tanaka
প্রচ্ছদজাতীয়অ-আপসযোগ্য মামলায় ৯ লাখ টাকায় সমঝোতা, দ্য ডিসেন্টের প্রতিবেদন

অ-আপসযোগ্য মামলায় ৯ লাখ টাকায় সমঝোতা, দ্য ডিসেন্টের প্রতিবেদন

রাজধানীর বারিধারায় বেপরোয়া গাড়িচাপায় নির্মাণশ্রমিক মেহেদী হাসান মীমের (২৪) মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা মামলায় ৯ লাখ টাকায় সমঝোতা হয়েছে বলে জানিয়েছে আসামিপক্ষ। তবে মামলাটি যে ধারায় করা হয়েছে, সেগুলো আইন অনুযায়ী অ-আপসযোগ্য ও জামিন-অযোগ্য। ফলে নিহতের পরিবারের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে অর্থের বিনিময়ে সমঝোতা হলেও সেটিকে মামলা নিষ্পত্তির আইনগত প্রক্রিয়া হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন আইনজীবীরা।

আইনজীবীদের মতে, স্ট্যাম্পে করা ব্যক্তিগত সমঝোতা বা আপসনামা আদালতের মাধ্যমে মামলা প্রত্যাহারের সমান নয়। ফলে ৯ লাখ টাকায় সমঝোতা হলেও মামলার তদন্ত ও পরবর্তী বিচারিক কার্যক্রম আইন অনুযায়ী চলার কথা।

গত মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৫টার দিকে রাজধানীর বারিধারা ডিপ্লোম্যাটিক এলাকার ১ নম্বর সড়কে জার্মান দূতাবাসের কাছে এ দুর্ঘটনা ঘটে। অভিযোগ, একটি প্রাইভেট কার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফুটপাতে উঠে গেলে সেখানে থাকা নির্মাণশ্রমিক মেহেদী হাসান মীম গাড়িচাপায় গুরুতর আহত হন। পরে তার মৃত্যু হয়।

‘দ্য ডিসেন্ট’-এর প্রতিবেদনে মামলার নথির বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, দুর্ঘটনার সময় গাড়িটি চালাচ্ছিল ১৭ বছরের এক কিশোর। সে ঢাকার গুলশানের একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের ‘ও’ লেভেলের শিক্ষার্থী। তার বাবা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একজন ক্যাপ্টেন। দুর্ঘটনাকবলিত প্রাইভেট কারটি তার মায়ের নামে নিবন্ধিত।

দুর্ঘটনার একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, মেহেদীকে চাপা দেওয়ার পর গাড়িটি একটি ল্যাম্পপোস্টে সজোরে ধাক্কা খেয়ে থেমে যায়। এরপর গাড়ি থেকে দুজনকে বের হতে দেখা যায়। চালকের পাশের দরজা দিয়ে কালো টি-শার্ট পরা এক কিশোর বেরিয়ে আসে। অন্য পাশ দিয়ে শার্ট পরা এক মধ্যবয়সী ব্যক্তিকে বের হতে দেখা যায়।

এজাহারে কিশোরের নাম নেই

ঘটনার দিন দিবাগত রাত ১২টার দিকে গুলশান থানায় এজাহার দায়ের করেন নিহতের বড় ভাই মোক্তাদীর ইসলাম।

তবে এজাহারে অভিযুক্ত কিশোরের নাম উল্লেখ করা হয়নি। সেখানে আকাশ মারক (৪৪) নামে এক ব্যক্তির নাম দেওয়া হয়। এজাহার ও পরবর্তী আপসনামায় তাকে গাড়িচালক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ঘটনার পর থেকে তিনি পলাতক রয়েছেন।

মামলার পরদিন বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) বিকেলে অভিযুক্ত কিশোরকে আটক করে পুলিশ। পরে বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) তাকে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানোর আদেশ দেন আদালত। ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৮-এর বিচারক মো. আব্দুল মোক্তাদির শুনানি শেষে এ আদেশ দেন।

৯ লাখ টাকায় সমঝোতার দাবি

গাড়িচাপায় নির্মাণশ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় আটটি শর্তে ৯ লাখ টাকায় সমঝোতার কথা জানিয়েছেন আসামিপক্ষের আইনজীবী আলমগীর হোসেন। বৃহস্পতিবার ঢাকার শিশু আদালতে শুনানি শেষে সাংবাদিকদের তিনি জানান, ইতোমধ্যে ওই অর্থ নিহতের পরিবারের সদস্যদের দেওয়া হয়েছে।

আলমগীর হোসেন বলেন, দুই পক্ষের মধ্যে ৯ লাখ টাকায় আপস হয়েছে। আপসনামায় সই করে নিহতের পরিবারের সদস্যরা আসামির জামিন বা খালাসের বিষয়ে কোনো আপত্তি না থাকার কথা জানিয়েছেন।

তার দাবি, নিহত মেহেদী বাকপ্রতিবন্ধী ছিলেন এবং কানে শুনতে পেতেন। দুর্ঘটনার পর পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো আপত্তি বা অভিযোগ করা হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি। মধ্যস্থতার মাধ্যমে অর্থ দেওয়া হয়েছে এবং নিহতের মা-বাবা বয়স্ক হওয়ায় তাদের ভবিষ্যৎ দেখাশোনার বিষয়টিও সমঝোতার সময় বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে বলে জানান আইনজীবী।

আপসনামাটি ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান শান্তা মরিয়মের কার্যালয়ে দুই পক্ষের উপস্থিতিতে করা হয়েছে বলে জানান আলমগীর হোসেন। সেখানে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের পাশাপাশি নিহতের মামা ও ভাই এবং আসামিপক্ষের লোকজন উপস্থিত ছিলেন।

নিহতের পরিবারকে কোনো ধরনের ভয়ভীতি বা চাপ দেওয়া হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তাদের কোনো ভয়ভীতি বা চাপ দেওয়া হয়নি। পরিবারের সদস্যরা ৯ লাখ টাকা নিয়েছেন এবং এ বিষয়ে তাদের কোনো অভিযোগ নেই। পরিবারের পক্ষ থেকে ময়নাতদন্ত করাতেও আপত্তি ছিল এবং তারা মামলা করতে চাননি বলেও দাবি করেন তিনি।

একটি জীবনের মূল্য ৯ লাখ টাকা হতে পারে কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে আলমগীর হোসেন বলেন, নিহত ব্যক্তি প্রতিবন্ধী ছিলেন এবং বাদীপক্ষই আপস করতে চেয়েছে। তাদের পক্ষ থেকে ১০ লাখ টাকা দাবি করা হলেও শেষ পর্যন্ত ৯ লাখ টাকায় সমঝোতা হয়েছে বলে জানান তিনি।

তবে নিহতের ভাই ও মামলার বাদী মোক্তাদীর ইসলাম আপসের বিষয়টি স্বীকার করলেও কত টাকায় সমঝোতা হয়েছে, তা জানেন না বলে দাবি করেন। তার ভাষ্য, ‘মামলার বিষয়ে আপস হয়েছে। কত টাকায় আপস হয়েছে জানি না। আমার মামা জানেন।’

আপসনামায় যা বলা হয়েছে

আপসনামায় দুর্ঘটনাটিকে ‘সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, ২২ সেপ্টেম্বর বিকেল ৫টার দিকে বারিধারা ডিপ্লোম্যাটিক এলাকার ১ নম্বর সড়কে প্রাইভেট কারটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফুটপাতে উঠে গেলে সেখানে থাকা মেহেদী হাসান মীম গাড়ির ধাক্কায় গুরুতর আহত হয়ে মারা যান। এতে গাড়িচালক হিসেবে আকাশ মারকের নাম এবং ওই কিশোরের গাড়িতে থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

আপসনামায় আরও বলা হয়েছে, দুই পক্ষের মধ্যে পূর্বশত্রুতা না থাকায় এবং ঘটনাটি অনিচ্ছাকৃত দুর্ঘটনা হওয়ায় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও নিকটাত্মীয়দের মধ্যস্থতায় আটটি সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে বিরোধ নিষ্পত্তি করা হয়েছে।

সমঝোতার শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে—মেহেদীর দাফন-কাফন ও ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার জন্য ১ লাখ টাকা এবং তার বৃদ্ধ মা-বাবার ভবিষ্যৎ বিবেচনায় আরও ৮ লাখ টাকা দেওয়া; মামলাটি প্রত্যাহারে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া; ১৭ বছরের কিশোর ও গাড়িচালক আকাশ মারকের জামিনে অনাপত্তি জানাতে নিহতের পক্ষের আদালতে উপস্থিত থাকা; মামলা প্রত্যাহারের ব্যয়ভার আসামিপক্ষের বহন করা এবং গাড়ি মেরামত বা আহতদের চিকিৎসার জন্য ক্ষতিপূরণ দাবি না করার বিষয়।

এ ছাড়া ভবিষ্যতে গাড়িচালকের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ না তোলার এবং চুক্তির কোনো শর্ত ভঙ্গ হলে তা অপরাধজনক বিশ্বাসভঙ্গ ও প্রতারণা হিসেবে গণ্য হবে—এমন শর্তও রাখা হয়েছে।

যে কারণে সমঝোতায় মামলা শেষ হচ্ছে না

মেহেদীর মৃত্যুর ঘটনায় তার ভাই সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর ৯৮ ও ১০৫ ধারায় মামলা করেছেন।

আইনের ৯৮ ধারায় নির্ধারিত গতিসীমার অতিরিক্ত গতিতে, বেপরোয়াভাবে, ঝুঁকিপূর্ণভাবে ওভারটেকিং, ওভারলোডিং কিংবা নিয়ন্ত্রণহীনভাবে মোটরযান চালানোর ফলে দুর্ঘটনায় জীবন ও সম্পত্তির ক্ষতি হলে শাস্তির বিধান রয়েছে। এ অপরাধে সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড, সর্বোচ্চ তিন লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।

অন্যদিকে ১০৫ ধারায় মোটরযান চালনাজনিত দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত বা প্রাণহানির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অপরাধের বিধান রয়েছে। বেপরোয়া বা অবহেলাজনিত মোটরযান চালনার কারণে দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ঘটলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড, সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হতে পারে।

আর সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর ১১৭ ধারা অনুযায়ী ৯৮ ও ১০৫ ধারার অধীন অপরাধ জামিন-অযোগ্য ও অ-আপসযোগ্য। অর্থাৎ বাদী ও আসামিপক্ষ নিজেদের মধ্যে সমঝোতা করলেই আইনগতভাবে মামলা শেষ হয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

‘তদন্তের ওপর প্রভাব পড়বে না’

সমঝোতার বিষয়ে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই আরেফীন ইসলামের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি তার জানা নেই বলে জানান। তদন্তে এর কোনো প্রভাব পড়বে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পুলিশ তাদের মতো করে তদন্ত চালিয়ে যাবে।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হারুন-অর-রশীদও বলেছেন, সড়ক পরিবহন আইনে দায়ের করা এ ধরনের মামলা আপসযোগ্য নয়। বাদী বা আসামিপক্ষের মধ্যে সমঝোতা হলে আদালত সেটি গ্রহণ করতে বাধ্য নন। তার ভাষায়, কোনো মানুষের মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা মামলায় এ ধরনের আপস গ্রহণযোগ্য নয়।

‘আইনের দৃষ্টিতে এটি আপস নয়’

সাবেক সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মুজাহিদুল ইসলাম শাহিনের মতে, ৯ লাখ টাকার বিনিময়ে করা এ সমঝোতা আইনের দৃষ্টিতে মামলা আপসের মাধ্যমে নিষ্পত্তি নয়; এটি দুই পক্ষের ব্যক্তিগত সমঝোতা মাত্র।

তিনি বলেন, সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর ১১৭ ধারা অনুযায়ী কেবল ৬৬, ৭২, ৭৫, ৮৭, ৮৯ ও ৯২ ধারার অপরাধ আপসযোগ্য। কিন্তু মেহেদীর মৃত্যুর ঘটনায় মামলা হয়েছে ৯৮ ও ১০৫ ধারায়, যা অ-আপসযোগ্য এবং জামিন-অযোগ্য। তাই স্ট্যাম্পে করা এ ধরনের আপসনামার মাধ্যমে মামলা শেষ করার আইনগত সুযোগ নেই।

অ্যাডভোকেট শাহিনের ভাষ্য, অ-আপসযোগ্য অপরাধ কেবল বাদী-আসামির ব্যক্তিগত বিরোধের বিষয় নয়; রাষ্ট্রও এসব অপরাধের বিচারপ্রক্রিয়ার পক্ষ। ফলে বাদী মামলা থেকে সরে যেতে চাইলেই মামলা শেষ হয়ে যায় না। আইনগত প্রক্রিয়ার বাইরে করা ব্যক্তিগত চুক্তিও আদালতে মামলা নিষ্পত্তির ভিত্তি হতে পারে না।

তিনি আরও বলেন, মামলা থেকে সরে আসার বিনিময়ে অর্থ লেনদেনের বিষয়টি চুক্তি আইনের পাশাপাশি দণ্ডবিধির ২১৩ ও ২১৪ ধারার প্রশ্নও তুলতে পারে।

তার মতে, আপসনামার কারণে মামলা আইনত শেষ হবে না। পুলিশ তদন্ত চালিয়ে প্রতিবেদন দেবে এবং আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে পরবর্তী বিচারিক সিদ্ধান্ত নেবেন। মামলা প্রত্যাহারের আইনগত পথ হিসেবে পাবলিক প্রসিকিউটরের আবেদন ও আদালতের সম্মতির কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

ফলে বারিধারার এই ঘটনায় নিহতের পরিবারের সঙ্গে ৯ লাখ টাকার ব্যক্তিগত সমঝোতা হলেও মামলার আইনগত অবস্থান আলাদা। তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে তদন্তে পাওয়া তথ্য, সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর।