tanaka

ভারতে নানকের কাছে মাসে যায় কোটি টাকা, নেপথ্যে কারা

পলাতক আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানকের কাছে বাংলাদেশ থেকে নিয়মিত হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, বরিশাল ও...
প্রচ্ছদআন্তর্জাতিকরাশিয়া-চীন ঘনিষ্ঠতায় বদলে যাচ্ছে শক্তির সমীকরণ, কী করবে যুক্তরাষ্ট্র?

রাশিয়া-চীন ঘনিষ্ঠতায় বদলে যাচ্ছে শক্তির সমীকরণ, কী করবে যুক্তরাষ্ট্র?

বিশ্ব রাজনীতিতে দ্রুত বদলে যাচ্ছে শক্তির সমীকরণ। একদিকে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সংঘাত, অন্যদিকে ইউক্রেন যুদ্ধ—সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তৈরি হয়েছে নতুন অনিশ্চয়তা। এর মধ্যেই রাশিয়া ও চীনের পারস্পরিক ঘনিষ্ঠতা আরও জোরদার হচ্ছে। একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে দেশ দুটির সামরিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতাও বাড়ছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন প্রচলিত বিশ্বব্যবস্থার সামনে তৈরি হচ্ছে নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ।

নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলন এই পরিবর্তিত বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিচ্ছবি। রাশিয়া, চীন ও ইরানের পাশাপাশি ভারতও সম্মেলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। আলোচনায় জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার, উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি, সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর মতো বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে।

রাশিয়া-চীন সম্পর্কে নতুন মাত্রা

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর কয়েক দশক ধরে বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ছিল ব্যাপক। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন ও রাশিয়ার অর্থনৈতিক, সামরিক ও কৌশলগত শক্তি বৃদ্ধির ফলে সেই একক প্রভাবের কাঠামোয় পরিবর্তনের আভাস স্পষ্ট হচ্ছে।

ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে রাশিয়া চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক আরও গভীর করেছে। অন্যদিকে চীন রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য, জ্বালানি ও বিভিন্ন কৌশলগত ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়িয়েছে। পাশাপাশি উত্তর কোরিয়ার সঙ্গেও রাশিয়ার সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়েছে।

রাশিয়া, চীন ও উত্তর কোরিয়া—তিন দেশই পারমাণবিক শক্তিধর হওয়ায় তাদের পারস্পরিক সহযোগিতা যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত বিবেচনায় পরিণত হয়েছে।

ইরানকে ঘিরে বাড়ছে কৌশলগত চাপ

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ইরান ব্রিকসের সদস্য হওয়ায় এই সংঘাতের প্রভাব সংগঠনটির অভ্যন্তরীণ আলোচনাতেও পড়ছে। রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে ইরানের সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কও দীর্ঘদিনের।

বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে অস্থিতিশীলতা বাড়লে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও পণ্য পরিবহনে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।

এ অবস্থায় ইরানের সঙ্গে রাশিয়া ও চীনের ঘনিষ্ঠতা ওয়াশিংটনের জন্য নতুন কৌশলগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কেও টানাপোড়েন

একসময় ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ককে ওয়াশিংটনের এশিয়া নীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হতো। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের সম্পর্কে কিছুটা টানাপোড়েন দেখা যাচ্ছে।

রাশিয়া থেকে ভারতের তেল আমদানি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ এবং শুল্কনীতি নিয়ে দিল্লির অসন্তোষ প্রকাশ্যে এসেছে। একই সঙ্গে ভারত-পাকিস্তান সংঘাত বন্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতার দাবি নিয়েও নয়াদিল্লির সঙ্গে ওয়াশিংটনের মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে সীমান্ত নিয়ে দীর্ঘদিনের উত্তেজনার পর ভারত ও চীনও সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নিয়েছে। চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ভারত সফরও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বার্তা দিয়েছে।

ফলে ভারত যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হলেও একই সঙ্গে রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে নিজস্ব কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখছে। নয়াদিল্লির এই ভারসাম্যপূর্ণ নীতি বিশ্ব রাজনীতিতে ভারতের স্বতন্ত্র অবস্থানকেই তুলে ধরছে।

পশ্চিমা জোটেও দেখা দিচ্ছে মতপার্থক্য

শুধু প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর উত্থান নয়, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা জোটের মধ্যেও নানা বিষয়ে মতপার্থক্য বাড়ছে।

ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে শুল্কনীতি, বাণিজ্য ও নিরাপত্তা ইস্যুতে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরোধ তৈরি হয়েছে। ন্যাটোর ব্যয় ও দায়িত্ব ভাগাভাগি নিয়েও যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ডেনমার্কের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনাও মিত্রদের মধ্যে অস্বস্তি বাড়িয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিয়েও ইউরোপীয় দেশগুলোর অবস্থান সবসময় ওয়াশিংটনের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে পশ্চিমা জোট আগের মতো অভিন্ন অবস্থানে আছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

ব্রিকস কি নতুন বিশ্বব্যবস্থার ভিত্তি তৈরি করছে?

নয়াদিল্লি ঘোষণায় ব্রিকস নেতারা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। বিশেষ করে আফ্রিকা, এশিয়া, লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর দাবি জানানো হয়েছে।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে স্থানীয় মুদ্রার ব্যবহার বাড়ানোর পক্ষেও অবস্থান নিয়েছে ব্রিকসের সদস্যরা। এর অর্থ সরাসরি মার্কিন ডলারকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য থেকে সরিয়ে দেওয়া নয়; বরং বৈশ্বিক বাণিজ্য ও আর্থিক ব্যবস্থায় বিকল্প কাঠামো তৈরির চেষ্টা।

একই সঙ্গে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সংস্কার এবং স্বচ্ছ, উন্মুক্ত ও নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক বাণিজ্যব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে ব্রিকস।

ব্রিকস কি পশ্চিমবিরোধী জোট?

ব্রিকসকে অনেক সময় পশ্চিমবিরোধী জোট হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও বাস্তবতা আরও জটিল। চীন ও রাশিয়া নিঃসন্দেহে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমাতে ব্রিকসকে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বিবেচনা করে। তবে ভারতসহ অনেক সদস্য দেশ সরাসরি পশ্চিমবিরোধী অবস্থান নিতে আগ্রহী নয়।

ভারতের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় রাখা। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা, অন্যদিকে রাশিয়া, চীন ও অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের সঙ্গে সম্পর্ক—এই ভারসাম্য বজায় রাখাই নয়াদিল্লির নীতির গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।

তাই ব্রিকসকে এখনো ন্যাটো বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো সামরিক কিংবা রাজনৈতিক জোট হিসেবে দেখা যায় না। বরং এটি অর্থনীতি, বাণিজ্য ও বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা নিয়ে সহযোগিতার একটি বহুপক্ষীয় প্ল্যাটফর্ম।

কোন পথে যাবে যুক্তরাষ্ট্র?

রাশিয়া-চীন ঘনিষ্ঠতা, ইরানকে ঘিরে সংঘাত, ভারতের সঙ্গে টানাপোড়েন এবং ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে মতপার্থক্য—সব মিলিয়ে ওয়াশিংটনের সামনে একাধিক কৌশলগত চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্র এখনো বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতি, শক্তিশালী সামরিক সক্ষমতা এবং বিস্তৃত আন্তর্জাতিক মিত্রজোটের অধিকারী। ফলে রাতারাতি বিশ্ব নেতৃত্ব হারানোর সম্ভাবনা নেই। কিন্তু বিশ্ব রাজনীতি যে ধীরে ধীরে একক আধিপত্য থেকে আরও বহুমেরু ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে, তার ইঙ্গিত ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে।

রাশিয়া-চীনের ঘনিষ্ঠতা, ইরানের সঙ্গে সহযোগিতা এবং ভারতের কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষার নীতি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন শক্তিকেন্দ্রের উত্থানের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ব্রিকস এই পরিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হয়ে উঠেছে।

পরিবর্তিত এই বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রের সামনে চ্যালেঞ্জ শুধু সামরিক শক্তি ধরে রাখা নয়; বরং কূটনীতি, বাণিজ্যনীতি এবং মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ককে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলাও জরুরি হয়ে উঠতে পারে।

সূত্র: আল-জাজিরা, রয়টার্স, এনডিটিভি