গত এক বছরে দেশে দারিদ্র্যের হার উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে—এমন তথ্য উঠে এসেছে অর্থ মন্ত্রণালয় এবং পিপিআরসি (পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার) পরিচালিত এক যৌথ জরিপে।
২০২২ সালের বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, দেশে অতিদারিদ্র্যের হার ছিল ৫.৬ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯.৩৫ শতাংশে। একইভাবে, সাধারণ দারিদ্র্য হার ১৮.৭ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ২৭.৯৩ শতাংশ।
সোমবার (২৫ আগস্ট) রাজধানীর আগারগাঁওয়ের এলজিইডি মিলনায়তনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে জরিপের প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান।
আয় ও ব্যয়ের অসামঞ্জস্য
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ব্যয় তাদের আয়ের তুলনায় বেশি। ফলে এই শ্রেণির মানুষদের অনেকেই ধারদেনা করে সংসার চালাতে বাধ্য হচ্ছেন। বিপরীতে, উচ্চবিত্ত শ্রেণির মানুষের ব্যয় তাদের আয় থেকে কম। এতে সমাজে বৈষম্য বাড়ছে এবং বাড়ছে হয়রানির ঘটনাও।
ড. হোসেন জিল্লুর রহমান জানান, গড়ে একটি পরিবারের মাসিক আয় ৩২,৬৮৫ টাকা এবং ব্যয় ৩২,৬১৫ টাকা। তবে আয়ের বৈষম্য প্রকট:
- নিচের ১০ শতাংশ পরিবারের গড় আয়: ৮,৪৭৭ টাকা; ব্যয়: ১২,২৯৪ টাকা
- মধ্যবিত্ত ৪০ শতাংশ পরিবারের গড় আয়: ২৮,৮১৮ টাকা; ব্যয়: ২৯,৭২৭ টাকা
- উপরের ১০ শতাংশ পরিবারের গড় আয়: ১,০৯,৩৯০ টাকা; ব্যয়: ১,০১,১৬৩ টাকা
খাদ্য নিরাপত্তা ও দরিদ্রতা
সর্বনিম্ন আয়ের ১০ শতাংশ মানুষের মধ্যে ১২.২ শতাংশই সপ্তাহে অন্তত এক বেলা না খেয়ে থাকেন। আবার ৯ শতাংশ মানুষ মাসে অন্তত একদিন খাদ্যসংকটে থাকেন। এতে স্পষ্ট যে, নিম্নআয়ের মানুষদের মধ্যে খাদ্য নিরাপত্তার চরম অভাব রয়েছে।
দুর্নীতি ও হয়রানি
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, আগের চেয়ে কিছুটা কমলেও এখনো ঘুষ দিতে হয়। বরং এখন মানুষ অনেক সময় নির্দিষ্ট কাজ সময়মতো করতে বেশি ঘুষ দিচ্ছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ঘুষ দেওয়ার হার ছিল ২১.৫১ শতাংশ, যা বর্তমানে বেড়ে হয়েছে ৩০.৭৯ শতাংশ।
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি
সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় থাকা অনেক সুবিধাভোগী প্রকৃতপক্ষে গরিব নন।
- ১৬.৫ শতাংশ সুবিধাভোগী গরিব নন
- ২৭.৫ শতাংশ সুবিধাভোগী এখনো গরিব না হলেও গরিব হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন
এই হিসেবে দেখা যায়, মোট ৪৪.৩ শতাংশ মানুষ যারা এই কর্মসূচির আওতায় সুবিধা পাচ্ছেন, তারা প্রকৃত দরিদ্র নয়।
স্বাস্থ্য ব্যয় ও সম্পদের বৈষম্য
জরিপে অংশ নেওয়া প্রতিটি পরিবারেই একজন বা একাধিক সদস্য দীর্ঘমেয়াদি (ক্রনিক) রোগে আক্রান্ত। ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, এ কারণে পরিবারগুলো আরও দরিদ্র হচ্ছে। তিনি নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর জন্য ক্রনিক রোগীদের আলাদা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চালুর পরামর্শ দেন।
এছাড়া, গড়পড়তা একটি পরিবারের সম্পদের পরিমাণ ২৭ লাখ টাকা এবং সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহারের হার বেড়েছে।
প্রযুক্তি ব্যবহার
দেশে স্মার্টফোন ব্যবহারের হার বাড়লেও, ৮২.৫ শতাংশ ব্যবহারকারীর ফোন ব্যবহারের মূল উদ্দেশ্য কেবল গেম খেলা বা বিনোদন।
জনগণের প্রত্যাশা
জরিপে অংশগ্রহণকারীরা অর্থনৈতিক উন্নয়ন, আইনের শাসন এবং দারিদ্র্য বিমোচনকে প্রধান অগ্রাধিকার দিয়েছেন। অন্যদিকে, রাজনৈতিক দলগুলোর অগ্রাধিকার দুর্নীতির দমন, সুশাসন এবং শান্তিপূর্ণ নির্বাচন।



