tanaka
প্রচ্ছদজাতীয়টেস্ট বাণিজ্য যেন সরকারি হাসপাতালে ‘ওপেন সিক্রেট’

টেস্ট বাণিজ্য যেন সরকারি হাসপাতালে ‘ওপেন সিক্রেট’

সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য রোগীদের বড় একটি অংশকে ছুটতে হচ্ছে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। অভিযোগ রয়েছে, এর নেপথ্যে সক্রিয় রয়েছে একটি সংঘবদ্ধ দালালচক্র। সরকারি হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশের যোগসাজশে এই চক্র রোগীদের হাসপাতালের বাইরে নিয়ে গিয়ে বিভিন্ন পরীক্ষা করাচ্ছে। এমনকি সরকারি হাসপাতালে পরীক্ষা করার সুযোগ থাকলেও দ্রুত রিপোর্ট বা হয়রানিমুক্ত সেবা দেওয়ার কথা বলে রোগী ও স্বজনদের কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে অতিরিক্ত টাকা।

রাজধানীর তিন বড় সরকারি হাসপাতাল—ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতাল এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে টানা এক সপ্তাহ অবস্থান করে এমন বেশ কয়েকটি চক্রের সন্ধান পাওয়া গেছে। অভিযোগ শুধু পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; রোগীদের বাইরের হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ভর্তি করানোর ঘটনাও রয়েছে।

রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ, হাসপাতালের নির্দিষ্ট কক্ষ থেকেই কোনো কোনো বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের প্যাডে ব্যবস্থাপত্র দেওয়া হচ্ছে। সেখানে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার তালিকা লিখে দেওয়া হয়। এরপর নির্দিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করে বাইরে থেকে পরীক্ষা করানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

সাধারণ রক্ত পরীক্ষা, সিবিসি, এক্সরে কিংবা আল্ট্রাসনোগ্রাফির মতো পরীক্ষার জন্যও রোগীদের বাইরে পাঠানোর অভিযোগ রয়েছে। আবার যেসব পরীক্ষা সরকারি হাসপাতালেই করা সম্ভব, সেগুলো করাতেও দীর্ঘ অপেক্ষা ও ভোগান্তির মুখে পড়তে হচ্ছে রোগীদের। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়ানোর এই দুর্ভোগকে কাজে লাগিয়ে একটি চক্র অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে দ্রুত পরীক্ষা করিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দিচ্ছে।

মিটফোর্ডে নির্দিষ্ট ডায়াগনস্টিক সেন্টারের প্যাড

স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালের একাধিক ওয়ার্ডের রোগীদের পরীক্ষার ব্যবস্থাপত্র হাতে এসেছে। এসব ব্যবস্থাপত্রের কয়েকটিতে ‘মনোতম গল্প মেডিকেল সার্ভিসেস লিমিটেড’ নামের একটি বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের প্যাড ব্যবহার করে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

একাধিক রোগীর ব্যবস্থাপত্রে একই প্রতিষ্ঠানের প্যাড ব্যবহারের বিষয়টি পাওয়া গেছে। প্যাডের এক পাশে ‘তানভীর’ নামের এক ব্যক্তির মোবাইল নম্বরসহ সিল রয়েছে। রোগীদের স্বজনদের ভাষ্য, টেস্ট করানোর বিষয়ে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এই তানভীর। পরে তিনি রোগীর কাছ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে নিয়ে যান।

মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনেও রয়েছে ছোট-বড় অসংখ্য বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার। হাসপাতালের দ্বিতীয় তলায় আল্ট্রাসনোগ্রাফি কক্ষে গিয়ে দেখা যায়, পরীক্ষার জন্য রোগীদের দীর্ঘ সারি। অন্যদিকে হাসপাতালের বাইরে বিভিন্ন ব্যক্তি রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন।

মুন্সীগঞ্জ থেকে বাবার চিকিৎসা করাতে আসা সালেহা বেগম বলেন, তার বাবার পায়ুপথে অস্ত্রোপচার হয়েছে। দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে তারা হাসপাতালে। তার অভিযোগ, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর প্রায় সব পরীক্ষাই বাইরে থেকে করাতে হয়েছে।

সালেহা বলেন, ‘সিবিসি, এক্সরে, আল্ট্রাসনোগ্রাফির মতো ছোট ছোট পরীক্ষার জন্যও বাইরে যেতে হয়েছে। হাসপাতাল থেকেই বাইরের বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের টোকেন দেওয়া হয়। সেখান থেকে পরীক্ষা করাতে বলা হয়। তানভীর নামে একজনের মোবাইল নম্বরও দেওয়া হয়। তিনি রোগীদের কাছে এসে নমুনা নিয়ে যান।’

তার ভাষ্য, ‘গ্রাম থেকে এসেছি কম খরচে চিকিৎসা করাবো বলে। কিন্তু এখানে এসে দেখি বাইরে থেকে সব পরীক্ষা করাতে হচ্ছে, ওষুধও বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে।’

সোহরাওয়ার্দী ও মিটফোর্ডে টাকা দিলেই দ্রুত পরীক্ষা

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পরীক্ষা করাতে হলে আগে নির্দিষ্ট কাউন্টারে টাকা জমা দিতে হয়। এরপর নমুনা দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। সরেজমিনে দেখা যায়, টাকা জমা দেওয়ার জন্য রোগী ও স্বজনদের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। অনেককে দুই থেকে তিন ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

এই দীর্ঘ অপেক্ষাকে কাজে লাগাচ্ছে একটি চক্র। অভিযোগ রয়েছে, প্রতি পরীক্ষায় ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত নিয়ে তারা রোগীকে দ্রুত নমুনা দেওয়ার ব্যবস্থা করে দিচ্ছে।

হাসপাতালে ভর্তি বিক্রম দাস (৪৪) কিছুদিন আগে পিত্তথলিতে অস্ত্রোপচার করিয়েছেন। পরে অস্ত্রোপচারের স্থানে সংক্রমণ হওয়ায় তাকে হাসপাতালে থাকতে হচ্ছে। তার অভিযোগ, চিকিৎসক পরীক্ষা দেওয়ার পর ওয়ার্ডের এক কর্মী সব ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথা বলে তার কাছ থেকে একটি পরীক্ষার জন্য ২ হাজার ২০০ টাকা নেন। পরে একই পরীক্ষা তিনি নিজে করাতে গেলে খরচ হয় ১ হাজার ৮০০ টাকা।

বিক্রম বলেন, বেশি টাকা নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে ওই কর্মী তাকে বলেন, ‘কিছু পেতে হলে কিছু দিতে হয়।’ এরপর থেকে তিনি নিজেই পরীক্ষা করানোর চেষ্টা করেন।

তার অভিযোগ, কোনো রোগীকে পরীক্ষা দেওয়া হলেই ওয়ার্ড বয় ও আয়ারা এসে খোঁজ নেন—কী কী পরীক্ষা দেওয়া হয়েছে, কোথা থেকে করানো হবে ইত্যাদি। এরপর সহজে পরীক্ষা করিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়।

বিক্রম বলেন, ‘একজন সাধারণ রোগী পরীক্ষা করাতে গেলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াতে হয়। কিন্তু আয়া বা ওয়ার্ড বয়রা গেলে কয়েক মিনিটেই কাজ হয়ে যায়। ভেতরের যোগসাজশ ছাড়া এটা সম্ভব নয়। তারা একপ্রকার জিম্মি করে মানুষের পকেট কাটছে।’

ঢামেকে টেস্ট বাণিজ্য ‘ওপেন সিক্রেট’

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। রোগীদের ভাষ্য, চিকিৎসক কোনো পরীক্ষা দেওয়ার পরপরই দালালরা রোগীর বেডের পাশে হাজির হন। তারা বাইরে থেকে পরীক্ষা করানোর প্রস্তাব দেন এবং অনেক ক্ষেত্রে নিজেরাই রোগীর নমুনা সংগ্রহ করে নিয়ে যান। পরে রোগীর হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয় বিল।

অভিযোগ রয়েছে, এসব কর্মকাণ্ড ওয়ার্ডে কর্তব্যরত চিকিৎসক ও নার্সদের সামনেই ঘটে। রোগীরা বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ করলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে উল্টো তাদের বিরূপ আচরণের শিকার হতে হয়।

দালালরা রোগীদের বোঝান, ঢাকা মেডিকেলে পরীক্ষা করালে রিপোর্ট পেতে দেরি হবে, পরীক্ষার মান ভালো নয় কিংবা দ্রুত রিপোর্ট পাওয়া যাবে না। এসব কথা বলে রোগীদের বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়।

২৩ আগস্ট রোববার দুপুর আড়াইটার দিকে ঢাকা মেডিকেল ভবন-২-এর বিপরীতে একটি বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে বেরিয়ে আসছিলেন ষাটোর্ধ্ব মন্সুর আলী। সঙ্গে ছিলেন তার স্ত্রী ও আরেক নারী। ওই নারী তাদের হাসপাতালের দিকে নিয়ে যাচ্ছিলেন।

মন্সুর আলী বলেন, চিকিৎসক তাকে রক্ত পরীক্ষা করতে দিয়েছেন। কিন্তু ওই নারী তাকে জানান, ঢাকা মেডিকেলে রক্ত পরীক্ষা হবে না; বাইরে থেকে করাতে হবে। পরে তারা একটি বেসরকারি হাসপাতালে গেলে সেখানে অতিরিক্ত টাকা চাওয়া হয়। ফলে পরীক্ষা না করিয়েই তারা বেরিয়ে আসেন।

মন্সুরের অভিযোগ, এরপরও ওই নারী তাদের পিছু ছাড়ছিলেন না।

অভিযোগ অস্বীকার করে ওই নারী, আলেয়া বলেন, তিনি কোনো টাকা নেননি। রোগীরা হাসপাতালের পথঘাট চেনেন না বলে তাদের সহযোগিতা করছিলেন। তার দাবি, রক্ত পরীক্ষা বিকেলে করাতে হবে জানিয়ে তিনি তাদের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়ে গিয়েছিলেন।

৯০০ টাকার পরীক্ষায় চাওয়া হয় ৩ হাজার ২০০ টাকা

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভবন-২-এর ৬০২ নম্বর ওয়ার্ডে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন ওয়াসিমের সঙ্গে ছিলেন আসলাম। তিনি বলেন, চিকিৎসক পরীক্ষা দেওয়ার পরপরই একজন এসে রোগীর কাছ থেকে রক্ত নিয়ে যান।

আসলাম বলেন, ‘এখানে সবাই দালালের যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ। আমি একটি রক্ত পরীক্ষা নিজে বাইরে একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে করিয়েছি ৯০০ টাকা দিয়ে। অথচ দালাল আমার কাছে ৩ হাজার ২০০ টাকা চেয়েছে।’

একই ওয়ার্ডে লিভারের জটিলতায় আক্রান্ত শাহ আলমের সঙ্গেও কথা হয়। চার দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি তিনি। শাহ আলমের অভিযোগ, চিকিৎসক পরীক্ষা দেওয়ার পর একজন এসে তার রক্ত নিয়ে যান। প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন ওই ব্যক্তি হাসপাতালের কর্মী। পরে রিপোর্ট দেওয়ার সময় মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করলে বুঝতে পারেন, তিনি দালাল।

শাহ আলমের অভিযোগ, ‘দায়িত্বরত নার্সদের সামনেই দালালরা রোগীদের নমুনা নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তারা কিছু বলেন না।’

সরকারি হাসপাতালে এসেও বাড়ছে চিকিৎসা ব্যয়

ঢাকার কেরানীগঞ্জ থেকে মায়ের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে এসেছেন হাফিজ। বড় অস্ত্রোপচারের পর ১২ দিন ধরে হাসপাতালে রয়েছেন তার মা। এরই মধ্যে প্রায় ৮০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে বলে জানান তিনি।

হাফিজের অভিযোগ, হাসপাতাল থেকে দেওয়া ব্যবস্থাপত্রেও বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের প্যাড ব্যবহার করা হয়েছে। চিকিৎসকদের দেওয়া বিভিন্ন পরীক্ষার প্রায় সবই তাকে বাইরে থেকে করাতে হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমি ভেবেছিলাম এখানে চিকিৎসা করালে খরচ আমার আয়ত্তের মধ্যে থাকবে। সরকারি হাসপাতালে এসেছি বলে ব্যয় কম হবে—এমনটাই আশা করেছিলাম। কিন্তু এখন দেখি সবকিছুই আয়ত্তের বাইরে চলে গেছে।’

তার অভিযোগ, ‘ব্লাড টেস্ট, সিবিসি, আল্ট্রাসনোগ্রাফি, এক্সরে—যে পরীক্ষাই দেওয়া হয়েছে, সবই বাইরে থেকে করাতে হয়েছে। এখানে করা যাবে না, এখানে হবে না—এমন কথা বলে আমাদের বাইরে পাঠানো হয়েছে।’

রোগী ও স্বজনদের এসব অভিযোগে স্পষ্ট হচ্ছে, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার পাশাপাশি পরীক্ষা-নিরীক্ষা ঘিরেও তৈরি হয়েছে একটি শক্তিশালী বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক। কোথাও দালালরা রোগীকে হাসপাতালের বাইরে নিয়ে যাচ্ছে, কোথাও হাসপাতালের ভেতরেই অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে দ্রুত পরীক্ষা করিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করছে। আর এই পুরো প্রক্রিয়ায় হাসপাতালের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা নিয়ে উঠছে গুরুতর প্রশ্ন।

সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা নিতে আসা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত রোগীদের বড় প্রত্যাশা থাকে কম খরচে চিকিৎসা পাওয়ার। কিন্তু পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে যদি তাদের বারবার বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যেতে হয় এবং দালালদের অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয়, তাহলে সরকারি চিকিৎসাসেবার মূল উদ্দেশ্যই প্রশ্নের মুখে পড়ে।