tanaka
প্রচ্ছদআন্তর্জাতিকইরানের ব্যতিক্রমী সামরিক মহড়া ও নতুন প্রতিরক্ষা কৌশল

ইরানের ব্যতিক্রমী সামরিক মহড়া ও নতুন প্রতিরক্ষা কৌশল

ইরান সম্প্রতি এমন এক ব্যতিক্রমী সামরিক মহড়ার আয়োজন করেছে, যেখানে নিয়মিত সেনাসদস্যদের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক সাধারণ নাগরিক অংশ নিয়েছেন। ‘জানফাদায়ে ইরান’ বা ‘ইরানের জন্য আত্মত্যাগ’ নামের এই কর্মসূচির মাধ্যমে বেসামরিক নাগরিকদের প্রতিরক্ষা ও জরুরি পরিস্থিতিতে প্রস্তুত করার উদ্যোগ নিয়েছে দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) ও বাসিজ।

গত ১৮ সেপ্টেম্বর রাজধানী তেহরানে অনুষ্ঠিত এই মহড়ায় কয়েক লাখ মানুষ অংশ নেন বলে আয়োজক ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। কর্মসূচিতে সামরিক সরঞ্জাম প্রদর্শনের পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবকদের যুদ্ধকালীন প্রস্তুতি ও প্রশিক্ষণের বিষয়টি সামনে আনা হয়। আয়োজকদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তেহরানেই প্রায় ৫ লাখ মানুষ নিবন্ধন করেছিলেন; অন্যদিকে মার্কিন সংবাদমাধ্যম এপি জানিয়েছে, আইআরজিসির এক কমান্ডার ৬ লাখের বেশি নিবন্ধনের কথা বলেছেন। এসব সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

‘জানফাদায়ে ইরান’ কী

‘জানফাদায়ে ইরান’ মূলত একটি স্বেচ্ছাসেবী নিবন্ধন ও জনসম্পৃক্ততা কর্মসূচি, যা চলতি বছরের মার্চে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের প্রেক্ষাপটে শুরু হয়। এর উদ্দেশ্য হিসেবে নাগরিকদের দেশের প্রতিরক্ষা, জরুরি উদ্ধার, সামাজিক সেবা ও অন্যান্য জাতীয় কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করার কথা বলা হয়েছে।

ইরানের সরকারি ও রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, এই কর্মসূচিতে কয়েক কোটি মানুষ নিবন্ধন করেছেন। তবে এ সংখ্যার স্বাধীন যাচাই পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন প্রতিবেদনে ৩ কোটি ১ লাখ থেকে ৩ কোটি ২ লাখের বেশি নিবন্ধনের দাবি করা হয়েছে।

১৮ সেপ্টেম্বরের মহড়ায় অংশ নেওয়া স্বেচ্ছাসেবকদের মধ্যে নারী, তরুণ এবং বিভিন্ন পেশার মানুষ ছিলেন। মহড়ায় সামরিক পোশাক পরা স্বেচ্ছাসেবকদের পাশাপাশি বাসিজ সদস্যদেরও দেখা যায়। কিছু অংশগ্রহণকারীকে অস্ত্রের মডেল ও সামরিক সরঞ্জাম প্রদর্শনের মধ্যেও দেখা গেছে।

বেসামরিক জনবলকে প্রতিরক্ষা কাঠামোয় যুক্ত করার পরিকল্পনা

ইরানের সামরিক নেতৃত্বের বক্তব্যে এই কর্মসূচিকে শুধু প্রতীকী জনসমাবেশ হিসেবে না দেখে একটি বৃহত্তর প্রতিরক্ষা কাঠামোর অংশ হিসেবে গড়ে তোলার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

বাসিজের প্রধান হোসেইন তাইয়েব জানিয়েছেন, স্বেচ্ছাসেবকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রতিরক্ষা ইউনিটে সংগঠিত করার কাজ শুরু হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাদের স্থল, আকাশ ও নৌ প্রতিরক্ষার প্রাথমিক ও উন্নত প্রশিক্ষণের পরিকল্পনা রয়েছে।

এ ছাড়া দেশজুড়ে প্রায় এক হাজার ‘জাতীয় প্রতিরোধ’ ব্যাটালিয়ন গঠনের পরিকল্পনার কথাও সামনে এসেছে। এর লক্ষ্য হলো নিয়মিত সামরিক বাহিনী ও আইআরজিসির পাশাপাশি একটি বড় আকারের জনভিত্তিক রিজার্ভ কাঠামো তৈরি করা।

অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তায়ও ব্যবহার হতে পারে

ইরানের এই উদ্যোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বিপুলসংখ্যক বেসামরিক স্বেচ্ছাসেবককে সংগঠিত করে দেশটির নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা কাঠামোর একটি অতিরিক্ত স্তর তৈরি করার চেষ্টা চলছে।

ইরানের দৃষ্টিতে এমন একটি কাঠামো ভবিষ্যৎ সামরিক সংঘাতের সময় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও জনপদের নিরাপত্তা, জরুরি উদ্ধার এবং স্থানীয় প্রতিরোধ সক্ষমতা বাড়াতে পারে। তবে সমালোচনামূলক বিশ্লেষণে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, একই কাঠামো ভবিষ্যতে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা মোকাবিলাতেও ব্যবহার করা হতে পারে।

কেন এত বড় জনসম্পৃক্ততা

ইরানের সরকার এই কর্মসূচিকে জাতীয় ঐক্য, দেশপ্রেম এবং বহিরাগত হুমকির বিরুদ্ধে প্রস্তুতির প্রতীক হিসেবে তুলে ধরছে। ১৮ সেপ্টেম্বরের মহড়ায় প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও উপস্থিত ছিলেন। তিনি অংশগ্রহণকারীদের উপস্থিতিকে দেশের প্রতি জনগণের দায়িত্ববোধ ও সংহতির প্রকাশ হিসেবে উল্লেখ করেন।

তবে এই বিপুল অংশগ্রহণকে পুরোপুরি স্বতঃস্ফূর্ত হিসেবে বিবেচনা করা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ও বাসিজের মাধ্যমে কয়েক দিন ধরে নাগরিকদের এই কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছিল। ফলে এতে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয়ভাবে সংগঠিত অংশগ্রহণও ছিল।

এক হাজার ব্যাটালিয়নের পরিকল্পনা

তেহরানের বাইরে দেশের অন্যান্য প্রদেশেও একই ধরনের কর্মসূচি আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। বাসিজ নেতৃত্ব জানিয়েছে, স্বেচ্ছাসেবকদের সংগঠিত করে বৃহত্তর প্রতিরক্ষা ইউনিট গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ইরানের নিয়মিত সেনাবাহিনী ও আইআরজিসির বাইরে একটি বড় আকারের জনভিত্তিক রিজার্ভ কাঠামো তৈরি হতে পারে। এর মাধ্যমে যুদ্ধ বা বড় ধরনের নিরাপত্তা সংকটে স্থানীয় পর্যায়ে জনবল দ্রুত সংগঠিত করার সক্ষমতা বাড়বে।

তবে এই উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত কতটা কার্যকর সামরিক রিজার্ভে পরিণত হবে, তা নির্ভর করবে প্রশিক্ষণ, অস্ত্র সরবরাহ, কমান্ড কাঠামো এবং স্বেচ্ছাসেবকদের প্রকৃত সামরিক ভূমিকার ওপর। আপাতত ‘জানফাদায়ে ইরান’ কর্মসূচি ইরানের প্রতিরক্ষা নীতিতে সাধারণ নাগরিকদের আরও বড় পরিসরে যুক্ত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে সামনে এসেছে।