জাতীয় নাট্যশালায় হল বরাদ্দের জটিলতা, পর্যাপ্ত রিহার্সাল কক্ষের অভাব, লাইট-সাউন্ডের দুরবস্থা এবং বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সার্বিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে ক্ষোভ জানিয়েছেন নাট্যাঙ্গনের কর্মী ও শিল্পীরা। তাদের অভিযোগ, এসব সমস্যার কারণে নিয়মিত নাট্যচর্চা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং প্রযোজনা মঞ্চায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।
রোববার সন্ধ্যায় জাতীয় নাট্যশালার সেমিনার কক্ষে ‘আসুন সকলে মিলিত হই, সংকট নিরসনে—সমাধান আনব মোরা সম্মিলিত প্রাণোচ্ছ্বাসে’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় এসব কথা উঠে আসে।
সভায় নাটকের জন্য হল বরাদ্দে সুস্পষ্ট ও স্বচ্ছ নীতিমালা তৈরি ও তা বাস্তবায়নের দাবি জানানো হয়। পাশাপাশি তিন মাসের হল বরাদ্দ একবারে দেওয়ার ব্যবস্থা এবং জাতীয় নাট্যশালার তিনটি হল নিয়মিত নাট্যচর্চার জন্য নির্ধারিত রাখার আহ্বান জানান বক্তারা।
নাট্যকর্মীরা অভিযোগ করেন, অনেক সময় হল বরাদ্দ পাওয়ার পরও নাটক মঞ্চায়নের মাত্র এক বা দুই দিন আগে সেটি বাতিল করা হয়। পরে সরকারি আয়োজনের কথা জানানো হয়। এতে নাট্যদলগুলো আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘদিনের প্রস্তুতিও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে। বক্তাদের মতে, এ পরিস্থিতির পরিবর্তন প্রয়োজন।
আলোচনায় অনুস্বর নাট্যদলের প্রধান মোহাম্মদ বারী বলেন, হল বরাদ্দ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের জটিলতা রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে শোয়ের দুই দিন আগেও দলকে জানানো হয়, নির্ধারিত স্থানে আর অনুষ্ঠান করা যাবে না। হল বরাদ্দের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে সংশ্লিষ্ট ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের রাখার আহ্বান জানান তিনি।
মোহাম্মদ বারী তিন মাসের হল বরাদ্দ একসঙ্গে দেওয়ার প্রস্তাব দেন। একই সঙ্গে শিল্পকলা একাডেমির বর্তমান ব্যবস্থাপনা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি।
নাট্যব্যক্তিত্ব মাসুম রেজা বলেন, জাতীয় নাট্যশালার কার্যকারিতা ও পরিচালনাপদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করতেই তিনি অনুষ্ঠানে এসেছেন। তার মতে, জাতীয় নাট্যশালার নাম ও উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সেখানে দেশের নাট্যধারা, সংস্কৃতি ও জাতীয় বৈশিষ্ট্য নিয়ে চর্চার পরিবেশ থাকা উচিত। কিন্তু বর্তমানে সেটি যথাযথভাবে হচ্ছে না বলে তিনি মন্তব্য করেন।
জাতীয় নাট্যশালার তিনটি হল নাটকের জন্য নির্ধারিত রাখার দাবি জানিয়ে মাসুম রেজা বলেন, নিয়মিতভাবে নাট্যচর্চার বাইরের আয়োজনের জন্য এসব হল বরাদ্দ দেওয়া উচিত নয়। স্কুল ও টেলিভিশন চ্যানেলসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে দীর্ঘ সময়ের জন্য হল বরাদ্দ দেওয়ার বিষয়েও তিনি আপত্তি জানান।
তিনি হল বরাদ্দ কমিটিকে আরও কার্যকর করার দাবি জানিয়ে বলেন, নাটকের জন্য হল ভাড়া দেওয়ার ক্ষেত্রে নাট্যচর্চার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। জাতীয় নাট্যশালার এসি, পরিবেশ ও অন্যান্য অব্যবস্থাপনাও তুলে ধরেন তিনি।
মাসুম রেজা আরও বলেন, এসব সমস্যা সমাধানের দাবিতে এর আগেও জাতীয় নাট্যশালার সামনে আন্দোলন হয়েছে। প্রয়োজন হলে সেখান থেকেই আবার দাবি আদায়ের কর্মসূচি নেওয়ার কথা জানান তিনি। গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন বিভিন্ন দাবি আন্দোলনের মাধ্যমেই আদায় করেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের সেক্রেটারি জেনারেল কামাল বায়েজিদ বলেন, গ্ল্যামার মিডিয়া, বিভিন্ন দূতাবাস ও টেলিভিশন চ্যানেলকে হল ভাড়া দেওয়ার কারণে নাট্যচর্চার জন্য নির্ধারিত জায়গা সংকুচিত হচ্ছে। হল বরাদ্দের ক্ষেত্রে নাট্যদলগুলোর প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানান তিনি।
তিনি আরও জানান, গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের একটি ক্লাবের জন্য বরাদ্দ থাকা একটি কক্ষও তারা ব্যবহার করতে পারছেন না। অথচ বাংলাদেশ মিউজিশিয়ান ফাউন্ডেশনের জন্য একটি কক্ষ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যেখানে তাদের কার্যক্রম নেই বলে তিনি দাবি করেন। নাটক, নৃত্য ও সংগীতের রিহার্সালের জন্যও পর্যাপ্ত পরিবেশ নেই বলে অভিযোগ করেন তিনি।
হল বরাদ্দ কমিটির কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন তোলেন গ্রুপ থিয়েটারের নেতা ও নাট্যতীর্থের দলপ্রধান তপন হাফিজ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনার সময় তিনি বলেন, কমিটিতে এনসিপি, ইনকিলাব মঞ্চ, জাসাসের প্রতিনিধিদের পাশাপাশি শিল্পকলা ও নাট্যাঙ্গনের প্রতিনিধিরাও রয়েছেন। তবে সেখানে নেওয়া সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত কার্যকর হচ্ছে না বলে দাবি করেন তিনি।
গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের নেতা খন্দকার শাহ আলম হল বরাদ্দ কমিটিতে নাট্যাঙ্গনের তিনজন ও শিল্পকলা একাডেমির দুজন প্রতিনিধি রাখার প্রস্তাব দেন। তার মতে, এ ধরনের কাঠামোতে কমিটি আরও কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে। সরকার পরিবর্তনের পরও হল বরাদ্দের ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত পরিবর্তন আসেনি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
শিল্পকলা একাডেমির সদ্য সাবেক মহাপরিচালক শেখ রেজাউদ্দিন স্ট্যালিনের বিরুদ্ধেও অভিযোগ তোলেন খন্দকার শাহ আলম। তার দাবি, মহাপরিচালক নিজস্ব পরিচিতদের হল বরাদ্দের সুযোগ দিয়েছেন এবং নিজে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে যুক্ত থেকেছেন। তিনি যেসব টেলিভিশনে কাজ করেন, সেসব প্রতিষ্ঠানকেও নাট্যশালায় আয়োজনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এ ছাড়া হাসপাতাল, দূতাবাস, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও গ্ল্যামার শোর মতো বিভিন্ন আয়োজনেও হল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন খন্দকার শাহ আলম। অথচ নাট্যদলগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী হল পাচ্ছে না বলে অভিযোগ করে তিনি এ পরিস্থিতির অবসান দাবি করেন।
আলোচনায় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মানজার চৌধুরী সুইট, লোকসংগীতশিল্পী বিশ্বজিৎ রায়, নাট্যকর্মী চন্দ্রদ্বীপ নিয়াজ, তৌফিকুর রহমান, মশিউর রহমান রানা, আবৃত্তিশিল্পী মাসুম আজিজুল বাশার, জয়িতা মহলানবিশ এবং নৃত্যশিল্পী উজ্জ্বল মণ্ডলসহ অন্যরা অংশ নেন।
তারা বলেন, নাট্যচর্চার সংকট শুধু হল বরাদ্দের মধ্যেই সীমিত নয়। রিহার্সাল কক্ষের স্বল্পতা, লাইট ও সাউন্ডের সমস্যা, এসি এবং সামগ্রিক পরিবেশের উন্নয়নও জরুরি। পাশাপাশি হল বরাদ্দে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং সুনির্দিষ্ট নীতিমালা কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দেন তারা।
সভাপতির বক্তব্যে গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের চেয়ারম্যান লাকী ইনাম বলেন, আলোচনায় উঠে আসা অভিযোগ ও সমস্যাগুলোর সমাধান সহজ নয়। তবে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এবং ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করলেই এসব জটিলতা মোকাবিলা করা সম্ভব।
প্রায় দুই ঘণ্টার এ আলোচনায় সিরাজগঞ্জ, ময়মনসিংহ, জামালপুর, লালমনিরহাটসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার নাট্যকর্মীরাও অংশ নেন।



