tanaka
প্রচ্ছদরাজনীতিতৃণমূলকে প্রাধান্য দিয়ে নতুন বার্তা দিচ্ছেন তারেক রহমান

তৃণমূলকে প্রাধান্য দিয়ে নতুন বার্তা দিচ্ছেন তারেক রহমান

দীর্ঘ প্রায় দেড় যুগের নির্বাসিত জীবন শেষে দেশে ফিরে রাজনীতির মাঠে নতুন আলোড়ন তুলেছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। একের পর এক অভিনব, সৃজনশীল ও ইতিবাচক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে তিনি যেন পরিবর্তনের নতুন বার্তা দিচ্ছেন। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক দর্শন অনুসরণ করেই এগোচ্ছেন তারেক রহমান। গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর দেশে প্রত্যাবর্তনের মাত্র এক মাসের মধ্যেই নানা পদক্ষেপে নতুনত্বের ছাপ রেখে কেড়েছেন দেশবাসীর দৃষ্টি।

মা খালেদা জিয়ার মৃত্যুশোক কাটিয়ে সরাসরি ভোটের মাঠে নেমেছেন তিনি। সাদামাটা ভঙ্গিমায়, বাবা-মায়ের মতোই তৃণমূলে ছুটে চলছেন দিনরাত। মাঠে-ময়দানে ঘুরে বেড়াচ্ছেন সাধারণ মানুষের কাছে। প্রতিপক্ষের নাম উল্লেখ না করেই যুক্তিনির্ভর বক্তব্যে রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরছেন। সাবলীল ভাষায় রাষ্ট্রের নীতি, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও নিজের ভাবনা জনগণের সঙ্গে ভাগাভাগি করছেন। হাসি-আনন্দের মধ্যেই শ্রোতাদের মতামত নিচ্ছেন, বিশেষ করে তরুণ সমাজকে দেখাচ্ছেন পরিবর্তনের স্বপ্ন।

সমাবেশের মঞ্চে সাধারণ মানুষকে ডেকে এনে নিজের চেয়ারে বসানো, শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে সব শ্রেণির মানুষের সঙ্গে করমর্দনের মাধ্যমে কুশল বিনিময়—এসব দৃশ্য বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিরল। মাঠের সমাবেশের পাশাপাশি ভার্চুয়াল নির্বাচনী প্রচারণায় আধুনিকতার ছোঁয়া এনে মানুষের রাজনৈতিক ধারণায় নতুন মাত্রা যোগ করছেন তিনি। নিজেকে উপস্থাপন করছেন এক ভিন্ন ‘তারেক রহমান’ হিসেবে—যিনি গতানুগতিক রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরে গিয়ে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের আধুনিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রূপরেখা তুলে ধরছেন।

বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক নেতা জানান, দীর্ঘদিন যুক্তরাজ্যে নির্বাসনে থাকলেও দেশে ফিরে তারেক রহমান কেবল রাজনীতিতেই নয়, নীতিনির্ধারণেও ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে চান। বহুমুখী পরিকল্পনা নিয়ে তিনি এগোচ্ছেন। প্রথমবারের মতো কোনো রাজনীতিবিদের বক্তব্যের ধরন সাধারণ মানুষের মধ্যে এতটা আগ্রহ ও কৌতূহল সৃষ্টি করেছে বলে তারা মনে করেন। রাস্তায় গাড়ি থেকে নেতাকর্মীদের সঙ্গে কুশল বিনিময়, মঞ্চে হেঁটে কথা বলা, জ্যেষ্ঠ নেতাদের সম্মান দেওয়া, জনগণের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ, মাঝে মাঝে কৌতুক—সব মিলিয়ে এটি শুধু বিএনপির নয়, বরং দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্যও নতুন অভিজ্ঞতা।

এই পরিবর্তনগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক প্রশংসা পাচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমান নিজেকে একজন পরিপক্ব ও সম্ভাবনাময় রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছেন। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের মনোযোগ আকর্ষণে তার ‘নতুন স্টাইল’ ধানের শীষের পক্ষে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে হলে প্রথমেই দলের নেতাকর্মীদের তা ধারণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে।

নির্বাচনী প্রচারণায় নতুনত্ব

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে প্রচারণায় আধুনিক প্রযুক্তি ও কৌশলের ব্যবহার করছেন তারেক রহমান। তার নির্বাচনী বহরে যুক্ত হয়েছে বুলেটপ্রুফ বাস ও জিপ, ডিজিটাল স্ক্রিন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইভ সম্প্রচার। মাঠের জনসভা ছাড়াও ডিজিটাল মাধ্যমকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তরুণদের মতামত জানার জন্য বিএনপি আয়োজন করেছে ‘রিলস প্রতিযোগিতা’, যেখানে তরুণ প্রজন্ম তাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ তুলে ধরছে।

গত বৃহস্পতিবার সিলেট থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেন বিএনপি চেয়ারম্যান। হযরত শাহজালাল (রহ.) ও জেনারেল এম এ জি ওসমানীর মাজার জিয়ারত শেষে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে ‘পলিসি ডায়ালগে’ অংশ নেন। তরুণদের সঙ্গে সরাসরি প্রশ্নোত্তর পর্ব, মেডিকেল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংলাপ, পেশাজীবীদের সমস্যা শোনা—এসব উদ্যোগ রাজনীতিতে এক নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে।

তার বক্তব্যে নেই প্রতিহিংসার ভাষা। তিনি বারবার বলছেন, ‘বিগত সময়ের কষ্ট যেন আমাদের তিক্ত না করে। আমাদের লক্ষ্য প্রতিহিংসা নয়, জাতীয় ঐক্য।’ সব ধর্মের মানুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করে নিজেকে একজন উদার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নেতা হিসেবে তুলে ধরছেন তিনি। একই সঙ্গে ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের বিরুদ্ধেও অবস্থান নিচ্ছেন।

বিএনপি সূত্র জানায়, তারেক রহমানের এবারের প্রচারণা মূলত ‘পলিসি-বেইজড’। বেকারত্ব দূর করতে কারিগরি শিক্ষা, দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি, কৃষি উন্নয়নে আধুনিক খাল খনন কর্মসূচি, ইমাম-খতিবদের সম্মানজনক ভাতা ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরছেন তিনি।

এক মাসে দৃশ্যমান পরিবর্তন

গত বছরের ১৬ ডিসেম্বর যুক্তরাজ্যে সর্বশেষ আলোচনায় তিনি নিজের নামে স্লোগান না দেওয়ার আহ্বান জানান। ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফিরে বিমানবন্দরে খালি পায়ে মাটি স্পর্শ, বড় বাসে করে সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে যাত্রা, সাধারণ কাঠের চেয়ারে বসা—সবকিছুতেই ছিল প্রতীকী বার্তা। এরপর ব্যানার-পোস্টার অপসারণ, নিরাপত্তা বেষ্টনী সরানো, ‘মাননীয়’ সম্বোধন প্রত্যাখ্যান—প্রতিটি পদক্ষেপই নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির ইঙ্গিত দেয়।

বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের এই পরিবর্তন যদি দলীয়ভাবে ধারণ করা যায়, তবে তা দেশের রাজনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটকে সামনে রেখে এই পরিবর্তন বিএনপির জন্য কতটা জনসমর্থন বয়ে আনে—সেটিই এখন দেখার বিষয়।