tanaka
প্রচ্ছদআন্তর্জাতিকইরান-সংঘাতের প্রেক্ষাপটে কাতারের নতুন বার্তা, ‘নিরাপত্তায় আত্মনির্ভর হতে হবে’

ইরান-সংঘাতের প্রেক্ষাপটে কাতারের নতুন বার্তা, ‘নিরাপত্তায় আত্মনির্ভর হতে হবে’

উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি কিংবা কৌশলগত মিত্রতার ওপর নির্ভর করে থাকা যথেষ্ট নয়—এমন বার্তা দিয়েছেন কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি। তার মতে, নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উপসাগরীয় দেশগুলোকে আরও বেশি আত্মনির্ভরশীল হতে হবে।

সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে অনুষ্ঠিত হিলি ফোরামে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন। খবর মিডল ইস্ট আইয়ের।

কাতারেই রয়েছে আরব বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মার্কিন সামরিক ঘাঁটি। দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) আঞ্চলিক সদরদপ্তর হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এর মধ্যেই চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ও ইরানের সংঘাতকে কেন্দ্র করে উপসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। ইরানের পাল্টা হামলার প্রভাবও কাতারে উল্লেখযোগ্যভাবে পড়ে।

হিলি ফোরামে আল-আনসারি বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক বাহিনীর উপস্থিতি ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার জন্য এসব ব্যবস্থার ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল থাকা সম্ভব নয়।

তার বক্তব্যের সারকথা হলো, অংশীদার ও মিত্রদের সহযোগিতা প্রয়োজন হলেও নিজেদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজেদের সক্ষমতার ওপরও দাঁড় করাতে হবে।

কাতারের এই অবস্থান এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক অ্যাভ্রিল হেইনস মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ও কূটনৈতিক উপস্থিতি কমানোর সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে সতর্ক করেছেন। তার মতে, অতীতে অঞ্চল থেকে মার্কিন সম্পৃক্ততা কমানোর উদ্যোগ প্রত্যাশিত ফল দেয়নি এবং ভবিষ্যতে এমন পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করতে পারে।

ইরানের পাল্টা হামলার আশঙ্কায় চলতি বছরের শুরুতে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে বিপুলসংখ্যক মার্কিন সেনা ও দূতাবাসকর্মী সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। তাদের সবাই পুনরায় ওই অঞ্চলে ফিরবেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বার্তা

ইরানের সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নিয়েও কাতারের অবস্থান তুলে ধরেছেন আল-আনসারি। সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক সংবাদপত্র দ্য ন্যাশনালকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, তেহরানের সঙ্গে পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠনে সময় লাগবে। তবে প্রতিবেশী হিসেবে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন করা প্রয়োজন।

তার মতে, বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের যে অভিজ্ঞতা উপসাগরীয় দেশগুলোর রয়েছে, ইরানের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সহাবস্থানের পথ খুঁজে বের করা সম্ভব।

তবে কাতারের এ উদ্যোগের পাশাপাশি ইরানেরও দায়িত্ব রয়েছে বলে মনে করেন আল-আনসারি। তার ভাষ্য, তেহরানকে ভালো প্রতিবেশীর মতো আচরণ করতে হবে এবং সামরিক চাপ প্রয়োগের নীতি থেকে সরে আসতে হবে।

তিনি জানান, পরিস্থিতি অনুকূল হলে কাতার সহযোগিতার হাত বাড়াতে প্রস্তুত। তবে একই সঙ্গে দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বজায় রাখার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে দোহা।

দীর্ঘ সংঘাতের বিরুদ্ধে কাতার

ইরান-সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার কোনো সুযোগ নেই বলেও সতর্ক করেছেন কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সংঘাত দ্রুত শেষ হওয়ার বিষয়ে একাধিকবার আশাবাদ প্রকাশ করলেও আল-আনসারির বক্তব্যে পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে।

তিনি মনে করেন, দীর্ঘ সময় ধরে সংঘাত চলতে থাকলে এর প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও এর বড় ধরনের প্রভাব পড়বে।

বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। তার মতে, গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ দীর্ঘ সময় বন্ধ রাখা সম্ভব নয়। একইভাবে উপসাগরীয় অঞ্চলে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র হামলাও কোনোভাবেই দীর্ঘমেয়াদে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

সম্প্রতি মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেছিলেন, বিকল্প তেল পরিবহনব্যবস্থা ও পাইপলাইন তৈরি হলে আগামী দুই বছরের মধ্যে হরমুজ প্রণালির কৌশলগত গুরুত্ব কমে যেতে পারে। তবে কাতারের মুখপাত্র এ ধারণার সঙ্গে একমত নন।

আল-আনসারির মতে, দীর্ঘ সময় ধরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ রুট হিসেবে হরমুজ প্রণালির যে ভূমিকা তৈরি হয়েছে, কোনো একটি ঘটনা বা উদ্যোগের কারণে তা সহজে পরিবর্তিত হওয়ার নয়।

নিষেধাজ্ঞার বদলে আলোচনার আহ্বান

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার নীতিরও সমালোচনা করেছেন আল-আনসারি। তার মতে, অতীতে ইরাক, লিবিয়াসহ বিভিন্ন দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি।

কাতারের অবস্থান হলো, সংকটের স্থায়ী সমাধান চাপ প্রয়োগ বা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে নয়; বরং আলোচনার মাধ্যমেই খুঁজে বের করা উচিত।

আল-আনসারির বক্তব্যে একই সঙ্গে দুটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে—কাতার একদিকে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়, অন্যদিকে নিজেদের নিরাপত্তা কাঠামোকেও আরও শক্তিশালী করতে চায়। পাশাপাশি প্রতিবেশী ইরানের সঙ্গে সংঘাতের বদলে সংলাপ ও সহাবস্থানের পথ খোঁজার পক্ষেও অবস্থান নিয়েছে দোহা।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির ভবিষ্যৎ নিয়ে যখন নতুন করে আলোচনা চলছে, তখন কাতারের এই বক্তব্য দেশটির নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতিতে সম্ভাব্য পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।