বাংলাদেশ ও ভারতের নৌসচিব পর্যায়ের বৈঠক আয়োজনের জন্য বারবার কূটনৈতিক চিঠি (নোট ভারবাল) পাঠাচ্ছে ভারত। চলতি বছর এ পর্যন্ত অন্তত তিনটি চিঠি দিয়েছে দেশটি। সর্বশেষ চিঠিতে আগামী ১ অক্টোবরের মধ্যে বৈঠক আয়োজনের জন্য সম্ভাব্য তিনটি তারিখও প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে এ মুহূর্তে বৈঠকে বসার বিষয়ে বাংলাদেশের আগ্রহ তুলনামূলকভাবে কম।
নৌসচিব পর্যায়ের বৈঠক না হওয়ায় নৌপথে পণ্য পরিবহণসংক্রান্ত প্রটোকল (পিআইডব্লিউটিঅ্যান্ডটি) চুক্তির আওতাধীন ‘স্ট্যান্ডিং কমিটি’ এবং চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহার করে ভারতের পণ্য পরিবহণ বা ট্রান্সশিপমেন্টসংক্রান্ত চুক্তির আওতাধীন আন্তঃসরকার কমিটির বৈঠকও হচ্ছে না। সাধারণত এসব বৈঠক একই সময়ে অনুষ্ঠিত হয়। সর্বশেষ ২০২৩ সালে ঢাকায় এসব বৈঠক হয়েছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আর বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সূত্র জানায়, ২০২৩ সালের পর থেকে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে পর্যটকবাহী জাহাজ বা ক্রুজ চলাচল বন্ধ রয়েছে। ২০২৪ সালের পর বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে ভারত কোনো পণ্য ট্রান্সশিপমেন্টও করেনি। তবে পিআইডব্লিউটিঅ্যান্ডটি চুক্তির আওতায় দুই দেশের মধ্যে নৌপথে পণ্য আমদানি-রপ্তানি অব্যাহত রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে নৌপথে মোট ৪২ লাখ ৭০ হাজার ৯৯৩ টন পণ্য পরিবহণ হয়েছে।
ধীরে চলো নীতিতে ঢাকা
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, ভারতের সঙ্গে নৌসচিব পর্যায়ের বৈঠকের ক্ষেত্রে ‘ধীরে চলো’ নীতি অনুসরণ করছে ঢাকা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের সময়সূচি চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত নৌসচিব পর্যায়ের বৈঠক আয়োজনের বিষয়ে বাংলাদেশের তেমন আগ্রহ নেই। এমনকি বৈঠক আয়োজনের জন্য নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়ের প্রস্তুতিও এখনো পর্যাপ্ত পর্যায়ে পৌঁছেনি।
এ পর্যন্ত মন্ত্রণালয়ে এ বিষয়ে একটি সংক্ষিপ্ত বৈঠক হয়েছে। তবে নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন সংস্থা নিজেদের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে।
এদিকে আগামী ৭ থেকে ৯ অক্টোবর দিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ‘সাগরমন্থন: দ্য গ্রেট ওশেনস ডায়ালগ’-এ অংশ নিতে নৌপরিবহণমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে ভারত। কয়েক দিনের মধ্যে ঢাকায় নৌমন্ত্রীর সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদীর সৌজন্য সাক্ষাতের কথা রয়েছে। ওই বৈঠকে বাংলাদেশ-ভারত নৌসচিব পর্যায়ের বৈঠকের বিষয়টিও আলোচনায় আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
নৌসচিব পর্যায়ের বৈঠকের সম্ভাব্য সময়সূচি জানতে চাইলে নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়ের সচিব জাকারিয়া যুগান্তরকে বলেন, ভারত বৈঠকের জন্য প্রস্তাব পাঠিয়েছে। তবে এখনো সম্ভাব্য সময় নির্ধারণ করা হয়নি। তারা বৈঠকের প্রস্তুতি নিচ্ছেন এবং প্রস্তুতি আরও এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বিদ্যমান সমঝোতা স্মারক ও চুক্তিগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে। আগের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে এসব বিষয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।
এবার বৈঠক হওয়ার কথা দিল্লিতে
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ২০২৩ সালের বৈঠক ঢাকায় অনুষ্ঠিত হওয়ায় নিয়ম অনুযায়ী এবার বৈঠক হওয়ার কথা দিল্লিতে। নৌসচিবের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিতব্য এ বৈঠকে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার কর্মকর্তারা অংশ নেবেন।
সাধারণত দুই দিনে নৌসচিব পর্যায়ের বৈঠক, স্ট্যান্ডিং কমিটি এবং আন্তঃসরকার কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। এসব বৈঠকে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে স্থলবন্দর নির্মাণসংক্রান্ত জটিলতা, চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহার করে পণ্য পরিবহণ, উপকূলীয় নৌপথে পণ্য পরিবহণ, পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল এবং অভ্যন্তরীণ নৌপথে পণ্য পরিবহণসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
এসব বৈঠক আয়োজনের জন্য চলতি বছরের ২৮ এপ্রিল, ২৫ জুন ও ১১ আগস্ট বাংলাদেশকে চিঠি দিয়েছে ঢাকায় অবস্থিত ভারতীয় হাইকমিশন।
সর্বশেষ চিঠির পর সীমান্তের ১৫০ গজের মধ্যে স্থাপনা নির্মাণসংক্রান্ত ঝুলে থাকা সমস্যা, দুই দেশের নৌরুটগুলোর বর্তমান অবস্থা, আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থা, স্থলবন্দরগুলোর বিভিন্ন সমস্যা এবং দুই দেশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি সম্পর্কে তথ্য চেয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এ বিষয়ে নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়কে প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে বলা হয়েছে।
যেসব চুক্তি রয়েছে
নৌপথে পণ্য ও যাত্রী পরিবহণের ক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের একাধিক চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন দ্য ইউজ অব চট্টগ্রাম অ্যান্ড মোংলা পোর্টস ফর মুভমেন্ট অব গুডস টু অ্যান্ড ফ্রম ইন্ডিয়া’ (এসিএমপি), ‘কোস্টাল শিপিং অ্যাগ্রিমেন্ট’ (সিএসএ), ‘প্রটোকল অন ইনল্যান্ড ওয়াটার ট্রানজিট অ্যান্ড ট্রেড’ (পিআইডব্লিউটিঅ্যান্ডটি) এবং দুই দেশের মধ্যে নৌপথে যাত্রী ও পর্যটক চলাচলসংক্রান্ত সমঝোতা স্মারক।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, এসিএমপির আওতায় ভারত বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে দেশটির এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে পণ্য পরিবহণ করত। এর বিনিময়ে বাংলাদেশ নির্ধারিত মাশুল পেয়ে থাকে।
নদীর ওপর বাঁধ নির্মাণ করে পালাটানা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভারী যন্ত্রপাতি আশুগঞ্জ হয়ে পরিবহণের ঘটনায় বাংলাদেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছিল। এরপর থেকে এ ধরনের ট্রান্সশিপমেন্ট আর হয়নি। তবে সম্প্রতি ভারতের একটি নামকরা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ হয়ে তাদের পণ্য ট্রান্সশিপমেন্টের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বিষয়টি নিয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও থাকছে একাধিক প্রস্তাব
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ভারতের সঙ্গে সম্ভাব্য বৈঠকে আলোচনার জন্য বেশ কয়েকটি বিষয় এজেন্ডায় অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তুতি নিচ্ছে নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়ের অধীন সংস্থাগুলো।
চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ এসিএমপির কয়েকটি ধারা পর্যালোচনার প্রস্তাব দিতে পারে। বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ সাতক্ষীরার ভোমরা ও লালমনিরহাটের বুড়িমারী স্থলবন্দরে কিছু স্থাপনা নির্মাণসহ একাধিক বিষয় আলোচনায় তুলতে চায়।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণ কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) দুই দেশের মধ্যে চলাচলকারী নৌযানের ক্রুদের ল্যান্ডিং পাস, বাংলাদেশি জাহাজের ওপর ভারতের অতিরিক্ত চার্জ প্রত্যাহার, ধুলিয়া-ময়া-সুলতানগঞ্জ-রাজশাহী ও আরিচা নৌপথে পর্যাপ্ত পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করা এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার সময় বাংলাদেশি জাহাজের জন্য নিরাপদ আশ্রয় বা শেল্টার নির্ধারণসহ বেশ কিছু বিষয় এজেন্ডায় রাখতে চায়।
এ ছাড়া সমুদ্রগামী জাহাজে কর্মরত বাংলাদেশি নাবিকদের জন্য ভারতের ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করার পুরোনো প্রস্তাবটিও আবার আলোচনায় তুলতে চায় নৌপরিবহণ অধিদপ্তর।
ফলে দিল্লি দ্রুত বৈঠক আয়োজনের জন্য চাপ দিলেও ঢাকা এখনই তাতে সাড়া দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর এবং দুই দেশের সামগ্রিক কূটনৈতিক সম্পর্কের গতিপ্রকৃতির ওপর নৌসচিব পর্যায়ের বৈঠকের সময়সূচিও অনেকটা নির্ভর করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।



