tanaka

পাঁচ মাসে বিদেশি ঋণ পরিশোধ ২০৪ কোটি ডলার

বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পাঁচ মাসে বিদেশি ঋণের আসল ও সুদ বাবদ রেকর্ড ২০৪ কোটি ৭৬ লাখ মার্কিন ডলার পরিশোধ করা হয়েছে। চলতি...
প্রচ্ছদজাতীয়থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পে পুরোনো জলাশয়কে নতুন পুকুর দেখিয়ে ১০ কোটি টাকা বিল

থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পে পুরোনো জলাশয়কে নতুন পুকুর দেখিয়ে ১০ কোটি টাকা বিল

রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পে আগে থেকেই থাকা একটি জলাশয়কে নতুন পুকুর খনন দেখিয়ে ১০ কোটি টাকা বিল পরিশোধের অভিযোগ উঠেছে। একই প্রকল্পে অনুমোদনহীন ভেরিয়েশন, অতিমূল্যে গাছ কেনা, সফট ওপেনিংয়ে ৪৪ কোটি টাকা ব্যয়সহ নানা অনিয়মে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের তথ্য উঠে এসেছে মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব ব্যয়কে এখন পরবর্তী অনুমোদনের (পোস্ট-ফ্যাক্টো) মাধ্যমে বৈধতা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যা নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অনিয়মের প্রমাণ থাকার পরও এভাবে ব্যয় বৈধতা পেলে উন্নয়ন প্রকল্পে জবাবদিহি দুর্বল হবে এবং ভবিষ্যতের জন্য একটি বিপজ্জনক নজির তৈরি হবে।

সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পের ব্যয়ের ধরন ২০১৯ সালের বহুল আলোচিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ‘বালিশ-কাণ্ড’-এর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, যেখানে অস্বাভাবিক মূল্যে বিভিন্ন সামগ্রী ক্রয়ের অভিযোগ উঠেছিল।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অনিয়মগুলোকে পরবর্তী সময়ে অনুমোদনের মাধ্যমে বৈধতা দেওয়া হলে সেটিও দুর্নীতির শামিল হবে। তার মতে, এতে অনিয়মকারীরা দায়মুক্তির সুযোগ পাবে।

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, পোস্ট-ফ্যাক্টো অনুমোদনের পরিবর্তে স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে দায় নির্ধারণ, অতিরিক্ত অর্থ পুনরুদ্ধার এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। অন্যথায় সরকারি প্রকল্পে এ ধরনের অনিয়ম বন্ধ হবে না।

এ বিষয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত জানিয়েছেন, প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কারা ভুয়া ভেরিয়েশন করেছে, কত টাকা অনিয়ম বা আত্মসাৎ হয়েছে এবং কারা জড়িত—সবকিছু খতিয়ে দেখা হবে। যদিও বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য একটি অ্যামিকেবল সেটেলমেন্ট কমিটি গঠন করা হয়েছে, তবে দুর্নীতির অভিযোগ কোনোভাবেই সমঝোতার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হবে না বলে তিনি জানান।

গাছ কেনায় অস্বাভাবিক ব্যয়

প্রকল্পের সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য ঝাউ, কৃষ্ণচূড়া, কাঠগোলাপসহ বিভিন্ন গাছ লাগানো হলেও প্রকল্প নথিতে প্রতিটি গাছের মূল্য ৫ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত দেখানো হয়েছে। অথচ বিমানবন্দরের আশপাশের নার্সারিতে একই ধরনের গাছ ২০০ থেকে ৫০০ টাকায় পাওয়া যায়।

নথি অনুযায়ী, গাছ কেনায় প্রায় ২০ কোটি টাকা এবং পরিচর্যায় আরও ৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। স্থানীয় নার্সারি মালিক রবিউল ইসলাম বলেন, এসব গাছের বাজারমূল্য কয়েকশ টাকার বেশি নয়।

ব্যয় বেড়ে ২২ হাজার কোটি টাকা

আওয়ামী লীগ সরকারের সময় থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ১৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। পরে একাধিক সংশোধনের মাধ্যমে ব্যয় বেড়ে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছে।

বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন পর্যায়ে অতিরিক্ত বিল, অনুমোদনহীন ভেরিয়েশন এবং প্রশ্নবিদ্ধ ব্যয়ের মাধ্যমে বিপুল অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে।

পুরোনো জলাশয়, নতুন পুকুরের বিল

নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, পুকুর নির্মাণের নামে ঠিকাদারকে ১০ কোটি টাকা দেওয়া হলেও গুগল আর্থের পুরোনো স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যায়, প্রকল্প এলাকায় আগে থেকেই একটি জলাশয় ছিল। সেটিকে কিছুটা সংস্কার করে পুকুরে রূপ দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া চুক্তি অনুযায়ী প্রকল্প এলাকার মাটি প্রায় সাড়ে ছয় কিলোমিটার দূরে ফেলার কথা থাকলেও অনুসন্ধানে দেখা যায়, অধিকাংশ মাটি দুই কিলোমিটারের মধ্যেই ফেলা হয়েছে। তারপরও দীর্ঘ দূরত্বে মাটি পরিবহনের বিল পরিশোধ করা হয়, যার পরিমাণ প্রায় ৮৩ কোটি টাকা।

সফট ওপেনিংয়ে ৪৪ কোটি টাকা

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার আগেই চুক্তির বাইরে সীমিত পরিসরে উদ্বোধন (সফট ওপেনিং) আয়োজনের জন্য ৪৪ কোটি টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। মূল চুক্তিতে এ ধরনের ব্যয়ের কোনো উল্লেখ ছিল না।

এ ছাড়া ডিজেল পাম্প সরবরাহে প্রায় ১২ কোটি টাকা, ইউপিএস সরবরাহে ৪৮ কোটির বেশি এবং জ্বালানি তেলে ৪১ কোটি টাকা ব্যয়ের তথ্যও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি নকশাবিহীন ভবনের জন্য অর্থ পরিশোধ, কনটিনজেন্সি ও প্রাইস এসকেলেশন থেকে নিয়মবহির্ভূতভাবে ওভারটাইম বিল প্রদান, অপসারণযোগ্য মাটি বিক্রির অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়া এবং নির্মাণকাজের গতি বাড়ানোর নামে ঠিকাদারকে ২১৭ কোটি টাকা পরিশোধের অভিযোগও রয়েছে।

অনুমোদন ছাড়াই ৩,২০০ কোটি টাকার ভেরিয়েশন

বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অতিরিক্ত কাজের জন্য প্রকল্প কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া সর্বোচ্চ ১ শতাংশ ব্যয় করার সুযোগ থাকলেও এই প্রকল্পে প্রায় ২৩ শতাংশ ব্যয় করা হয়েছে।

এ ছাড়া ৬৩০টি আইটেমে পরিবর্তন (ভেরিয়েশন) এনে যথাযথ অনুমোদন ছাড়াই প্রায় ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন

২০১৭ সালে অনুমোদিত থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে। জাপানের মিতসুবিশি ও ফুজিটা এবং দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাংয়ের সমন্বয়ে গঠিত অ্যাভিয়েশন ঢাকা কনসোর্টিয়াম (এডিসি) ছিল প্রকল্পের ঠিকাদার। প্রকল্পের বড় অংশের অর্থায়ন করেছে জাইকা।

অনিয়মের অভিযোগের পর বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) ডিসপিউট বোর্ড ও অ্যামিকেবল সেটেলমেন্ট কমিটি গঠন করলেও অভিযোগ রয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে, তাদের কয়েকজনকেই এসব কমিটিতে রাখা হয়েছে। ফলে তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বেবিচকের সাবেক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) মোহাম্মদ মফিদুর রহমান বলেন, প্রকল্পের নকশা, ব্যয়ের প্রাক্কলন, ভেরিয়েশন ও মূল্য নির্ধারণে জাপানি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এবং জাইকার ভূমিকা ছিল। তাই নিরীক্ষায় উত্থাপিত প্রতিটি বিষয় প্রকল্পের নথি ও চুক্তির আলোকে যাচাই করা প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, অনিয়ম হয়ে থাকলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। তবে তদন্তের নামে প্রকল্প বাস্তবায়ন বা পরিচালনায় অযথা বিলম্ব ঘটানোও উচিত নয়।

অন্যদিকে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেবিচকের এক কর্মকর্তা বলেন, নিরপেক্ষ তদন্ত হলে আড়ালে থাকা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নামও বেরিয়ে আসতে পারে। তার মতে, প্রকল্পের বাকি কাজ শেষ করার সঙ্গে তদন্তের কোনো সাংঘর্ষিক সম্পর্ক নেই; কাজ চলমান রেখেই অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব।