ভারতের ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর প্রায় ১৬ মাস পরও ক্ষয়ক্ষতি পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি পাকিস্তানের সারগোধার পিএএফ বেস মুসহাফ। উচ্চ-রেজল্যুশনের সাম্প্রতিক স্যাটেলাইট চিত্রে ঘাঁটির একটি রানওয়ে ও ট্যাক্সি-ট্র্যাকের সংযোগস্থলে মেরামত ও পুনর্নির্মাণের কাজ চলতে দেখা গেছে।
সারগোধার পিএএফ বেস মুসহাফ পাকিস্তানের লাহোর থেকে প্রায় ১৭২ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে এবং অমৃতসরসংলগ্ন ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত।
গত ১২ সেপ্টেম্বরের স্যাটেলাইট চিত্রে রানওয়ে ও ট্যাক্সি-ট্র্যাকের সংযোগস্থলের বাঁ পাশে একটি অন্ধকার ও অনিয়মিত অংশ দেখা যায়। আশপাশের পিচের রং ও গঠনের তুলনায় অংশটি ভিন্ন হওয়ায় সেখানে নতুন করে খনন বা পুনর্নির্মাণের কাজ চলছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ওই অংশের কাছাকাছি একটি লাল রঙের যানও দেখা গেছে।
চিত্রটিতে রানওয়ের বিভিন্ন অংশে পর্যায়ক্রমে মেরামতের কাজ চলার ইঙ্গিত রয়েছে। একটি অংশের পৃষ্ঠতল অপেক্ষাকৃত গাঢ় ও মসৃণ, যা সম্পন্ন কাজের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। অন্যদিকে রানওয়ের আরেকটি অংশ এখনো পুরোপুরি পুনর্নির্মাণ বা পরিষ্কার করা হয়নি।
স্যাটেলাইট বিশ্লেষণে আরও দেখা গেছে, আগে মেরামত করা একটি আঘাতের স্থান আবারও খনন করে রানওয়ের উত্তর অংশে কাজ করা হচ্ছে। আগের জোড়াতালি দেওয়া অংশের ভেতরের মাটি পর্যন্ত খনন করা হয়েছে। এতে ধারণা করা হচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত অংশটি গভীরতা পর্যন্ত পুনর্গঠনের প্রস্তুতি চলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রাথমিক মেরামতের পর উপরিভাগে অসমানতা, বসে যাওয়া কিংবা অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। এসব কারণে আগের মেরামত করা অংশ সরিয়ে নতুন করে কাজ করার প্রয়োজন হয়ে থাকতে পারে।
‘অপারেশন সিঁদুর’-এর সময় ভারতীয় বিমানবাহিনীর বিমান অভিযানের মহাপরিচালকের দায়িত্বে থাকা অবসরপ্রাপ্ত এয়ার মার্শাল এ কে ভারতী দাবি করেছেন, রানওয়ের কেন্দ্রীয় অংশে ৩০০ কিলোমিটারেরও বেশি দূর থেকে হামলা চালানো হয়েছিল। তাঁর ভাষ্য, এটি ভারতীয় বিমানবাহিনীর নির্ভুল লক্ষ্যভেদের উদাহরণ।
এর আগে চলতি বছরের ২৮ আগস্টের একটি স্যাটেলাইট চিত্রেও মূল আঘাতের স্থানটি আপাতদৃষ্টিতে মেরামত করা হয়েছে বলে দেখা যায়। তবে ওই অংশে দৃশ্যমান জোড়াতালি দেওয়া মেরামতের চিহ্ন থেকে ধারণা করা হয়েছিল, নিচের মাটি হয়তো পুরোপুরি শক্ত হয়নি এবং ভারী বিমান চলাচলের উপযোগী সক্ষমতা ফিরে পায়নি। বর্তমানে ওই অংশেই আবারও কাজ চলছে।
গত বছরের ১০ মে ধারণ করা স্যাটেলাইট চিত্রে পিএএফ বেস মুসহাফের প্রায় ৩ হাজার ২০০ মিটার দীর্ঘ প্রধান রানওয়েতে ভারতীয় বিমানবাহিনীর হামলার দুটি আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, রানওয়ে ও ট্যাক্সি-ট্র্যাকের সংযোগস্থলে সৃষ্ট একটি গর্ত ছিল প্রায় ৮ থেকে ৯ মিটার প্রশস্ত এবং ৪ থেকে ৫ মিটার গভীর। গর্তের আশপাশে অ্যাসফাল্ট ও কংক্রিটের টুকরো ছড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। বেশ কয়েকটি স্থলযানকেও ওই এলাকার কাছে অবস্থান করতে দেখা যায়। রানওয়ের দ্বিতীয় আঘাতের স্থানটি প্রথমটি থেকে প্রায় ৬৬০ মিটার দূরে ছিল।
মুসহাফ ঘাঁটিতে হামলায় ঠিক কী ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল, সে বিষয়ে ভারতীয় বিমানবাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। তবে গর্তের আকার ও গভীরতা দেখে কিছু বিশ্লেষক এটিকে সুখোই-৩০ এমকেআই যুদ্ধবিমান থেকে নিক্ষেপযোগ্য আকাশ-থেকে-ভূমি ‘ব্রাহ্মস’ ক্ষেপণাস্ত্রের সম্ভাব্য ব্যবহারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করছেন।
গত বছরের ১০ মে ভারতীয় বিমানবাহিনী পাকিস্তানের বিভিন্ন বিমানঘাঁটি, রাডার ও আকাশ প্রতিরক্ষা স্থাপনায় হামলা চালানোর দাবি করে। এর মধ্যে সারগোধার মুসহাফ বিমানঘাঁটিতেও সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টার মধ্যে হামলা চালানো হয় বলে ভারতীয় পক্ষ জানায়।
এ ছাড়া ওই দিন পাকিস্তানের একটি এয়ারবোর্ন আর্লি ওয়ার্নিং অ্যান্ড কন্ট্রোল (AEW&C) বা গোয়েন্দা বিমান ভূপাতিত করার দাবিও করে ভারতীয় বিমানবাহিনী। একই দিন বিকেল ৩টা ৩৫ মিনিটে পাকিস্তানের সামরিক অভিযানের মহাপরিচালক তাঁর ভারতীয় সমকক্ষের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। এরপর দুই পক্ষ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয় এবং বিকেল ৫টা থেকে তা কার্যকর হয়।



