ঠাকুরগাঁও: ঠাকুরগাঁওয়ের উন্নয়নকে আরও গতিশীল করতে কৃষিভিত্তিক শিল্প স্থাপন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত শিবগঞ্জ বিমানবন্দর চালুর উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) বিকেলে ঠাকুরগাঁও বড়মাঠে আয়োজিত গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন রাষ্ট্রপতি।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ঠাকুরগাঁওয়ে বিমানবন্দর চালু করা গেলে ব্যবসা-বাণিজ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে। তবে বিমানবন্দরকে কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদে টেকসই করতে হলে এর আশপাশে শিল্প-কারখানা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গড়ে তুলতে হবে।
তিনি বলেন, ‘আমাদের এখানে কোনো কলকারখানা নেই। তাই মানুষ কাজও পায় না। বিমানবন্দর চালু হলে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে।’
ঠাকুরগাঁওয়ে বিনিয়োগ বাড়ানোর আশাবাদ ব্যক্ত করে রাষ্ট্রপতি বলেন, কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তুলতে খুব শিগগিরই বিনিয়োগকারীদের নিয়ে আসার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে চীন থেকে বিনিয়োগকারী ও বিশেষজ্ঞ আনার বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে নিজ এলাকায় বিনিয়োগের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এ ধরনের উদ্যোগে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে নতুন উদ্যোগ
ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম এগিয়ে চলছে বলেও জানান রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য জমি কেনা ও মূল্য পরিশোধের কাজ শেষ হয়েছে। ইতোমধ্যে উপাচার্য দায়িত্ব নিয়েছেন এবং সোমবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হবে।
এ ছাড়া ঠাকুরগাঁওয়ে মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার দাবিও পূরণ হয়েছে বলে জানান তিনি। মেডিকেল কলেজের স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে এবং আগামী বছর থেকে শিক্ষার্থী ভর্তি শুরু হবে বলে আশা প্রকাশ করেন রাষ্ট্রপতি।
জেলার ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি। ঠাকুরগাঁওয়ে একটি স্পোর্টস ভিলেজ নির্মাণের পাশাপাশি উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে নতুন খেলার মাঠ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান।
এ ছাড়া আধুনিক তথ্য কমপ্লেক্স, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আঞ্চলিক কার্যালয়, আঞ্চলিক সমবায় প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট এবং পীরগঞ্জে কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
উদ্যোক্তা হওয়ার আহ্বান তরুণদের
ঠাকুরগাঁওয়ের কৃষি খাতের উন্নয়নে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কার্যক্রমের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, কৃষিতে ইতোমধ্যে অনেক উন্নতি হয়েছে। এখন শিল্পায়ন ও বিনিয়োগ বাড়িয়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।
তিনি বলেন, ‘আমরা কাজ করতে চাই। যারা কাজ করে, তাদের সঙ্গে থাকতে চাই। যারা সততার সঙ্গে মানুষের সেবা ও কল্যাণের জন্য কাজ করে, তাদের আমরা সাহস জোগাতে চাই এবং সমর্থন করতে চাই।’
তরুণ ও যুবসমাজকে চাকরির পেছনে না ছুটে উদ্যোক্তা হওয়ার এবং অন্যদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির আহ্বান জানান রাষ্ট্রপতি। স্থানীয় নারীদের বিভিন্ন উদ্যোগেরও প্রশংসা করেন তিনি।
মাদকমুক্ত ঠাকুরগাঁও গড়ার আহ্বান
তরুণ সমাজকে মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে রাষ্ট্রপতি ঠাকুরগাঁওকে মাদকমুক্ত জেলা হিসেবে গড়ে তুলতে জেলা প্রশাসক ও সংসদ সদস্যদের কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।
একটি মানবিক, সহনশীল ও শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ‘আসুন, সংঘাত, সংঘর্ষ কিংবা প্রতিশোধ নয়; আমরা ভালোবাসার মধ্য দিয়ে সত্যিকারের একটা সমাজ গড়ে তুলি। যেখানে সবাই এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবে।’
ঠাকুরগাঁওয়ে কোনো ধরনের রাজনৈতিক সংঘাত বা সংঘর্ষ দেখতে চান না জানিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘সমস্ত রাজনৈতিক দলের প্রতি আহ্বান থাকবে, আপনারা নিজেদের রাজনীতি করবেন, দলের মতবাদ প্রচার করবেন; কিন্তু সংঘাতে জড়াবেন না।’
‘সমঝতার রাজনীতি’ প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা
বক্তব্যে ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষের ওপর অতীতে হওয়া নির্যাতন, গ্রেপ্তার ও মিথ্যা মামলার প্রসঙ্গও তুলে ধরেন রাষ্ট্রপতি। তিনি গণতন্ত্র রক্ষায় দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
একই সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘সমঝতার রাজনীতি’ বা ‘পলিটিক্স অব রিকনসিলিয়েশন’ প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা ব্যক্ত করে তিনি বলেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও সংঘাতের পরিবর্তে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও সমঝোতার মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে।



