tanaka
প্রচ্ছদআন্তর্জাতিকএআই খাতে ধস, যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজার থেকে উধাও ২.৫ ট্রিলিয়ন ডলার

এআই খাতে ধস, যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজার থেকে উধাও ২.৫ ট্রিলিয়ন ডলার

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের বড় জয়ের পর দেশটির শেয়ারবাজারে ব্যাপক দরপতন দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও প্রযুক্তি খাতের শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের ব্যাপক বিক্রির চাপে বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) বড় ধাক্কা খেয়েছে নাসডাক সূচক। ২০২৫ সালের এপ্রিলে ‘লিবারেশন ডে’র পর এক দিনে সূচকটির এটিই সবচেয়ে বড় পতন। এদিন নাসডাক-১০০ সূচকের বাজারমূল্য কমেছে ২ লাখ ৫০ হাজার কোটি ডলার। খবর রয়টার্সের।

বিনিয়োগকারীদের আশঙ্কা, নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড় জয় যুক্তরাষ্ট্রে এআই খাতের দ্রুত সম্প্রসারণে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে ডেটা সেন্টার নির্মাণে নতুন বিধিনিষেধ আরোপ এবং স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধিতা বাড়লে এ খাতে বড় বিনিয়োগের পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এর ফলে অর্থায়ন সংকটে থাকা ছোট প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।

বৃহস্পতিবার নাসডাক কম্পোজিট সূচক কমেছে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। এ নিয়ে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো এআই খাতের শেয়ারগুলোতে বড় ধরনের বিক্রির চাপ দেখা গেল। অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে এ পর্যন্ত পাঁচবার এক দিনে ৫০০ পয়েন্টের বেশি হারিয়েছে সূচকটি।

যুক্তরাষ্ট্রের কানেকটিকাট অঙ্গরাজ্যের স্ট্যামফোর্ডভিত্তিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান জোনসট্রেডিংয়ের প্রধান বাজার কৌশলবিদ মাইকেল ও’রুর্কের মতে, নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড় জয়, বিশেষ করে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে গভর্নর পদে দলটির সাফল্য, ডেটা সেন্টার নির্মাণের গতি কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে। বর্তমানে শেয়ারবাজারে এই আশঙ্কাই সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে।

গত ৬ অক্টোবর রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছানোর পর নাসডাক কম্পোজিট সূচক প্রায় ১২ শতাংশ কমেছে। ফলে সূচকটি এখন কারেকশন বা সংশোধনের পর্যায়ে রয়েছে। সাধারণত কোনো শেয়ারসূচক তার সাম্প্রতিক সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে ১০ শতাংশ বা তার বেশি কমে গেলে তাকে কারেকশন বলা হয়।

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, শেয়ারবাজারের এই দরপতনের প্রভাব এখনো পুরোপুরি কাটেনি। শুক্রবার এশিয়ার শেয়ারবাজারেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। চলতি বছর ২০ শতাংশের বেশি বেড়েছিল জাপানের নিক্কেই ও দক্ষিণ কোরিয়ার কোস্পি সূচক। তবে ডেটা সেন্টার খাতের শেয়ারে বুধবারের বড় দরপতনের পর এই দুই বাজারেও উল্লেখযোগ্য নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে।

এদিকে এআই খাতের চলমান অস্থিরতা আগামী শরতে প্রত্যাশিত অ্যানথ্রপিকের বড় প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওর সময়সূচি পিছিয়ে দিতে পারে কি না, তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। আইপিও পিছিয়ে গেলে প্রযুক্তি খাতের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থায় আরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

চিপ ও ডেটা সেন্টার খাতে বড় দরপতন

বৃহস্পতিবার সবচেয়ে বেশি দরপতন হয়েছে চিপ নির্মাতা ও নিওক্লাউড প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারে। বিনিয়োগকারীদের আশঙ্কা, রাজনৈতিক ও নিয়ন্ত্রক চাপের কারণে কয়েক বিলিয়ন ডলারের ডেটা সেন্টার নির্মাণ প্রকল্প বিলম্বিত হতে পারে।

এদিন ফিলাডেলফিয়া সেমিকন্ডাক্টর সূচক কমেছে ১২ শতাংশ। ছয় মাসেরও বেশি সময়ের মধ্যে এটিই সূচকটির সর্বনিম্ন অবস্থান। চিপ নির্মাতা এনভিডিয়ার শেয়ারের দাম কমেছে ৯ শতাংশ। অন্যদিকে অ্যাডভান্সড মাইক্রো ডিভাইসেসের (এএমডি) শেয়ারের দরপতন হয়েছে ১৭ শতাংশ।

বাজারে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগের প্রতিফলন দেখা গেছে ভিআইএক্স সূচকেও। শেয়ারবাজারের সম্ভাব্য অস্থিরতা পরিমাপের এই সূচক ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের পর এক দিনে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে।

বুধবারের দরপতনের পর যেসব বড় প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানের শেয়ার তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ছিল, বৃহস্পতিবার সেগুলোও বিক্রির চাপে পড়ে। অ্যামাজন ও অ্যালফাবেটের শেয়ারের দাম কমেছে ২ দশমিক ২ শতাংশ করে। বড় প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ে গঠিত নাসডাক-১০০ সূচক কমেছে ৬ দশমিক ৪ শতাংশ। এতে এক দিনেই সূচকটির বাজারমূল্য থেকে হারিয়ে গেছে ২ লাখ ৫০ হাজার কোটি ডলার।

ডেটা সেন্টার নির্মাণে বাধার আশঙ্কা

শুধু নির্বাচনের ফলাফলই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন এলাকায় ডেটা সেন্টার নির্মাণের বিরুদ্ধে স্থানীয় বাসিন্দাদের বিরোধিতাও বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। এসব স্থাপনা চালু করতে বিপুল বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। পাশাপাশি পানি ব্যবহারের পরিমাণ বাড়ায় স্থানীয় অবকাঠামো ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। ফলে নতুন প্রকল্পের অনুমোদন পাওয়া কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

ম্যাসাচুসেটসভিত্তিক গ্রানাইট ওয়েলথ ম্যানেজমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ব্রুস জারো বলেন, ডেটা সেন্টার কোথায় নির্মাণ করা হবে, তা নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক বিরোধিতা তৈরি হতে পারে। এসব স্থাপনা বিদ্যুৎ গ্রিড ও পানি সরবরাহব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে। অনেক প্রকল্পের অনুমোদন ইতিমধ্যে পাওয়া গেলেও আরও বহু প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। সেগুলোর অনুমোদন পাওয়া কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

ইউবিএসের বিশ্লেষকদের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ডেটা সেন্টারের যে নতুন সক্ষমতা যুক্ত হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে, তার প্রায় ৩০ শতাংশের নির্মাণকাজ স্থগিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এমন পরিস্থিতি বাস্তবায়িত হলে এ খাতের প্রবৃদ্ধি বড় ধরনের বাধার মুখে পড়তে পারে।

এর পাশাপাশি এআই প্রযুক্তির পেছনে বিপুল অর্থ বিনিয়োগের বিপরীতে প্রত্যাশিত মুনাফা কতটা পাওয়া যাবে, তা নিয়েও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সংশয় রয়েছে। প্রযুক্তিগত সম্ভাবনার পাশাপাশি বিনিয়োগের আর্থিক যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। এর সঙ্গে রাজনৈতিক ও নিয়ন্ত্রক অনিশ্চয়তা যুক্ত হওয়ায় প্রযুক্তি খাতের শেয়ারবাজারে চাপ আরও বেড়েছে।