বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ‘ডিজিটাল রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় আগামীর পর্যটন’ প্রতিপাদ্যে কক্সবাজারেও পালিত হচ্ছে বিশ্ব পর্যটন দিবস। দিবসটি উপলক্ষে রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) সকালে সৈকতের সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে র্যালি বের করা হয়। র্যালিটি প্রধান সড়ক ঘুরে লাবণী উন্মুক্ত মঞ্চে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির সমন্বয়ক ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) তাসনীম জাহান পর্যটক ও দর্শনার্থীদের এসব আয়োজনে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
পর্যটনসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ ১২০ কিলোমিটার অখণ্ড সমুদ্রসৈকতকে ঘিরে আশির দশক থেকে কক্সবাজারে পর্যটনের বিকাশ শুরু হলেও এখনো পরিকল্পিত পর্যটন ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠেনি। নব্বইয়ের দশক থেকে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়তে থাকে। কলাতলীকে হোটেল-মোটেল জোন ঘোষণার পর সেখানে প্রায় ৫০০ আবাসিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। বিপুল বিনিয়োগ হলেও সমন্বয়হীনতা ও অব্যবস্থাপনার কারণে পর্যটন খাত প্রত্যাশিতভাবে এগোতে পারছে না।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কক্সবাজারে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা, স্ট্রিট ফুড, নাইট মার্কেট, থিয়েটার, বিনোদনকেন্দ্র কিংবা পরিকল্পিত নাইট লাইফ নেই। রাতের সৈকতেও পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা নেই। পাশাপাশি প্রশিক্ষিত ডুবুরি দল, বিচসংলগ্ন প্রাথমিক চিকিৎসাকেন্দ্র ও ব্রেস্ট ফিডিং সেন্টারের মতো প্রয়োজনীয় সেবাও অপ্রতুল।
পর্যটনসংশ্লিষ্টদের মতে, এসব ঘাটতির কারণে বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করা কঠিন হয়ে পড়েছে। দেশীয় পর্যটকদের একটি অংশও কক্সবাজারে একবার যাওয়ার পর পুনরায় যেতে আগ্রহ হারাচ্ছেন। তবে সমুদ্র ও পাহাড়ের আকর্ষণে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক পর্যটক এখনো কক্সবাজারে আসেন।
জেলা প্রশাসন ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, কক্সবাজারে সমুদ্র, পাহাড়, নদী, ঝরনা, পাথুরে সৈকত, আদিনাথ মন্দির, সোনাদিয়া দ্বীপ, রামুর বৌদ্ধবিহার, রাবার ও চা বাগান, গর্জন বিহার, টেকনাফের মাথিনের কূপ, সেন্টমার্টিন এবং কুতুবদিয়ার বাতিঘরসহ বহু দর্শনীয় স্থান রয়েছে। কিন্তু এসব আকর্ষণের পাশাপাশি পর্যটকদের জন্য আধুনিক বিনোদন সুবিধা গড়ে না ওঠায় সম্ভাবনার পুরোপুরি সদ্ব্যবহার হচ্ছে না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক হোটেল মালিক বলেন, সমুদ্র ছাড়া কক্সবাজারে পর্যটকদের রাতের বিনোদনের উল্লেখযোগ্য কোনো ব্যবস্থা নেই। তার অভিযোগ, হোটেলের ইনডোরে করপোরেট অনুষ্ঠান আয়োজনের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন অনুমতির কারণে উদ্যোক্তাদের হয়রানির মুখে পড়তে হয়। এ কারণে গত কয়েক বছরে কক্সবাজারে করপোরেট অনুষ্ঠান উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে বলে দাবি করেন তিনি। অনেক প্রতিষ্ঠান এখন গাজীপুরসহ দেশের অন্যান্য এলাকায় অনুষ্ঠান আয়োজন করছে।
কক্সবাজারের ট্যুরিজম ও হসপিটালিটি বিভাগের অধ্যাপক মঈনুল হাসান পলাশ বলেন, পর্যটন বিকাশের জন্য নিরাপত্তা, স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ, মানসম্মত স্ট্রিট ফুড ও নাইট লাইফ গুরুত্বপূর্ণ। এসব ক্ষেত্রে কক্সবাজারে ঘাটতি রয়েছে। বেসরকারি উদ্যোক্তাদের উদ্যোগেও বিভিন্ন অনুমোদন ও প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ট্যুর অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব কক্সবাজারের (টুয়াক) সভাপতি আনোয়ার কামাল বলেন, পর্যটনের সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে যুক্ত করা জরুরি। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে স্থানীয় যুবকদের পর্যটন খাতে দক্ষ করে তোলা গেলে কর্মসংস্থান বাড়ার পাশাপাশি অপরাধপ্রবণতাও কমানো সম্ভব। তিনি মানসম্মত স্ট্রিট ফুড চালুর ওপরও গুরুত্ব দেন।
তারকা হোটেল ওশান প্যারাডাইসের পরিচালক আবদুল কাদের মিশু বলেন, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ছাড়া কক্সবাজারে পর্যটকদের জন্য পর্যাপ্ত বিনোদন সুবিধা নেই। তাদের হোটেলে সান্ধ্যকালীন লাইভ মিউজিকের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে সামগ্রিকভাবে সন্ধ্যার পর কক্সবাজারে পর্যটন কার্যক্রম অনেকটাই স্তিমিত হয়ে যায় বলে তিনি মন্তব্য করেন।
কক্সবাজার জেলা রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ আলী বলেন, লাবণী থেকে কলাতলী পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকায় পর্যটকদের সবচেয়ে বেশি সমাগম হয়। অথচ সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা, ব্রেস্ট ফিডিং সেন্টার, আধুনিক শপিং মল, থিয়েটার বা সিনেমা হলের মতো সুবিধা নেই। বিভিন্ন উদ্যোগের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
কক্সবাজার চেম্বারের সাবেক সভাপতি আবু মোরশেদ চৌধুরী বলেন, বিদেশি পর্যটক আকর্ষণে নাইট মার্কেট ও পরিকল্পিত নাইট লাইফের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। বেসরকারি উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে পর্যটন বিকাশে নতুন ধারণা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতা বাড়ানো উচিত।
স্থানীয় বয়োবৃদ্ধ জানে আলম বলেন, একসময় হোটেল শৈবালের সামনে শাপলা ফুলের লেক ও গলফ মাঠ পর্যটকদের আকর্ষণের অন্যতম কেন্দ্র ছিল। তার দাবি, বর্তমানে ওই লেক নর্দমায় পরিণত হয়েছে এবং গলফ মাঠটি পার্কিংয়ের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে।
পর্যটন করপোরেশনের ম্যানেজার ও বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির সাধারণ সম্পাদক রায়হান উদ্দিন আহমেদ বলেন, শৈবালের লেক ও গলফ মাঠ একসময় গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন কেন্দ্র ছিল। বর্তমানে সেখানে আগের মতো পর্যটন সুবিধা নেই। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী পর্যটন উন্নয়নে কাজ চলছে বলেও জানান তিনি।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান বলেন, কক্সবাজারের পর্যটনকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত করার লক্ষ্যে সরকারের উচ্চপর্যায়ে একটি শক্তিশালী কমিটি গঠন করা হয়েছে। অতীতের সীমাবদ্ধতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সংশ্লিষ্ট সবার সমন্বিত পরামর্শের ভিত্তিতে সামনে এগিয়ে যাওয়ার কথা জানান তিনি। তার মতে, পরিকল্পিতভাবে এগোতে পারলে কক্সবাজার ভবিষ্যতে দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক হাব হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
কক্সবাজার উন্নয়ন পরিষদের সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট ওয়াহিদ রুবেল বলেন, পর্যটন খাত শক্তিশালী হলে দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের অবদান রাখা সম্ভব। দেশের দীর্ঘ সমুদ্রসৈকতকে বিশ্বমানের পর্যটনকেন্দ্রে রূপ দিতে সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
এদিকে বিশ্ব পর্যটন দিবস উপলক্ষে জেলা প্রশাসন ও বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির উদ্যোগে তিন দিনের পর্যটন মেলার আয়োজন করা হয়েছে। এতে প্রায় ৮০টি স্টল অংশ নিয়েছে। ওশান প্যারাডাইস, সায়মন, সি পার্ল, গ্রিন ন্যাচার ও সিগালসহ বিভিন্ন তারকা হোটেল মেলায় অংশ নিয়েছে। পর্যটকদের জন্য তুলনামূলক স্বল্পমূল্যে বিভিন্ন খাবারের আয়োজন রয়েছে।
মেলায় নারী উদ্যোক্তাদের তৈরি বিভিন্ন পণ্য, আচার, শুঁটকি, পিঠাসহ পর্যটনসংশ্লিষ্ট নানা সামগ্রী প্রদর্শন করা হচ্ছে। জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলের উপ-প্রশাসনিক কর্মকর্তা মুহাম্মদ ইউনূস জানান, রোববার পর্যন্ত লাবণী পয়েন্টে প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত মেলা চলবে।



