tanaka

ডিসেম্বর ঘিরে রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনা চলছে নানা হিসাব-নিকাশ

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই মুহূর্তে সবচেয়ে আলোচিত শব্দগুলোর একটি ‘ডিসেম্বর’। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে...
প্রচ্ছদরাজনীতিভারতে নানকের কাছে মাসে যায় কোটি টাকা, নেপথ্যে কারা

ভারতে নানকের কাছে মাসে যায় কোটি টাকা, নেপথ্যে কারা

পলাতক আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানকের কাছে বাংলাদেশ থেকে নিয়মিত হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, বরিশাল ও ঢাকার বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বাড়ি ও সম্পত্তি থেকে পাওয়া আয়ের একটি অংশ দুই হুন্ডি ব্যবসায়ী এবং বেনাপোলের একটি মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গে পৌঁছাচ্ছে। এ অর্থ ভারতে পাঠানোর পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে নানকের তিন ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি জড়িত বলে দাবি করা হয়েছে।

কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকার ডিজিটাল মাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশ থেকে পশ্চিমবঙ্গে যাওয়ার বিষয়ে নিজের বক্তব্য তুলে ধরেছিলেন নানক। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৬ আগস্ট পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশেই ছিলেন। ওই দিন তামাবিল সীমান্ত দিয়ে ভারতের শিলংয়ে প্রবেশ করেন। পরে মালদা হয়ে কলকাতায় যান। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশ ছাড়ার পরিকল্পনায় তার মেয়ে রাখির স্বামী চিকিৎসক নাজমুল ভূমিকা রাখেন।

তবে ওই সাক্ষাৎকারে কলকাতায় তার অবস্থানের বিষয়ে কিছু তথ্য উল্লেখ করা হয়নি বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, কলকাতার অভিজাত তপসিয়া এলাকায় নানক ও তার স্ত্রীর থাকার জন্য আগে থেকেই একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ভাড়া করা হয়েছিল। সেখানে ওঠার পর মাঝেমধ্যে তাদের কলকাতার বিভিন্ন অভিজাত শপিংমলে দেখা যায় বলেও দাবি করা হয়েছে।

প্রতিবেদনটির দাবি, বাংলাদেশ থেকে প্রতি মাসে বিপুল পরিমাণ অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে বরিশাল ও ঢাকা থেকে নানকের কাছে পাঠানো হচ্ছে।

নেপথ্যে সাবেক বিশ্ববিদ্যালয় কর্মকর্তা

সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ পদ থেকে অবসর নেওয়ার পর নানকের মালিকানাধীন একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি করা এক ব্যক্তি পুরো অর্থ পাঠানোর প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আন্দোলনের মুখে তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি ছাড়তে হলেও নানকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বজায় রেখে তিনি আগের মতোই কার্যক্রম পরিচালনা করছেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

বরিশাল নগরীর সদর রোড ও কাঠপট্টি এলাকার দুই হুন্ডি ব্যবসায়ীর মাধ্যমে ভারতে অর্থ পাঠানো হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। তাদের একজন হোটেল ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত এবং অন্যজন স্বর্ণ ব্যবসার আড়ালে হুন্ডি ব্যবসা পরিচালনা করেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

নানকের মালিকানাধীন বিভিন্ন ভবনের ভাড়া থেকে পাওয়া অর্থ ওই দুই হুন্ডি ব্যবসায়ীর কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। পরে তাদের মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গে রুপিতে অর্থ পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঢাকার আয়ও যাচ্ছে ভারতে

নানকের মালিকানাধীন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আয় থেকেও একটি অংশ ভারতে পাঠানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। পাশাপাশি ঢাকায় থাকা তিনটি বাড়িসহ বিভিন্ন ব্যবসা ও সম্পত্তি থেকে পাওয়া আয়ও একই প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গে পাঠানো হচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে।

এ ক্ষেত্রে বেনাপোল সীমান্ত এলাকার একটি মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানের মালিককে ব্যবহার করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ঢাকার বিভিন্ন উৎস থেকে তার যশোরের ব্যাংক হিসাবে অর্থ পাঠানোর পর পশ্চিমবঙ্গে থাকা তার এজেন্টের মাধ্যমে রুপিতে সেই অর্থ নানকের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ।

ঢাকার আয় পশ্চিমবঙ্গে পাঠানোর বিষয়টি নানকের এক ছোট ভাই দেখভাল করেন বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

১৬ বছরে সম্পদ বেড়েছে বহুগুণ

প্রতিবেদন অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের ১৭ বছরে জাহাঙ্গীর কবির নানকের সম্পদ ও অর্থবিত্ত উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বরিশাল নগরীর বটতলা এলাকার বাসিন্দা নানক ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে ঢাকার মোহাম্মদপুর আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

২০০৮ সালের নির্বাচনে দেওয়া হলফনামায় নানক ও তার স্ত্রীর মোট সম্পদের পরিমাণ ৬৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা দেখানো হয়েছিল। ২০২৪ সালের নির্বাচনের হলফনামায় সেই সম্পদের পরিমাণ দেখানো হয় প্রায় ১৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ ১৬ বছরের ব্যবধানে হলফনামায় ঘোষিত সম্পদ প্রায় ৩০ গুণ বেড়েছে।

তবে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, নানক পরিবারের প্রকৃত সম্পদের পরিমাণ ঘোষিত সম্পদের চেয়ে অনেক বেশি এবং এর মূল্য শত কোটি টাকারও বেশি।

বরিশাল নগরীর নথুল্লাবাদ এলাকায় নানক দম্পতির মালিকানাধীন ‘গ্লোবাল ভিলেজ’ নামের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য নির্বাচনী হলফনামায় উল্লেখ করা হয়নি বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। একইভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়-ব্যয়ের হিসাব জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

বরিশালের প্রবেশদ্বার দোয়ারিকা সেতু এলাকায় প্রায় ৮ একর জমির মালিকানার বিষয়টিও হলফনামায় উল্লেখ করা হয়নি বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

হলফনামায় বরিশাল নগরীতে দুটি বাড়ি, মাছের খামারসহ ২ একর ২২ শতাংশ জমির তথ্য দেওয়া হলেও এসব সম্পত্তিতে থাকা বিভিন্ন ভবন এবং সেখান থেকে পাওয়া ভাড়ার আয় সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি বলে প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে।

এ ছাড়া ঢাকার কলাবাগান, কক্সবাজার ও কুয়াকাটাসহ বিভিন্ন এলাকায় নানকের নামে-বেনামে আরও সম্পদ রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

সম্পত্তি থেকে মাসে কোটি টাকার আয়?

২০২৪ সালের নির্বাচনী হলফনামায় বরিশালে দুটি বাড়ির পাশাপাশি রাজধানীর উত্তরায় একটি ছয়তলা এবং মোহাম্মদপুরে একটি আটতলা ভবনের তথ্য দিয়েছিলেন নানক।

প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরও নানকের এসব সম্পত্তিতে বড় ধরনের কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। ফলে ভবনগুলো থেকে নিয়মিত ভাড়া আদায় হচ্ছে। পাশাপাশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও প্রতি মাসে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আয় হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বরিশালের রুপাতলী, মতাসার, সার্কুলার রোড ও করিম কুটিরসহ বিভিন্ন এলাকায় নানকের জমিতে থাকা ছোট-বড় বাড়ি থেকেও ভাড়া আদায় করা হচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে। সব মিলিয়ে এসব উৎস থেকে মাসে এক কোটিরও বেশি টাকা আয় হয় এবং সেই অর্থের বড় অংশ হুন্ডির মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গে নানকের কাছে পাঠানো হয় বলে প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে।

‘ফ্ল্যাটেই পৌঁছে দেওয়া হয় টাকা’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ থেকে দেশে ফেরা আওয়ামী লীগের এক কর্মী যুগান্তরকে বলেন, বাংলাদেশ থেকে হুন্ডির মাধ্যমে পাঠানো অর্থ সংগ্রহের জন্য নানককে বাইরে যেতে হয় না। নির্ধারিত এজেন্টরা তপসিয়ার ওই ফ্ল্যাটে গিয়ে অর্থ পৌঁছে দেন বলে তিনি দাবি করেন।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় ধরে তিনি এ ধরনের অর্থ লেনদেনের বিষয়টি দেখেছেন এবং ওই অর্থ ব্যবহার করেই নানক পশ্চিমবঙ্গে বিলাসবহুল জীবনযাপন করছেন।

নানকের বক্তব্য পাওয়া যায়নি

এসব অভিযোগের বিষয়ে জাহাঙ্গীর কবির নানকের বক্তব্য জানতে তার পরিচিত বিভিন্ন ফোন ও মোবাইল নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে সবগুলো নম্বরই বন্ধ পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তার হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরেও খুদে বার্তা পাঠানো হলেও এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তিনি কোনো জবাব দেননি।