কসময় ভাতের সঙ্গে ডিম, ব্রয়লার মুরগি, পাঙাশ কিংবা তেলাপিয়া মাছই ছিল নিম্ন আয়ের মানুষের সাশ্রয়ী আমিষের প্রধান উৎস। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এসব খাবারের দাম বেড়ে যাওয়ায় তা অনেকের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। সংসারের ব্যয় সামলাতে গিয়ে নিম্ন আয়ের অনেক পরিবার খাবারের তালিকা থেকে ডিম, মাংস ও মাছের পরিমাণ কমিয়ে দিচ্ছে।
রাজধানীর বিভিন্ন খুচরা বাজারে শুক্রবার দেখা গেছে, ফার্মের ডিম প্রতি ডজন ১৫০ থেকে ১৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাড়া-মহল্লার দোকানে একই ডজন ডিমের দাম উঠেছে ১৬০ টাকা পর্যন্ত। ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ১৯০ থেকে ২০০ টাকা। এছাড়া সোনালি মুরগি ৩১০-৩২০, হাইব্রিড ২৯০-৩০০ এবং লেয়ার মুরগি ৩৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
মাংসের বাজারেও স্বস্তি নেই। খুচরা পর্যায়ে গরুর মাংসের দাম কেজিপ্রতি ৮৫০ টাকা, যা কিছুদিন আগেও ছিল প্রায় ৮০০ টাকা। খাসির মাংস কিনতে গুনতে হচ্ছে কেজিপ্রতি প্রায় ১ হাজার ৩০০ টাকা। আগে এর দাম ছিল ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ২৫০ টাকা।
কম দামের মাছ হিসেবে পরিচিত পাঙাশ ও তেলাপিয়াও এখন কেজিপ্রতি ২৩০ থেকে ২৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ফলে সীমিত আয়ের মানুষের জন্য এসব মাছও আগের মতো সহজলভ্য থাকছে না।
শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে পরিবারের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে এসেছিলেন ভ্যানচালক আমিনুল ইসলাম সজিব। তিনি বলেন, সারা রাত ভ্যানে পণ্য সরবরাহ করে প্রায় ৬৫০ টাকা আয় করেছেন। সেই টাকা দিয়েই পরিবারের বাজার করতে হয়।
তিনি বলেন, ‘আগে এক থালা ভাতের সঙ্গে একটি ডিম খেয়ে নিতে পারতাম। এখন ডিম কিনতেও কষ্ট হয়। গরুর মাংস কেনার সামর্থ্য নেই। ব্রয়লার মুরগিও অনেক দিন ধরে কেনা হয় না। মাছ কিনতে গেলে পাঙাশ বা তেলাপিয়ার ওপরই নির্ভর করতে হয়। কিন্তু সেগুলোর দামও এখন বেশি। মেয়েটা মাংস খেতে চায়, কিন্তু সীমিত আয়ে সংসারের অন্য খরচ মিটিয়ে তা কেনা সম্ভব হয় না।’
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, বাজারে প্রায় সব ধরনের নিত্যপণ্যের দাম বেশি থাকায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষ চাপে পড়েছেন। আগে অনেক পরিবার ডিমের মাধ্যমে তুলনামূলক কম খরচে আমিষের চাহিদা পূরণ করত। এখন ডিম, ব্রয়লার মুরগি ও কম দামের মাছের দামও বেড়ে যাওয়ায় অনেকে এসব খাবার কেনা কমিয়ে দিয়েছেন।
তার মতে, এর প্রভাব মানুষের পুষ্টির ওপরও পড়তে পারে। বাজারে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণ খতিয়ে দেখতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি আরও বাড়ানো প্রয়োজন।
এদিকে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, ডিমের দাম যৌক্তিক ও সহনীয় পর্যায়ে রাখতে বাজার তদারকি করা হচ্ছে। উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিটি পর্যায়ে ক্রয়-বিক্রয়ের যথাযথ রসিদ সংরক্ষণ না করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, পোলট্রি পণ্যের সরবরাহ ও মূল্য সংযোজন ব্যবস্থার প্রতিটি স্তর বিশ্লেষণ করে উৎপাদন, সরবরাহ ও চাহিদার প্রকৃত চিত্র নিরূপণ করা প্রয়োজন। কারসাজির মাধ্যমে ডিম ও মুরগির দাম বাড়ানোর চেষ্টা হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শুক্রবার রাজধানীর বাজারগুলোতে মাছের দামও ছিল চড়া। মানভেদে চিংড়ি ৮০০-৯০০, পাবদা ৩৫০-৪৫০, বড় রুই ৪৫০-৫০০ এবং ট্যাংরা ৭০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া ভেটকি ৪০০-৫৫০, মৃগেল ২৫০-৩০০, বাইম ৭০০-৮০০, দেশি কই ৬০০-৮০০ এবং চাষের কই ২৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। পোয়া ২৬০, শোল ৭০০ এবং চাষের শিং মাছ আকারভেদে ৩০০-৪৫০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।
সব মিলিয়ে বাজারে নিত্যপণ্যের বাড়তি দামের চাপ সবচেয়ে বেশি অনুভব করছেন সীমিত আয়ের মানুষ। আয় না বাড়লেও খাবারের খরচ বাড়ায় অনেক পরিবারকে প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবারের পরিমাণ কমিয়ে সংসারের ব্যয় সামলাতে হচ্ছে।



