গুম সংক্রান্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন: গুম সংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারির চূড়ান্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, গুমের শিকার হয়ে জীবিত ফিরে আসা ব্যক্তিদের মধ্যে ৭৫ শতাংশ জামায়াত-শিবিরের এবং ২২ শতাংশ বিএনপি ও তাদের অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী। অন্যদিকে, এখনো নিখোঁজ রয়েছেন যাদের মধ্যে ৬৮ শতাংশ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের এবং ২২ শতাংশ জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী।
রোববার (৪ জানুয়ারি) গুম তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে জমা দেওয়া হয়। কমিশন মোট ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগ যাচাই করে এর মধ্যে ১ হাজার ৫৬৯টি অভিযোগ সংজ্ঞা অনুযায়ী গুম হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এসবের মধ্যে ২৮৭টি অভিযোগ ‘মিসিং অ্যান্ড ডেড’ ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত।
প্রতিবেদন জমাদান অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কমিশনের সভাপতি বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী, সদস্য বিচারপতি মো. ফরিদ আহমেদ শিবলী, নূর খান লিটন, নাবিলা ইদ্রিস ও সাজ্জাদ হোসেন। এছাড়া উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান এবং প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব সিরাজউদ্দিন মিয়াও উপস্থিত ছিলেন।
প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার জানান, কমিশনের ধারণা অনুযায়ী দেশে গুমের প্রকৃত সংখ্যা চার থেকে ছয় হাজার পর্যন্ত হতে পারে। কমিশন সদস্য নাবিলা ইদ্রিস বলেন, অনেক ভুক্তভোগী বা তাদের পরিবার এখনো কমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। কেউ কেউ বিদেশে চলে গেছেন, আবার অনেকে নিরাপত্তাজনিত কারণে অনরেকর্ড কথা বলতে রাজি হননি।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, কয়েকটি হাই-প্রোফাইল গুমের ঘটনায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক এবং তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন—এমন প্রমাণ পাওয়া গেছে। এসব মামলার মধ্যে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী, সালাহউদ্দিন আহমদ, চৌধুরী আলম এবং জামায়াত নেতা সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহিল আমান আযমী, ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম ও সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামানের নাম উল্লেখযোগ্য।
কমিশনের মতে, গুমের শিকার কিছু ব্যক্তিকে আইনগত প্রক্রিয়া ছাড়াই ভারতে হস্তান্তরের (রেন্ডিশন) তথ্য পাওয়া গেছে, যা সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নির্দেশে সংঘটিত হয়েছে বলে ইঙ্গিত দেয়।
প্রতিবেদন গ্রহণ করে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস কমিশনের সদস্যদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, এটি একটি ঐতিহাসিক দলিল। গণতন্ত্রের নামে কীভাবে পৈশাচিক নির্যাতন চালানো হয়েছে, তার নির্মম দলিল এই প্রতিবেদন। ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের নৃশংসতা আর ফিরে না আসে, সে জন্য প্রতিকারমূলক ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
প্রধান উপদেষ্টা প্রতিবেদনগুলো সহজ ভাষায় জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সুপারিশমালা ও ভবিষ্যৎ করণীয় উপস্থাপনের নির্দেশ দেন। এছাড়া আয়নাঘরসহ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও লাশ গুমের ঘটনাস্থলগুলো ম্যাপিং করার নির্দেশনাও দেন।
কমিশনের তদন্তে বরিশালের বলেশ্বর নদী, বুড়িগঙ্গা নদী এবং মুন্সিগঞ্জ এলাকায় সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ড ও লাশ গুমের প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে জানানো হয়।
শেষে কমিশনের সদস্যরা বলেন, প্রধান উপদেষ্টার দৃঢ় অবস্থান ও সহযোগিতা ছাড়া এই কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হতো না। তারা জাতীয় মানবাধিকার কমিশন পুনর্গঠন এবং ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।



