tanaka

রাজার অবৈধ সন্তান থেকে সফল শাসক, অবিবাহিত রানির বিতর্কিত জীবন

একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে অতীতের রাজা-রানিদের জীবন ও শাসনব্যবস্থা কল্পনা করা অনেকের কাছেই কঠিন। ইতিহাসের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় বিভিন্ন সময়ে নানা শাসক ক্ষমতায় এসেছেন। কেউ প্রজাদের...
প্রচ্ছদসর্বশেষ সংবাদরাজার অবৈধ সন্তান থেকে সফল শাসক, অবিবাহিত রানির বিতর্কিত জীবন

রাজার অবৈধ সন্তান থেকে সফল শাসক, অবিবাহিত রানির বিতর্কিত জীবন

একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে অতীতের রাজা-রানিদের জীবন ও শাসনব্যবস্থা কল্পনা করা অনেকের কাছেই কঠিন। ইতিহাসের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় বিভিন্ন সময়ে নানা শাসক ক্ষমতায় এসেছেন। কেউ প্রজাদের রক্ষাকর্তা হিসেবে পরিচিত হয়েছেন, আবার কেউ ক্ষমতার অপব্যবহার করে পরিণত হয়েছেন অত্যাচারীতে।

তবে শাসকদের ব্যক্তিজীবনও ইতিহাসের কম আকর্ষণীয় অধ্যায় নয়। ইংল্যান্ডের রানি প্রথম এলিজাবেথের জীবন তারই একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। দীর্ঘ ৪৫ বছরের শাসনামলে তিনি ইংল্যান্ডকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এক পর্যায়ে নিয়ে যান। একই সঙ্গে তার ব্যক্তিজীবন ঘিরে তৈরি হয়েছে নানা বিতর্ক ও কিংবদন্তি।

রানি প্রথম এলিজাবেথ ১৫৩৩ সালের ৭ সেপ্টেম্বর লন্ডনের গ্রিনউইচে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ছিলেন ইংল্যান্ডের রাজা অষ্টম হেনরি এবং মা তার দ্বিতীয় স্ত্রী অ্যান বোলিন। মাত্র দুই বছর বয়সেই এলিজাবেথের জীবনে বড় বিপর্যয় নেমে আসে। ১৫৩৬ সালে তার মা অ্যান বোলিনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এরপর এলিজাবেথের শৈশব কাটে অনিশ্চয়তার মধ্যে। বিভিন্ন সময়ে সেবিকা ও সৎমায়ের তত্ত্বাবধানে তিনি বেড়ে ওঠেন।

১৫৩৭ সালে তার সৎভাই এডওয়ার্ডের জন্মের পর এলিজাবেথ উত্তরাধিকারসূত্রে সিংহাসনের গুরুত্বপূর্ণ দাবিদার হয়ে ওঠেন। তবে তার বৈধতা নিয়ে সে সময় রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বিতর্ক ছিল। বিশেষ করে রোমান ক্যাথলিকদের একটি অংশ তাকে অবৈধ সন্তান হিসেবে বিবেচনা করত।

১৫৫৪ সালে রানি মেরি টিউডরের বিরুদ্ধে ব্যর্থ বিদ্রোহের পর এলিজাবেথকে গ্রেপ্তার করা হয়। সে সময় তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হলেও শেষ পর্যন্ত তিনি মৃত্যুদণ্ড এড়াতে সক্ষম হন। ১৫৫৮ সালের নভেম্বরে সৎবোন মেরি টিউডরের মৃত্যুর পর মাত্র ২৫ বছর বয়সে ইংল্যান্ডের সিংহাসনে বসেন এলিজাবেথ।

শিক্ষাজীবনেও তিনি ছিলেন অসাধারণ। ইতিহাসবিদদের মতে, এলিজাবেথ একাধিক ভাষায় দক্ষ ছিলেন এবং সাহিত্য, দর্শন ও সংগীতের প্রতি তার গভীর আগ্রহ ছিল। তার রাজনৈতিক বিচক্ষণতা, দৃঢ়তা ও কূটনৈতিক দক্ষতা তাকে ইংল্যান্ডের অন্যতম সফল শাসকে পরিণত করে।

তার ৪৫ বছরের শাসনকাল ইংল্যান্ডের ইতিহাসে ‘এলিজাবেথীয় যুগ’ হিসেবে পরিচিত। এ সময় ইংল্যান্ডে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি সাহিত্য, নাটক, সংগীত ও সমুদ্র অভিযানে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ঘটে।

তার শাসনামলে চার্চ অব ইংল্যান্ড আরও সুসংহত হয়। ১৫৬৩ সালে প্রণীত ‘থার্টি-নাইন আর্টিকেলস’-এর মাধ্যমে ইংল্যান্ডের ধর্মীয় কাঠামোকে আরও সুসংগঠিত করার চেষ্টা করা হয়। এর মধ্য দিয়ে ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্টদের মধ্যে চলমান বিরোধ নিয়ন্ত্রণে রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।

এলিজাবেথের শাসনব্যবস্থার অন্যতম শক্তি ছিল দক্ষ মন্ত্রী ও উপদেষ্টা নির্বাচন। উইলিয়াম সেসিল, স্যার ক্রিস্টোফার হ্যাটন এবং স্যার ফ্রান্সিস ওয়ালসিংহ্যামের মতো ব্যক্তিরা তার প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

তার আমলে ফ্রান্সিস ড্রেক, ওয়াল্টার র‍্যালি ও হামফ্রে গিলবার্টের মতো অভিযাত্রীরা সমুদ্রযাত্রা করেন। এসব অভিযান পরবর্তী সময়ে ইংল্যান্ডের বাণিজ্য ও উপনিবেশ বিস্তারের ভিত্তি তৈরিতে ভূমিকা রাখে। ১৬০০ সালে এলিজাবেথ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে রাজকীয় সনদ দেন, যা পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ বাণিজ্য ও উপনিবেশ বিস্তারের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

এ সময় ইংল্যান্ডে শিল্প-সংস্কৃতিরও ব্যাপক বিকাশ ঘটে। নাটক, সংগীত, সাহিত্য ও স্থাপত্যে আসে নতুন জোয়ার। এই সময়েই উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের মতো সাহিত্যিকের উত্থান ঘটে। উইলিয়াম বার্ড ও থমাস ট্যালিসের মতো সুরকাররাও তার দরবারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

তবে এলিজাবেথের ব্যক্তিজীবন ঘিরে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে তার বিয়ে না করা নিয়ে। তিনি কখনো বিয়ে করেননি এবং কোনো পুরুষকে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করেননি। এ কারণে তাকে ‘দ্য ভার্জিন কুইন’ বা ‘কুমারী রানি’ নামে অভিহিত করা হয়।

তার অবিবাহিত থাকার সিদ্ধান্তকে ঘিরে সে সময় থেকেই নানা গুঞ্জন ছড়ায়। এমনকি তার নারী পরিচয় নিয়েও বিচিত্র প্রশ্ন ও ষড়যন্ত্রতত্ত্ব তৈরি হয়েছিল। তবে এসব দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। বরং অধিকাংশ ইতিহাসবিদ মনে করেন, এলিজাবেথ সচেতন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবেই বিয়ে না করে নিজের ক্ষমতা ও স্বাধীনতা বজায় রেখেছিলেন।

ব্যক্তিজীবনে এলিজাবেথ ছিলেন শিল্প-সংস্কৃতি ও ফ্যাশনপ্রিয়। তিনি নাটক, নাচ, সংগীত ও সাহিত্য উপভোগ করতেন। রাজকীয় পোশাক, অলংকার এবং প্রসাধনের প্রতিও তার বিশেষ আগ্রহ ছিল। তার পোশাকে প্রায়ই জাঁকজমকপূর্ণ অলংকার ও মূল্যবান কাপড় ব্যবহৃত হতো।

তার সৌন্দর্যচর্চা নিয়েও রয়েছে নানা গল্প ও বিতর্ক। প্রচলিত কিছু বর্ণনায় বলা হয়, তৎকালীন প্রসাধনীতে ব্যবহৃত সাদা রঙের উপাদান নিয়মিত ব্যবহারের ফলে তার স্বাস্থ্যের ক্ষতি হয়েছিল। বিশেষ করে ‘ভেনিশিয়ান সারুজ’ নামে পরিচিত সাদা প্রসাধনীতে সীসা ব্যবহারের কারণে দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে ঐতিহাসিক ও চিকিৎসাবিষয়ক আলোচনায় উল্লেখ করা হয়। তবে তার মৃত্যুর সরাসরি কারণ হিসেবে প্রসাধনীকে দায়ী করার মতো নিশ্চিত প্রমাণ নেই।

১৬০৩ সালের ২৪ মার্চ রিচমন্ড প্যালেসে ৬৯ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন রানি প্রথম এলিজাবেথ। জীবদ্দশাতেই তিনি ইংল্যান্ডের ইতিহাসে কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছিলেন।

তার মৃত্যুর সঙ্গে অবসান ঘটে টিউডর রাজবংশের। এরপর স্কটল্যান্ডের রাজা ষষ্ঠ জেমস ইংল্যান্ডের সিংহাসনে বসে প্রথম জেমস নামে শাসন শুরু করেন। এলিজাবেথের দীর্ঘ শাসনকাল আজও ইংল্যান্ডের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচিত অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।

সূত্র: দ্য রয়্যাল ফ্যামিলি, হিস্টোরি মিস্টেরিয়াস