এশিয়ান গেমস ক্রীড়াবিদদের স্বপ্নপূরণের মঞ্চ। দেশের পতাকা কাঁধে নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে লড়াই করবেন অ্যাথলেটরা। পদকের আশায় তাঁদের প্রস্তুতি, ঘাম ও অনুশীলনের শেষ নেই। কিন্তু বাংলাদেশের এশিয়ান গেমস দল গঠনের তালিকা সামনে আসতেই ক্রীড়াঙ্গনে উঠেছে ভিন্ন প্রশ্ন—অ্যাথলেটদের প্রয়োজনের তুলনায় কর্মকর্তাদের বিদেশযাত্রার আগ্রহই কি বেশি?
কারও দায়িত্ব দলনেতা, কারও কোচ, কেউ ডেলিগেট, আবার কেউ ‘সেফ দ্য মিশন’। একই কর্মকর্তাকে একাধিক আন্তর্জাতিক আসরে ঘুরেফিরে দেখা যাওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। কোথাও একজন অ্যাথলেটের সঙ্গে যাচ্ছেন দুজন কর্মকর্তা, আবার কোনো ডিসিপ্লিনে দুজন অ্যাথলেটের জন্যও একজন কোচের বেশি নেই, নেই ম্যানেজার। কর্মকর্তা বণ্টনের এমন বৈপরীত্যই প্রশ্ন তুলেছে বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের (বিওএ) দল নির্বাচন ও কর্মকর্তা মনোনয়নের প্রক্রিয়া নিয়ে।
বিওএ ২৭৪ সদস্যের তালিকা সংবলিত একটি চিঠি জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে পাঠিয়েছে সরকারি আদেশ (জিও) জারির জন্য। বিওএর চিঠির স্মারক নম্বর বিওএ-১২০৭/২০২৬/০১৫৫, তারিখ ২৭ আগস্ট ২০২৬। পরে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ সোমবার যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে জিও জারির জন্য চিঠি পাঠায়, যার স্মারক নম্বর ৩৪.০৩.০০০০.০০০.০০৪.৫৫.০০০৪.২৩.১০৩৫।
একই মুখের বারবার বিদেশ সফর
বিওএর সহসভাপতি মেজর (অব.) ইমরোজকে ঘিরে ক্রীড়াঙ্গনে বেশ আলোচনা রয়েছে। চীনে বিচ গেমসে ভারপ্রাপ্ত ‘সেফ দ্য মিশন’, গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমসের ‘সেফ দ্য মিশন’দের সভা, গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমসে জেনারেল টিম ম্যানেজার এবং গত সপ্তাহে পাকিস্তানে দক্ষিণ এশিয়ান অলিম্পিক কমিটির সভায় অংশ নেওয়ার পর এবার এশিয়ান গেমসের ‘সেফ দ্য মিশন’ হিসেবে জাপান যাচ্ছেন তিনি।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সফরে একই কর্মকর্তার বারবার উপস্থিতি নিয়ে তাই প্রশ্ন উঠছে। তাঁর মতো কর্মকর্তাদের নির্বাচন কোন যোগ্যতা, প্রয়োজন বা দায়িত্বের ভিত্তিতে করা হচ্ছে—তা নিয়েও জানতে চাইছেন ক্রীড়াঙ্গনের সংশ্লিষ্টরা।
গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমসে টিম অ্যাটাচি হিসেবে সফর করা বিওএর মহাপরিচালক শেফাউল কবির এবারও এশিয়ান গেমসে টিম অ্যাটাচি হিসেবে জাপান যাচ্ছেন। তবে গ্লাসগো সফরের ক্ষেত্রে দলের সঙ্গে গিয়ে তিনি দলের সঙ্গে দেশে ফেরেননি বলে অভিযোগ রয়েছে। কেন তিনি ফেরেননি, কোথায় অবস্থান করেছেন এবং অতিরিক্ত অবস্থানের ব্যয় কীভাবে বহন করা হয়েছে—এসব বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
বিওএতে যোগ দেওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই একাধিক আন্তর্জাতিক সফরে তাঁর উপস্থিতি নিয়েও ক্রীড়াঙ্গনে নানা আলোচনা রয়েছে।
একজন অ্যাথলেট, দুজন কর্মকর্তা
জিমন্যাস্টিকসেও কর্মকর্তা বণ্টন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একজন জিমন্যাস্টের সঙ্গে যাচ্ছেন দলনেতা হাবিবুর রহমান ও কোচ আবদুল্লাহ আল মাসুম। হাবিবুর রহমান এর আগেও গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমসে দলের সঙ্গে ছিলেন।
একজন অ্যাথলেটের সঙ্গে দলনেতা ও কোচ—দুজন কর্মকর্তা পাঠানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে একই প্রতিনিধিদলের অন্য ডিসিপ্লিনে যখন প্রয়োজনীয় লোকবলের ঘাটতি রয়েছে, তখন এই বণ্টনের যৌক্তিকতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
কুস্তিতে উল্টো চিত্র
জিমন্যাস্টিকসের বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে কুস্তিতে। দুজন কুস্তিগিরের জন্য রাখা হয়েছে মাত্র একজন কোচ। নেই কোনো ম্যানেজার। ফলে একজন কোচকেই দুই অ্যাথলেটের প্রশিক্ষণ, প্রতিযোগিতাকালীন ব্যবস্থাপনা ও প্রয়োজনীয় সমন্বয়ের দায়িত্ব সামলাতে হবে।
পুরুষ ও নারী বিচ ভলিবলেও রয়েছে প্রায় একই ধরনের চিত্র। দুই দলের জন্য দেওয়া হয়েছে দুজন কোচ। অর্থাৎ একদিকে একজন অ্যাথলেটের সঙ্গে দুজন কর্মকর্তা, অন্যদিকে একাধিক অ্যাথলেটের জন্যও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনাগত লোকবল নেই। কর্মকর্তা বণ্টনের এই বৈষম্যই প্রশ্নকে আরও জোরালো করছে।
কোচের দায়িত্বে, নাকি আন্তর্জাতিক জাজ?
জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের সহকারী পরিচালক শাহরিয়ার সুলতানা সুচীর ভূমিকাও আলোচনায় এসেছে। তাঁর চাকরির পদ কোচ হিসেবে। তবে তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আসরে জাজ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বলে জানা গেছে। এবার এশিয়ান গেমসের তালিকাতেও তাঁর নাম রয়েছে।
একজন সরকারি কর্মকর্তার মূল দায়িত্ব কী এবং কোন প্রক্রিয়ায় তিনি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বিচারকের দায়িত্ব পাচ্ছেন—তা নিয়ে স্পষ্টতা প্রয়োজন। কোচ পদে থাকা কোনো কর্মকর্তা যদি নিয়মিত আন্তর্জাতিক সফরে জাজ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, তাহলে তাঁর মনোনয়ন ও দায়িত্ব নির্ধারণের প্রক্রিয়াটিও প্রকাশ করা জরুরি।
পরিচিত মুখদেরও উপস্থিতি
এশিয়ান গেমসের তালিকায় বিওএর ডেলিগেট হিসেবে রয়েছেন মাহবুবুর রহমান শাহীন। তিনিও গ্লাসগো দলের সঙ্গে ছিলেন। এ ছাড়া তালিকায় রয়েছেন ক্রীড়া সংগঠনের আরও কয়েকজন পরিচিত মুখ।
তাঁদের মধ্যে রয়েছেন বক্সিং ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক এম এ কুদ্দুস, ভলিবল ফেডারেশনের সাবেক সভাপতি ফারুক হাসান, রাগবির সাবেক সভাপতি আব্দুল্লাহ আল জাহির স্বপন, মহিলা ক্রীড়া সংস্থার সাবেক সাধারণ সম্পাদিকা ফিরোজা করিম নেলী এবং আর্চারি ফেডারেশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক তানভীর আহমেদ।
সাবেক কর্মকর্তাদের আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আসরে থাকার প্রয়োজনীয়তা থাকতেই পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তাঁদের প্রত্যেকের সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব কী? ডেলিগেট হিসেবে তাঁরা গেলে তাঁদের কাজ কী এবং সেই দায়িত্বের সঙ্গে অ্যাথলেটদের প্রয়োজনের সম্পর্ক কোথায়—এসব তথ্য প্রকাশ করা হলে বিতর্কের অনেকটাই অবসান হতে পারে।
সাঁতারেও একই প্রশ্ন
সাঁতারে দুজন সাঁতারুর সঙ্গে যাচ্ছেন দলনেতা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক আমিনুল হক স্বজল এবং কোচ নাজিম উদ্দিন। দুজন অ্যাথলেটের জন্য একজন দলনেতা ও একজন কোচ—সাংগঠনিকভাবে এর প্রয়োজনীয়তা থাকতেই পারে। তবে একই প্রতিনিধিদলের অন্য ডিসিপ্লিনে যখন লোকবল সংকট রয়েছে, তখন সামগ্রিক কর্মকর্তা বণ্টনের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের হয়ে লড়বেন অ্যাথলেটরাই। তাঁদের প্রস্তুতি, প্রশিক্ষণ, প্রতিযোগিতাকালীন সহায়তা ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনাই হওয়া উচিত অগ্রাধিকার। কোথাও প্রয়োজনের তুলনায় বেশি কর্মকর্তা, আবার কোথাও প্রয়োজনীয় লোকবলের ঘাটতি—এমন দুই ধরনের চিত্র পাশাপাশি থাকলে দল গঠনের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।
বিওএর উচিত এ নিয়ে ধোঁয়াশা না রেখে প্রতিনিধিদলের পূর্ণাঙ্গ তালিকা, প্রত্যেক কর্মকর্তার দায়িত্ব, মনোনয়নের কারণ এবং সফর ব্যয়ের কাঠামো প্রকাশ করা। অ্যাথলেটরা যখন দেশের হয়ে পদকের জন্য লড়বেন, তখন তাঁদের পাশে থাকা প্রতিটি কর্মকর্তারও থাকা উচিত সুস্পষ্ট দায়িত্ব ও জবাবদিহি।
বিদেশ সফর নয়, অগ্রাধিকার হোক অ্যাথলেট। পদ নয়, প্রয়োজন ও যোগ্যতাই হোক মনোনয়নের ভিত্তি। আর গোপনীয়তার বদলে স্বচ্ছতাই হোক এশিয়ান গেমসের দল গঠনের প্রথম শর্ত।



