জুলাই গণহত্যার বিচার, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, গ্যাস-বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিরসনসহ ছয় দফা দাবিতে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত লংমার্চ করেছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। শনিবার সকাল ৭টার দিকে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বর থেকে শুরু হওয়া এই কর্মসূচি রাতে চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক লালদীঘি ময়দানে সমাবেশের মধ্য দিয়ে শেষ হয়।
লংমার্চের পথে নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, ফেনী ও চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে একাধিক পথসভা করেন জোটের নেতারা। এসব সমাবেশে তারা বলেন, এটি কোনো দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নের কর্মসূচি নয়; বরং জনগণের দাবি আদায়ের আন্দোলন। সরকার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থ হলে আন্দোলনের মাধ্যমেই দাবি আদায় করা হবে।
নেতারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ছয় দফা দাবি বাস্তবায়নে বাধা দেওয়া হলে কিংবা সরকার গড়িমসি করলে এই ছয় দফা এক দফায় পরিণত হবে।
জনগণের পক্ষে রাজপথে : শফিকুর রহমান
লংমার্চের বিভিন্ন সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর স্বার্থে তারা রাজপথে নামেননি। বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের দাবি আদায়ের জন্যই এই কর্মসূচি।
তিনি বলেন, জনগণের অধিকার নিয়ে ছিনিমিনি খেললে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। চাঁদাবাজি ও দুর্নীতিতে মানুষ অতিষ্ঠ। কোথাও গ্যাস নেই, পানি নেই, বিদ্যুৎ নেই; অথচ নিয়মিত বিল দিতে হচ্ছে। কোথাও আবার ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিলও আসছে।
সিফাতের প্রসঙ্গ তুলে জামায়াত আমীর বলেন, ওই তরুণ যে ভাষায় প্রতিবাদ করেছে, তা সমর্থন না করলেও যে বিষয় নিয়ে সে প্রতিবাদ করেছে, সেই বিষয়ে দেশের মানুষ ক্ষুব্ধ। প্রয়োজন হলে বাংলাদেশের মানুষও সিফাতের মতো প্রতিবাদে গর্জে উঠবে।
সিফাতকে মুক্তি দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, তাকে ভালোয় ভালোয় ছেড়ে দেওয়া উচিত। অন্যথায় অতীতের নূর হোসেন, ইয়াসমিন ও ডা. মিলনের আন্দোলনের কথা স্মরণ রাখতে হবে। কখন কোন ঘটনা বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তা কেউ বলতে পারে না।
বাধা এলে ছয় দফা এক দফা : নাহিদ ইসলাম
লংমার্চের উদ্বোধনী সমাবেশে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, চট্টগ্রাম অভিমুখী লংমার্চে কোনো ধরনের বাধা এলে ছয় দফা দাবি এক দফায় পরিণত হবে।
তিনি বলেন, এই লংমার্চ আপামর জনগণের। সরকার বাধা দিলে সব প্রতিবন্ধকতা উপেক্ষা করে চট্টগ্রামে পৌঁছানো হবে। তখন ১১ দলের ছয় দফা এক দফা দাবিতে রূপ নেবে।
নাহিদ ইসলাম বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট এক দফা দাবিতে সারাদেশের মানুষ ঢাকামুখী লংমার্চ করেছিল। এর মাধ্যমে স্বৈরাচারের পতন ঘটানো হয়। এবার ঢাকা থেকে চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন বিভাগে লংমার্চের লক্ষ্য হচ্ছে নতুন করে স্বৈরাচারী প্রবণতার পথ রুদ্ধ করা।
তিনি আরও বলেন, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে এই আন্দোলন। তেল, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়ানোর যেকোনো অপচেষ্টার বিরুদ্ধেও তারা মাঠে নেমেছেন।
শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায় : অলি আহমেদ
এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ বীর বিক্রম বলেন, এত ভোরে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে ১১ দলীয় ঐক্যের নেতাকর্মীরা যেভাবে রাজপথে নেমেছেন, বাংলাদেশের অন্য কোনো রাজনৈতিক দল তা করতে পারবে না।
তিনি বলেন, চাঁদাবাজ ও মাস্তানদের ভোট দিলে দেশ ভালোভাবে চলতে পারে না—বর্তমান পরিস্থিতিই তার প্রমাণ। শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে জনগণের দাবি আদায় করা হবে।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা মামুনুল হক বলেন, সরকার জাতির সঙ্গে প্রতারণা করেছে। ক্ষমতায় বসে কেউ যদি জনগণকে ভুল পথে পরিচালিত করার চেষ্টা করে, তাহলে তাকে ক্ষমতা থেকে সরাতে আন্দোলনকারীদের হাত একটুও কাঁপবে না।
গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবি
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, জনগণের দুর্ভোগ কমাতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। বরং দিন দিন পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করে সরকার জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করেছে এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে।
তিনি বলেন, সরকারকে সংসদে নিজেদের ভুল স্বীকার করে সংবিধান সংস্কারের উদ্যোগ নিতে হবে। নতুন করে যারা স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে চাইছে এবং যারা গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করছে না, তাদের বিরুদ্ধেই এই লংমার্চ।
সমাবেশে এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেনসহ ১১ দলীয় ঐক্যের অন্যান্য নেতারাও বক্তব্য দেন।
নারায়ণগঞ্জে জনসভা
সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে লংমার্চের বহর চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে। সকাল ৯টার দিকে বহরটি নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের শিমরাইল ট্রাকস্ট্যান্ড এলাকায় পৌঁছালে সেখানে পথসভা অনুষ্ঠিত হয়।
পথসভায় ডা. শফিকুর রহমান বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা প্রতিষ্ঠা এবং গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিরসনের দাবিতে তারা রাজপথে নেমেছেন। সরকার জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি বলেন, ১১ দলীয় ঐক্য জনগণের পাশে রয়েছে। ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার মাধ্যমে ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা হবে।
নাহিদ ইসলাম বলেন, লংমার্চ সফল হবে। তেল ও গ্যাসের দাম কমানো না হলে সরকারকে ক্ষমতা ছাড়তে হবে।
কুমিল্লায় বিভাগ বাস্তবায়নের দাবি
কুমিল্লার পদুয়া বাজার বিশ্বরোডের পথসভায় ডা. শফিকুর রহমান কুমিল্লা বিভাগ বাস্তবায়নের দাবি জানান।
তিনি বলেন, কুমিল্লা বিভাগ নিয়ে সরকারকে আর টালবাহানা করা উচিত নয়। ১৯৯৪ সাল থেকে কুমিল্লা বিভাগ বাস্তবায়নের দাবি রয়েছে। পাশাপাশি বৃহত্তর নোয়াখালীর মানুষও বিভাগ দাবি করছেন। তাদের দাবিও বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সমালোচনা করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজের মন্ত্রণালয়ের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখছেন।
ফেনীতে জনস্রোত
ফেনীর মহিপালে অনুষ্ঠিত পথসভায় ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানি সংকটসহ জনগণের নানা সমস্যা সমাধানে সরকার ব্যর্থ হয়েছে।
তিনি বলেন, বিদ্যুৎ নেই, অথচ সংসদে দাঁড়িয়ে বলা হচ্ছে কোনো সংকট নেই। যারা সংসদে দাঁড়িয়ে বাস্তবতা অস্বীকার করেন, তাদের দিয়ে জনগণের সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, মানুষ নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি চায়। সহনীয় দ্রব্যমূল্য চায়। শহীদ ওসমান হাদি, শাপলা গণহত্যা, পিলখানা এবং জুলাই গণহত্যাসহ বিভিন্ন ঘটনার বিচারও চায়। প্রশ্ন হচ্ছে—সরকার এসব দাবি বাস্তবায়ন করবে কি না।
গণভোটের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জনগণ দুটি ভোট দিয়েছে—একটি সংসদ নির্বাচনের জন্য এবং অন্যটি দেশ সংস্কারের জন্য। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে তা বাস্তবায়নের বিষয়ে সরকারি ও বিরোধী দল একমত ছিল। কিন্তু ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও তা বাস্তবায়ন করা হয়নি।
‘নতুন করে ফ্যাসিবাদের প্রতিধ্বনি শুনছি’
শেখ হাসিনার আমলের আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের প্রসঙ্গ তুলে জামায়াত আমীর বলেন, অতীতে যারা ক্ষমতার প্রভাবশালী অবস্থানে ছিলেন, তাদের অনেকেই এখন নেই। বাংলাদেশই তাদের একমাত্র ঠিকানা—এমন মন্তব্য করে তিনি বলেন, নানা চাপ ও নির্যাতনের মধ্যেও তারা দেশ ছাড়েননি।
তিনি বলেন, আকাশ থেকে কালো বজ্রপাত নেমে এলেও তারা জনগণের সঙ্গে দেশেই থাকবেন। কোনো দলীয় দাবি নিয়ে নয়, নতুন করে ফ্যাসিবাদের প্রতিধ্বনি শোনা যাচ্ছে বলেই তারা রাজপথে নেমেছেন।
সাড়ে ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানে বহু মানুষকে জীবন দিতে হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখন আবার চোখ রাঙানো হচ্ছে। তারা শুধু আল্লাহকে ভয় করেন।
সরকারের দলীয়করণের সমালোচনা করে তিনি বলেন, সব জায়গায় দলীয়করণ করা হলে বিরোধী দল নীরব থাকবে না। যেখানে অনিয়ম ও দলীয়করণের চেষ্টা হবে, সেখানেই প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে।
পথে পথে নেতাকর্মীদের ব্যাপক উপস্থিতি
ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত লংমার্চকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন এলাকায় নেতাকর্মী ও সমর্থকদের ব্যাপক উপস্থিতি দেখা যায়। শাপলা চত্বর থেকে যাত্রা শুরুর পর যাত্রাবাড়ী, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, ফেনী ও মিরসরাইসহ বিভিন্ন স্থানে সড়কের দুই পাশে দলীয় পতাকা, ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড হাতে মানুষ জড়ো হন।
পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর, কুমিল্লার পদুয়া বাজার, ফেনীর মহিপাল ও চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে পথসভা অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে ফেনীর পথসভা বড় ধরনের জনসমাগমে রূপ নেয়।
আয়োজকদের দাবি, লংমার্চের বহর চট্টগ্রামের দিকে যত এগিয়েছে, বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার নেতাকর্মীরা নতুন নতুন যানবাহন নিয়ে তাতে যুক্ত হয়েছেন।
লংমার্চ ঘিরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করা হয়। নিরাপত্তার পাশাপাশি মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দায়িত্ব পালন করে।
রাতে চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক লালদীঘি ময়দানে সর্বশেষ সমাবেশের মধ্য দিয়ে কর্মসূচির সমাপ্তি ঘটে। সেখানে ১১ দলীয় ঐক্যের নেতারা আবারও ঘোষণা দেন—জনগণের ছয় দফা দাবি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত তারা রাজপথ ছাড়বেন না।



