জনগণের দোরগোড়ায় আধুনিক চিকিৎসা সেবা পৌঁছে দিতে ‘ই-হেলথ কার্ড’ চালুর নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বুধবার (৪ মার্চ) দুপুরে সচিবালয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে এক বৈঠকে তিনি এই ডিজিটাল স্বাস্থ্য ব্যবস্থার রূপরেখা তুলে ধরেন।
এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা
প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন জানান, বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে স্বাস্থ্য খাতে বড় ধরনের সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
এই নিয়োগে ৮০ শতাংশ নারী এবং ২০ শতাংশ পুরুষ প্রার্থীকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের শূন্য পদে দ্রুত চিকিৎসক ও অন্যান্য জনবল নিয়োগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে বাস্তবায়ন
ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা চালুর অংশ হিসেবে প্রথমে একটি জেলাকে পাইলট প্রকল্প হিসেবে নির্বাচন করা হবে। ওই জেলায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে শুরু করে জেলা সদর হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ পর্যন্ত পুরো চিকিৎসা ব্যবস্থাকে ‘ই-হেলথ’ প্ল্যাটফর্মের আওতায় আনা হবে।
প্রধানমন্ত্রী দুর্গম এলাকায় চিকিৎসকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে মন্ত্রণালয়কে আরও সক্রিয় হওয়ার নির্দেশ দেন।
ই-হেলথ কার্ড কী?
ই-হেলথ কার্ড হলো একটি ডিজিটাল স্বাস্থ্য পরিচয়পত্র, যেখানে প্রতিটি রোগীর জন্য একটি ইউনিক আইডি থাকবে। এই কার্ডের মাধ্যমে রোগীর চিকিৎসা সংক্রান্ত সব তথ্য—রোগের ইতিহাস, পরীক্ষার রিপোর্ট ও প্রেসক্রিপশন—ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ করা হবে।
কোনো রোগী হাসপাতালে গেলে চিকিৎসক কার্ডটি ব্যবহার করে দ্রুত তার আগের চিকিৎসা তথ্য দেখতে পারবেন।
ই-হেলথ কার্ডের মূল সুবিধা
ই-হেলথ মূলত স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল করার একটি উদ্যোগ। এর মাধ্যমে নাগরিকরা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা পাবেন—
- মেডিকেল রেকর্ড সংরক্ষণ: রোগীর পূর্বের রোগের ইতিহাস, পরীক্ষার রিপোর্ট ও প্রেসক্রিপশন ডিজিটালভাবে সংরক্ষিত থাকবে।
- সহজ চিকিৎসা প্রক্রিয়া: যে কোনো হাসপাতালে গেলে চিকিৎসক দ্রুত রোগীর আগের তথ্য দেখতে পারবেন।
- রেফারেল নেটওয়ার্ক: প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে জেলা হাসপাতাল বা মেডিকেল কলেজ পর্যন্ত চিকিৎসা ব্যবস্থাকে একটি সমন্বিত নেটওয়ার্কে যুক্ত করা হবে।
- প্রান্তিক অঞ্চলে সেবা: দুর্গম এলাকার মানুষও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
রোগীরা যেসব সুবিধা পাবেন
ই-হেলথ কার্ড চালু হলে সাধারণ মানুষ চিকিৎসা ক্ষেত্রে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা পাবেন—
- রিপোর্ট বহনের ঝামেলা কমবে: এক্স-রে, এমআরআই বা রক্ত পরীক্ষার পুরোনো রিপোর্ট সঙ্গে রাখতে হবে না; কার্ড স্ক্যান করলেই সব তথ্য দেখা যাবে।
- ভুল চিকিৎসার ঝুঁকি কমবে: জরুরি অবস্থায় রোগী কথা বলতে না পারলেও তার অ্যালার্জি বা ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার তথ্য চিকিৎসক জানতে পারবেন।
- সমন্বিত রেফারেল ব্যবস্থা: উপজেলা হাসপাতাল থেকে বড় হাসপাতালে রোগী পাঠালে আগের চিকিৎসা তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে পৌঁছে যাবে।
- খরচ কমবে: একই পরীক্ষা বারবার করতে না হওয়ায় রোগীর সময় ও অর্থ সাশ্রয় হবে।
ডিজিটাল স্বাস্থ্য ব্যবস্থার পরিকল্পনা
সরকার জানিয়েছে, ই-হেলথ কার্ড চালুর জন্য দেশব্যাপী একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেস তৈরি করা হচ্ছে। প্রথমে পাইলট প্রকল্প হিসেবে নির্দিষ্ট এলাকায় এটি চালু করা হবে। পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে দেশের সব নাগরিককে এই সেবার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা চালু করা একটি সময়োপযোগী উদ্যোগ।
ই-হেলথ কার্ড নিয়ে সাধারণ প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন: ই-হেলথ কার্ড কী?
উত্তর: এটি একটি ডিজিটাল স্বাস্থ্য পরিচয়পত্র, যেখানে রোগীর চিকিৎসা ইতিহাস, পরীক্ষার রিপোর্ট ও প্রেসক্রিপশন সংরক্ষিত থাকে।
প্রশ্ন: এর প্রধান সুবিধা কী?
উত্তর: অন্য হাসপাতালে গেলে বা ডাক্তার পরিবর্তন করলে রোগীকে আর পুরোনো রিপোর্ট বহন করতে হবে না; কার্ড স্ক্যান করলেই সব তথ্য পাওয়া যাবে।
প্রশ্ন: সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ব্যবহার করা যাবে?
উত্তর: সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী একটি কেন্দ্রীয় সার্ভারের মাধ্যমে সব হাসপাতালকে এই ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হবে।
প্রশ্ন: কীভাবে কার্ড সংগ্রহ করা যাবে?
উত্তর: নির্দিষ্ট সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা অনলাইন নিবন্ধনের মাধ্যমে কার্ড পাওয়া যাবে। পাইলট প্রকল্প চালু হলে নির্দিষ্ট জেলার বাসিন্দারা আগে পাবেন।
প্রশ্ন: কার্ড হারিয়ে গেলে তথ্য কি হারাবে?
উত্তর: না। সব তথ্য নিরাপদ ক্লাউড সার্ভারে সংরক্ষিত থাকবে। নতুন কার্ড নিলেই আগের তথ্য ফিরে পাওয়া যাবে।
প্রশ্ন: ব্যক্তিগত তথ্য কি নিরাপদ থাকবে?
উত্তর: হ্যাঁ। নির্দিষ্ট অনুমতি বা নিরাপত্তা কোড ছাড়া ব্যক্তিগত মেডিকেল রেকর্ড কেউ দেখতে পারবে না।
প্রশ্ন: একই পরীক্ষা কি বারবার করতে হবে?
উত্তর: না। পূর্বের পরীক্ষার রিপোর্ট সংরক্ষিত থাকায় চিকিৎসক তা দেখে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
প্রশ্ন: এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ কবে হবে?
উত্তর: দ্রুত নিয়োগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিজ্ঞপ্তি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট বা সংবাদপত্রে প্রকাশ করা হবে।
প্রশ্ন: নারী-পুরুষের অনুপাত কেমন হবে?
উত্তর: পরিকল্পনা অনুযায়ী ৮০ শতাংশ নারী এবং ২০ শতাংশ পুরুষ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে।
প্রশ্ন: শিক্ষাগত যোগ্যতা কী লাগবে?
উত্তর: পদের ধরন অনুযায়ী যোগ্যতা ভিন্ন হবে; সাধারণত এইচএসসি থেকে স্নাতক পাশ প্রার্থীরা আবেদন করতে পারবেন।
প্রশ্ন: পাইলট প্রকল্প কোন জেলায় শুরু হবে?
উত্তর: এখনো নির্দিষ্ট জেলার নাম ঘোষণা করা হয়নি।
প্রশ্ন: দুর্গম এলাকায় কীভাবে সেবা পাওয়া যাবে?
উত্তর: কমিউনিটি ক্লিনিক ও অফলাইন ডাটা সিঙ্কের মাধ্যমে তথ্য আপডেট করা হবে।
প্রশ্ন: রেফারেল নেটওয়ার্ক কী?
উত্তর: ছোট হাসপাতাল থেকে বড় হাসপাতালে রোগী পাঠানো হলে তার চিকিৎসা তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেখানে পৌঁছে যাবে।
প্রশ্ন: কার্ডের জন্য কি ফি লাগবে?
উত্তর: প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রান্তিক জনগণের জন্য এটি বিনামূল্যে বা খুব কম মূল্যে দেওয়া হতে পারে।



