ইমরান খানকে ঘিরে ‘বিদেশি ষড়যন্ত্র’ বিতর্কে নতুন মোড় এসেছে। পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতা থেকে সরানোর পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ছিল কি না— সেই প্রশ্ন ফের আলোচনায় উঠে এসেছে একটি গোপন কূটনৈতিক নথি ফাঁসের ঘটনায়। সোমবার (১৮ মে) মার্কিন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ওই নথিতে ২০২২ সালের মার্চে যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত তৎকালীন পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূত আসাদ মজিদ খান এবং মার্কিন কূটনীতিক ডোনাল্ড লুর মধ্যকার কথোপকথনের বিস্তারিত উঠে আসে।
মার্কিন অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম ড্রপ সাইটের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, জো বাইডেন প্রশাসনের সময় ২০২২ সালের ৭ মার্চ অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে পাকিস্তানকে ইমরান খানকে ক্ষমতা থেকে সরানোর বার্তা দেওয়া হয়েছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়, ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন নিয়ে ইমরানের নিরপেক্ষ অবস্থান এবং আফগানিস্তানে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি না দেওয়ায় ওয়াশিংটনের সঙ্গে তার দূরত্ব তৈরি হয়।
ইমরান খান দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছেন, স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ এবং রাশিয়া-চীনের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের সঙ্গে পুরোপুরি একমত না হওয়ায় তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার ষড়যন্ত্র করা হয়েছে। তার দাবি, এ প্রক্রিয়ায় পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজ ও পাকিস্তান পিপলস পার্টিও জড়িত ছিল।
২০২২ সালের এপ্রিলের এক বক্তব্যে ইমরান বলেছিলেন, “আমাকে সরিয়ে দিলেই সবকিছু ক্ষমা করে দেবে আমেরিকা।”
তবে সেই সময়ই যুক্তরাষ্ট্র এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র নেড প্রাইস বলেছিলেন, অভিযোগগুলোর কোনো ভিত্তি নেই।
ড্রপ সাইটের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০২২ সালের ৭ মার্চ ডোনাল্ড লুর সঙ্গে বৈঠকে আসাদ মজিদ খানকে জানানো হয়েছিল, অনাস্থা ভোটের মাধ্যমে ইমরান খানকে সরানো গেলে ওয়াশিংটনের ক্ষোভ কমবে এবং সম্পর্ক স্বাভাবিক হবে। একইসঙ্গে ইমরান ক্ষমতায় থাকলে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে পাকিস্তানের কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা আরও বাড়বে বলেও মন্তব্য করা হয়।
অবশেষে ২০২২ সালের ৯ এপ্রিল অনাস্থা ভোটে ক্ষমতা হারান ইমরান খান। পরবর্তীতে দুর্নীতি, আদালত অবমাননা ও জাতীয় নিরাপত্তা-সংক্রান্ত একাধিক মামলায় তাকে এবং তার স্ত্রী বুশরা বিবিকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। এরপর থেকেই তারা কারাবন্দি রয়েছেন।
এদিকে, ইমরানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) ওপরও বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। ২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে দলটির নির্বাচনী প্রতীকও বাতিল করা হয়।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ইউক্রেন যুদ্ধের সময় রাশিয়ার বিরুদ্ধে অবস্থান না নেওয়া এবং মস্কো সফরের কারণে ওয়াশিংটনের সঙ্গে ইমরান সরকারের সম্পর্ক আরও খারাপ হয়। রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা শুরু করার দিনই মস্কো সফরে ছিলেন ইমরান খান। একই সময়ে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর পাকিস্তানের ঘাঁটি ব্যবহারের অনুরোধও প্রত্যাখ্যান করেছিলেন তিনি।
ড্রপ সাইটের দাবি, পাকিস্তানের সেনাবাহিনী মনে করেছিল ইমরানের নীতির কারণে দেশ কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতার দিকে এগোচ্ছে। পরে সেনাবাহিনী নিজ উদ্যোগে ওয়াশিংটনের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে শুরু করে।
ইমরান ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর পাকিস্তানের নতুন সরকার যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকারের দিকে ঝুঁকে পড়ে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যবহারের জন্য গোলাবারুদ সরবরাহও শুরু হয় বলে উল্লেখ করা হয়।
এছাড়া আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ সহায়তার সঙ্গে সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের বিষয়টিও নীরবে যুক্ত ছিল বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।



