আর্থিক খাতে সুশাসন, শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে চারটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলোকে রেজল্যুশনের আওতায় এনে প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক দুর্বলতা, মূলধন ঘাটতি, খেলাপি ঋণ ও বিনিয়োগের চাপসহ বিভিন্ন সংকটে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে পর্যালোচনা করেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
রোববার (৯ আগস্ট) বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। পরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র শাহরিয়ার সিদ্দিকীও বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
অকার্যকর ঘোষণা করা চার প্রতিষ্ঠান হলো—আভিভা ফাইন্যান্স লিমিটেড, ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড, এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬-এর আওতায় প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক সক্ষমতা, ভবিষ্যতে ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা এবং আমানতকারী ও অন্যান্য পাওনাদারের দায় পরিশোধের সক্ষমতা বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ। পর্যালোচনার ভিত্তিতেই প্রতিষ্ঠানগুলোকে অকার্যকর ঘোষণার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় অঙ্কের মূলধন ঘাটতি এবং উচ্চমাত্রার শ্রেণিকৃত ঋণ ও বিনিয়োগ তাদের আর্থিক অবস্থাকে দুর্বল করে দিয়েছে। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় তারল্য সংরক্ষণে ব্যর্থতা, আয় ও মুনাফা অর্জনের সক্ষমতা কমে যাওয়া এবং আমানতকারী ও অন্যান্য পাওনাদারের দায় পরিশোধে অক্ষমতাও পরিস্থিতিকে আরও সংকটপূর্ণ করে তুলেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিদ্যমান পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে স্বাভাবিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার এবং সংশ্লিষ্টদের স্বার্থ সুরক্ষায় রেজল্যুশন প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে।
রেজল্যুশন প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রশাসক ও সহযোগী প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তারা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশাসনিক কার্যক্রম, ব্যবস্থাপনা, আর্থিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা এবং রেজল্যুশন-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করবেন। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদ ও দায়ের প্রকৃত অবস্থা নিরূপণ, পাওনাদারদের স্বার্থ বিবেচনা এবং ভবিষ্যৎ করণীয় নির্ধারণেও তারা কাজ করবেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, এ ধরনের উদ্যোগের প্রধান উদ্দেশ্য হলো আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ও সুশাসন ফিরিয়ে আনা। একই সঙ্গে দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং আমানতকারী ও অন্যান্য পাওনাদারের স্বার্থ সুরক্ষা করাও এই পদক্ষেপের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা মনে করছেন, আর্থিক খাতে অনিয়ম ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে যেসব প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে সংকটে রয়েছে, সেগুলোর বিষয়ে কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। সেই ধারাবাহিকতায় চার প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর ঘোষণা ও রেজল্যুশনের আওতায় আনার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই উদ্যোগের মাধ্যমে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি আমানতকারী ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার হবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে আর্থিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় দায়িত্বশীলতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়বে বলেও প্রত্যাশা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।



