বার্ষিক আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় শুধু আয় ও সম্পদের তথ্য দিলেই যথেষ্ট নয়। একজন করদাতার জীবনযাত্রার বিভিন্ন খাতে সারা বছরে কত অর্থ ব্যয় হয়েছে, তার বিস্তারিত হিসাবও রিটার্নে উল্লেখ করতে হয়। মূলত ঘোষিত আয় ও ব্যয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা যাচাই করতেই এসব তথ্য নেওয়া হয়।
আয়কর রিটার্নে জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখের জন্য নির্দিষ্ট কয়েকটি খাত রয়েছে। করদাতাকে আইটি-১১গ (২০২৩) ফরমে জীবনযাপন-সংক্রান্ত ব্যয়ের বিস্তারিত বিবরণ দিতে হয়। পরিবারের অন্য কোনো সদস্য কোনো খরচ বহন করে থাকলে সেটিও ফরমের মন্তব্য কলামে উল্লেখ করা প্রয়োজন।
রিটার্নে যেসব তথ্য দিতে হয়—
পরিবারের ভরণপোষণ
পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয়, বাজারসহ ভরণপোষণে সারা বছরে কত টাকা খরচ হয়েছে, তার হিসাব দিতে হয়। এখানে মাসিক নয়, পুরো বছরের মোট ব্যয় উল্লেখ করতে হবে।
বাসাভাড়া ও বাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ
বছরে বাসাভাড়া বাবদ কত টাকা ব্যয় হয়েছে, তার পাশাপাশি বাড়িঘর রক্ষণাবেক্ষণে কত অর্থ খরচ হয়েছে, তাও উল্লেখ করতে হয়। এর মাধ্যমে করদাতার আয় ও আবাসন ব্যয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা যাচাই করা সম্ভব হয়।
গাড়ি ব্যবহারের খরচ
প্রাইভেট কার, মোটরসাইকেল বা অন্য কোনো যানবাহন থাকলে সেটি ব্যবহারে সারা বছরে কত টাকা ব্যয় হয়েছে, তার হিসাব দিতে হয়। জ্বালানি, রক্ষণাবেক্ষণ, বিভিন্ন মাশুল ও চালকের বেতনসহ সংশ্লিষ্ট সব ব্যয় এ খাতে অন্তর্ভুক্ত।
গ্যাস, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ বিল
বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, টেলিফোন, মোবাইল ও ইন্টারনেটের মতো নিয়মিত বিলও জীবনযাত্রার ব্যয়ের অংশ। তাই এসব খাতে বছরে মোট কত টাকা ব্যয় হয়েছে, তার হিসাব সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।
সন্তানদের পড়াশোনার খরচ
সন্তানদের স্কুল-কলেজের টিউশন ফি, কোচিং এবং অন্যান্য শিক্ষা-সংক্রান্ত ব্যয়ের তথ্যও রিটার্নে উল্লেখ করতে হয়। ঘোষিত আয়ের তুলনায় শিক্ষাব্যয় অস্বাভাবিক বেশি হলে সেই অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। তাই এ খাতের ব্যয়ের হিসাব সংরক্ষণ করা জরুরি।
দেশ-বিদেশে ভ্রমণ ব্যয়
দেশের ভেতরে কিংবা বিদেশে ভ্রমণের পেছনে সারা বছরে কত অর্থ ব্যয় হয়েছে, সেটিও রিটার্নে উল্লেখ করতে হয়। ক্রেডিট কার্ড বা অন্য কোনো মাধ্যমে ব্যয় করা হলেও তার হিসাব দিতে হবে।
উৎসব ও সামাজিক ব্যয়
ঈদ, পূজাসহ বিভিন্ন উৎসব উপলক্ষে পোশাক, বাজারসদাই, স্ত্রী-সন্তান ও আত্মীয়স্বজনের জন্য করা খরচের হিসাবও দিতে হয়। কাউকে নগদ অর্থ প্রদান বা এ ধরনের অন্যান্য ব্যয়ও প্রয়োজন অনুযায়ী উল্লেখ করতে হতে পারে।
উৎসে কর্তিত কর ও অন্যান্য কর
বছরজুড়ে বিভিন্ন খাতে উৎসে কর্তিত করের তথ্যও দিতে হয়। পাশাপাশি সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর কর্তিত কর এবং আগের বছরের রিটার্নের ভিত্তিতে পরিশোধ করা আয়কর ও সারচার্জের পরিমাণ উল্লেখ করতে হয়।
ঋণের সুদ
ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা অন্য কোনো উৎস থেকে নেওয়া ঋণের বিপরীতে বছরে কত টাকা সুদ পরিশোধ করা হয়েছে, সেই তথ্যও জীবনযাত্রার ব্যয়ের বিবরণীতে দিতে হয়।
জীবনযাত্রার ব্যয়ের এসব তথ্য মূলত করদাতার আয় ও ব্যয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য যাচাইয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একজন ব্যক্তি যে পরিমাণ আয় ঘোষণা করেছেন, তার তুলনায় জীবনযাত্রার ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেশি কি না, তা এসব তথ্যের মাধ্যমে পর্যালোচনা করতে পারেন কর কর্মকর্তারা।
তাই আয়কর রিটার্ন প্রস্তুতের সময় সারা বছরের বিভিন্ন খাতের ব্যয়ের হিসাব সংরক্ষণ করা জরুরি। এতে রিটার্নে সঠিক তথ্য দেওয়া সহজ হয় এবং ঘোষিত আয় ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের মধ্যে সামঞ্জস্যও স্পষ্ট থাকে।



