বিদেশে উচ্চশিক্ষা, অভিবাসন, ভ্রমণ কিংবা চাকরির জন্য অনেক ক্ষেত্রেই প্রয়োজন হয় পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সনদ। যথাযথ প্রক্রিয়ায় থানা, জেলা বা নগর পুলিশের যাচাই-বাছাই শেষে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই সনদ পাওয়া যায়। তবে এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছে একটি প্রতারকচক্র। এডিটিং সফটওয়্যারের মাধ্যমে স্ক্যান করা নথি পরিবর্তন, পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের ভুয়া সিল ও স্বাক্ষর ব্যবহার এবং নকল কিউআর কোড ও ওয়েবসাইট তৈরি করে তারা তৈরি করছে হুবহু আসল বলে মনে হওয়া পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সনদ।
শুধু তা-ই নয়, ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র ও জন্মনিবন্ধনের তথ্য ব্যবহার করেও যাচাই প্রক্রিয়াকে বিভ্রান্ত করছে চক্রটি। এসব জাল সনদ বিক্রি করে প্রতিটি ক্ষেত্রে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে লাখ টাকার বেশি।
গত ১৬ আগস্ট রাতে চট্টগ্রাম নগর ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে এমন একটি চক্রের চার সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন মো. আশরাফ আলী খান (৩৬), মো. নিশান (৩৬), মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন (৪৮) ও মো. আবদুর রহমান (৪৬)।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, আশরাফ আলী খান রাঙ্গুনিয়া থানার রাজানগর ইউনিয়নের বগাবিল এলাকার বাসিন্দা। মো. নিশানের বাড়ি সন্দ্বীপ পৌরসভার হরিষপুর এলাকায়। আবদুল্লাহ আল মামুন রাঙ্গুনিয়ার মধ্যম ঘাগড়া এবং আবদুর রহমান বাঁশখালী পৌরসভার দক্ষিণ জলদি এলাকার বাসিন্দা।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, পুলিশের কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা ছাড়াই প্রতারণার মাধ্যমে চক্রটি জাল পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সনদ তৈরি করে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছিল।
পুলিশ জানায়, জাল সনদ নিয়ে কারা বিদেশে যাচ্ছেন, তা যাচাই করার কার্যকর তৃতীয় কোনো কর্তৃপক্ষ না থাকায় প্রতারণার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ফলে আসল সনদের আদলে তৈরি জাল কাগজপত্র ব্যবহার করে সহজেই বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা করছে অনেকে। একটি জাল পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সনদ তৈরির জন্য চক্রটি এক লাখ টাকারও বেশি নিত।
১ লাখ ২৩ হাজার টাকায় জাল সনদ
পুলিশের তদন্তে জানা গেছে, সম্প্রতি বাঁশখালীর জাকির হোসেনের বিদেশ যাওয়ার জন্য পুলিশ ক্লিয়ারেন্সের প্রয়োজন হয়। মামলা থাকায় তিনি সরাসরি পুলিশের কাছে আবেদন না করে পরিচিত এক ব্যক্তির মাধ্যমে দ্রুত সনদ পাওয়ার চেষ্টা করেন।
চক্রের সদস্য আবদুর রহমান তাকে দ্রুত পুলিশ ক্লিয়ারেন্স দেওয়ার আশ্বাস দেন। এ জন্য জাকিরের কাছ থেকে মোট ১ লাখ ২৩ হাজার টাকা নেওয়া হয়। গত ২১ জুলাই তিনি ৮০ হাজার টাকা অগ্রিম দেন। পরে ১২ আগস্ট তাকে একটি পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সনদ দেওয়া হয় এবং বাকি টাকা পরিশোধ করেন তিনি।
সনদটি দেখতে ছিল অনেকটাই আসল। এতে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের সই ও সিলের পাশাপাশি ছিল কিউআর কোড। কিউআর কোড স্ক্যান করলেও বাংলাদেশ পুলিশের ওয়েবসাইটের আদলে তৈরি একটি নকল ওয়েবসাইটে গিয়ে সনদটির তথ্য দেখা যাচ্ছিল। ফলে সাধারণভাবে দেখে এটিকে জাল হিসেবে শনাক্ত করা কঠিন ছিল।
জাকির হোসেন পরে সনদটি একটি ট্রাভেল এজেন্সিতে জমা দেন। সেখানে যাচাইয়ের সময় জালিয়াতির বিষয়টি ধরা পড়ে। এরপর তিনি চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগের ভিত্তিতেই প্রতারকচক্রের সন্ধানে নামে পুলিশ।
জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, জাকিরের অভিযোগ পাওয়ার পর গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত শুরু করা হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই চক্রটির চার সদস্যকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে। বাকি সদস্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী বাঁশখালী থানায় মামলা করেছেন।
তিনি জানান, জাকিরের কাছ থেকে চক্রটি ১ লাখ ২৩ হাজার টাকা নিলেও জাল সনদ তৈরি এবং নকল ওয়েবসাইটে সেটি প্রদর্শনের ব্যবস্থা করতে তাদের খরচ হয়েছে মাত্র ৩ হাজার টাকা। অর্থাৎ বাকি প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকাই ছিল তাদের লাভ।
কয়েক স্তরে ভাগ হয়ে কাজ
অতিরিক্ত চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার (ট্রাফিক) রাসেল জানান, জাকির হোসেন কথিত পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সনদটি নিয়ে পুলিশের কাছে আসার পর কিউআর কোড পরীক্ষা করা হয়। স্ক্যান করলে বাংলাদেশ পুলিশের ওয়েবসাইটের আদলে তৈরি একটি ক্লোন ওয়েবসাইটে সনদটি প্রদর্শিত হচ্ছিল।
তিনি বলেন, চক্রটিতে কয়েকটি স্তরে লোকজন কাজ করে। তাদের মধ্যে কেউ দালাল হিসেবে গ্রাহক সংগ্রহ করে, আবার কেউ অনলাইনে নকল ওয়েবসাইট, কিউআর কোডসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিগত বিষয় তৈরি করে। গ্রেপ্তার চারজন মূলত দালাল হিসেবে কাজ করছিল।
মামলা থাকায় সরাসরি আবেদন করেননি জাকির
জাকির হোসেনের ভাই নূর হোসেন জানান, তার ভাইয়ের নামে থানায় একটি ফৌজদারি মামলা রয়েছে। বিদেশ যাওয়ার জন্য পুলিশ ক্লিয়ারেন্স প্রয়োজন হলেও মামলার কারণে তারা সরাসরি পুলিশের কাছে আবেদন করেননি।
পরিচিত এক ব্যক্তি বাঁশখালীর একটি ট্রাভেল এজেন্সিতে চাকরি করতেন। তার মাধ্যমে সহায়তা নেওয়ার চেষ্টা করেন তারা। ওই ব্যক্তির মাধ্যমে আবদুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। আবদুর রহমান ১ লাখ ২৩ হাজার টাকায় পুলিশ ক্লিয়ারেন্স এনে দেওয়ার কথা জানান।
চুক্তি অনুযায়ী, গত ২১ জুলাই ৮০ হাজার টাকা অগ্রিম দেওয়া হয়। ১২ আগস্ট কথিত পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সনদ হাতে পাওয়ার পর বাকি টাকা পরিশোধ করা হয়।
ঘরে বসেই আবেদন করা যায়
পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সনদ পেতে এখন আর থানায় থানায় ঘুরতে হয় না। অনলাইনে আবেদন করেই নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় এই সনদ সংগ্রহ করা যায়।
বিদেশগামী এবং বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিকরা দেশে বা বিদেশে যেকোনো স্থান থেকে ইন্টারনেটের মাধ্যমে পুলিশ ক্লিয়ারেন্সের জন্য আবেদন করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পুলিশের অনুমোদিত ওয়েবসাইট ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়েছে পুলিশ।
একই সঙ্গে কোনো ব্যক্তি বা দালালের মাধ্যমে দ্রুত পুলিশ ক্লিয়ারেন্স পাওয়ার প্রলোভনে পড়ে টাকা না দিয়ে সরকারি নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় আবেদন করার আহ্বান জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।



