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। এতে জেলার অন্তত ৫০টি পাড়ার মানুষ সরাসরি উপকৃত হচ্ছেন।

তিনি আরও জানান, টানা বৃষ্টি ও সাম্প্রতিক বন্যার কারণে কিছু স্থাপনার প্লাস্টার ও রঙের কাজ বাকি থাকলেও প্রকল্পের মূল কার্যক্রম ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে।