প্রবাদ আছে—কয়লা ধুলে নাকি ময়লা যায় না। এই প্রবাদ যেন বারবার প্রমাণিত হচ্ছে কক্সবাজার ট্যুরিস্ট পুলিশের এসপি (সুপারনিউমারারি অতিরিক্ত ডিআইজি) আপেল মাহমুদের ক্ষেত্রে। বঙ্গবন্ধুর নামে কক্সবাজার সৈকতের নামকরণ নিয়ে দেশব্যাপী আলোচনায় আসা এই পুলিশ কর্মকর্তা নানা সময় বিতর্কে জড়িয়েছেন। বারবার সমালোচনার মুখে পড়ে নিজেকে সংশোধনের প্রতিশ্রুতি দিলেও নতুন করে বিভিন্ন অভিযোগে জড়িয়ে পড়ার ঘটনা সামনে এসেছে। এ কারণে পুলিশ বাহিনীর মধ্যেই কেউ কেউ মন্তব্য করেন—‘কয়লা ধুলে আপেলের ময়লা যায় না।’
গত কয়েকদিন ধরে আবারও কক্সবাজারে আপেল মাহমুদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আড়ালে নানা অনিয়ম ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে তিনি জড়িয়ে পড়েছেন।
অনুমোদন ছাড়াই বিচ ভাড়া দেওয়ার অভিযোগ
সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটি ও কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের অনুমোদন ছাড়াই সৈকতের একটি অংশ ভাড়া দিয়ে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। উচ্ছেদের নামে কৌশল করে সৈকতে শতাধিক দোকান বসানোর সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে, যা সৈকতের পরিবেশ নষ্ট করছে বলে দাবি ব্যবসায়ীদের।
সম্প্রতি লাবণী থেকে কলাতলী পয়েন্ট পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকায় লোহার খুঁটি বসিয়ে একটি রড কোম্পানির বিজ্ঞাপন স্থাপন করা হয়। সেখানে দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যরা জানান, অ্যাডিশনাল ডিআইজি আপেল মাহমুদের নির্দেশেই ট্যুরিস্ট পুলিশ এই কাজে সহযোগিতা করেছে।
এ বিষয়ে কক্সবাজারের অতিরিক্ত ম্যাজিস্ট্রেট (এটিএম) শহিদুল ইসলাম বলেন, জেলা প্রশাসনের অনুমোদন ছাড়া সৈকত এলাকায় এ ধরনের বিজ্ঞাপন বসানোর সুযোগ নেই এবং এ বিষয়ে কোনো অনুমোদন দেওয়া হয়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ট্যুরিস্ট পুলিশের কয়েকজন সদস্য ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মকর্তা দাবি করেন, জেলা প্রশাসনের অনুমোদন না পাওয়ায় আপেল মাহমুদকে প্রায় ৩০ লাখ টাকা দিয়ে বিজ্ঞাপন বসানোর ব্যবস্থা করা হয়।
ওয়াচ টাওয়ার ও সরকারি স্থাপনা ভাড়া দেওয়ার অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য নির্মিত ওয়াচ টাওয়ার, অভিযোগ কেন্দ্র, পুলিশ বক্স এমনকি সরকারি জেট স্কিও অবৈধভাবে ভাড়া দিয়ে অর্থ নেওয়া হয়েছে। লাবণী পুলিশ ফাঁড়ির সামনে একটি ওয়াচ টাওয়ারকে রেস্টুরেন্টে রূপান্তর করে ভাড়া দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে অগ্রিম হিসেবে প্রায় ৮ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে বলে জানা যায়। পরে বিষয়টি আলোচনায় এলে সেটিকে ‘ট্যুরিস্ট পুলিশ ক্যান্টিন’ হিসেবে চালানো শুরু করা হয়।
অবৈধ ব্যবসা থেকে মাসোয়ারা নেওয়ার অভিযোগ
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, কটেজ জোনের অবৈধ স্পা সেন্টার ও পতিতালয় থেকে নিয়মিত মাসোয়ারা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে আপেল মাহমুদের বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিটি কটেজ বা অবৈধ প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে মাসে ২০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়। বিভিন্ন দালাল ও স্থানীয় কয়েকজনের মাধ্যমে এই অর্থ সংগ্রহ করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
ধর্ষণের অভিযোগ
এক নারীকে জিম্মি অবস্থা থেকে উদ্ধারের পর তার দেওয়া ভিডিও বার্তায় আপেল মাহমুদের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। ওই নারী দাবি করেন, তাকে জোরপূর্বক বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে বাধ্য করা হতো এবং কক্সবাজারে এক পর্যায়ে তাকে মাদক মিশ্রিত পানীয় খাইয়ে একটি হোটেলে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করা হয়।
নারী উদ্যোক্তাদের সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগ
কক্সবাজারে কয়েকজন নারী উদ্যোক্তা ও তরুণীর সঙ্গে আপেল মাহমুদের ঘনিষ্ঠতার অভিযোগও উঠেছে। কয়েকজন ভুক্তভোগী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কেউ কেউ ফ্ল্যাট দেওয়ার প্রতিশ্রুতি, আবার কেউ বিয়ের আশ্বাস দিয়ে প্রতারণার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন।
মাদক জব্দ করে আত্মসাৎ ও ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ
২০২৫ সালের ৭ নভেম্বর কক্সবাজারের একটি আবাসিক হোটেলে ইয়াবার চালানের খবর পেয়ে ট্যুরিস্ট পুলিশের একটি দল অভিযান চালায়। অভিযোগ রয়েছে, সেখানে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা পাওয়া গেলেও পরে মাত্র ২০০ পিস ইয়াবা জব্দ দেখিয়ে মামলা করা হয় এবং বিষয়টি মীমাংসার জন্য অর্থ লেনদেন হয়।
অভিযোগ অস্বীকার ও প্রতিক্রিয়া
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে এসপি আপেল মাহমুদ সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলার সময় নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন এবং ভুল বোঝাবুঝির কারণে বিষয়গুলো সামনে এসেছে বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে তা সংশোধনের চেষ্টা করবেন। সূত্র: যুগান্তর।



