tanaka
প্রচ্ছদআন্তর্জাতিককলকাতায় অপরিসর গলিতে বেআইনি হোটেল, অগ্নিকাণ্ডে ৯ জনের মৃত্যু

কলকাতায় অপরিসর গলিতে বেআইনি হোটেল, অগ্নিকাণ্ডে ৯ জনের মৃত্যু

কলকাতার নিউ মার্কেট সংলগ্ন মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি বেসরকারি হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, হোটেলটির চতুর্থ তলায় থাকা একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। একই সঙ্গে অপরিসর গলির মধ্যে থাকা এমন ঝুঁকিপূর্ণ ও কথিত বেআইনি হোটেল কীভাবে ট্রেড লাইসেন্স ও ফায়ার পারমিট পেয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বুধবার (১৯ আগস্ট) ভোর ৩টার দিকে ‘শিখা ইন’ নামের হোটেলটিতে আগুন লাগে। এ সময় অধিকাংশ অতিথি ঘুমিয়ে ছিলেন। ভবনটিতে জরুরি নির্গমন পথ না থাকা এবং প্রধান সিঁড়ি অত্যন্ত সংকীর্ণ হওয়ায় আগুন ও ধোঁয়ার মধ্যে অনেক অতিথি আটকা পড়েন।

খবর পেয়ে পুলিশ ও দমকল বাহিনীর একাধিক ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রায় দুই ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। হোটেল থেকে অন্তত ৬০ জনকে উদ্ধার করা হয়। তবে ঘটনাস্থল ও হাসপাতালে মিলিয়ে ৯ জনের মৃত্যু হয়। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, নিহতদের শরীরে আগুনে পোড়ার ক্ষত তুলনামূলক কম থাকলেও অতিরিক্ত ধোঁয়া ফুসফুসে প্রবেশ করায় শ্বাসরোধ হয়ে তাদের মৃত্যু হয়েছে। ধোঁয়ায় অসুস্থ আরও কয়েকজনকে কলকাতা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

নিহতদের মধ্যে ছয়জনের পরিচয় নিশ্চিত করেছে স্থানীয় প্রশাসন। তাদের মধ্যে পাঁচজন বাংলাদেশি নাগরিক এবং একজন ভারতের ঝাড়খণ্ডের বাসিন্দা। নিহতদের মধ্যে ছয়জন পুরুষ, দুজন নারী ও একটি শিশু রয়েছে। তারা মূলত চিকিৎসার জন্য কলকাতায় গিয়ে ওই হোটেলে অবস্থান করছিলেন বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি ও ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে।

নিহত বাংলাদেশিদের মধ্যে রয়েছেন সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত (৩৯), তার স্ত্রী আফসানা শারমীন (২৭), তাদের তিন বছরের সন্তান স্বর্ণশীষ দত্ত এবং দেবাশীষের শ্বশুর মো. আকরাম আলি (৬৪)। দেবাশীষ দত্ত কুষ্টিয়া শহরের আড়ুয়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা দিলীপ দত্তের ছেলে। তিনি দৈনিক ‘আজকের পত্রিকা’ ও টেলিভিশন চ্যানেল ‘চ্যানেল নাইন’-এর কুষ্টিয়া প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতেন। পাশাপাশি স্থানীয় দৈনিক ‘আজকের আলো’র নির্বাহী সম্পাদক ছিলেন। তার শ্বশুর আকরাম আলির বাড়ি কুষ্টিয়া শহরের থানাপাড়া এলাকায়।

অগ্নিকাণ্ডের পর হোটেলের মালিক ও পরিচালনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা পলাতক রয়েছেন। তাদের সন্ধানে অভিযান চালানোর পাশাপাশি অগ্নিকাণ্ডের কারণ ও হোটেলের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ ও ফরেনসিক দল।

ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে পশ্চিমবঙ্গের পুর ও নগরোন্নয়নমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল হোটেলটিকে ঘিরে নানা অনিয়মের অভিযোগ তোলেন। তিনি প্রশ্ন করেন, এত অপরিসর সড়কে অবস্থিত এমন হোটেলকে কীভাবে ট্রেড লাইসেন্স ও ফায়ার লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল।

অগ্নিমিত্রা পাল বলেন, গত ১৫ বছরে এসব হোটেলে নিয়মিত ফায়ার অডিট করা হয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা ছাড়াই বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়েছিল কি না, সে বিষয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

স্থানীয় সূত্রের বরাত দিয়ে তিনি আরও বলেন, হোটেলটির পেছনে বের হওয়ার একটি বিকল্প পথ ছিল। কিন্তু সেখানে নতুন ভবন নির্মাণ করে সেই পথ স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তার দাবি, অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে এই প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।

মন্ত্রী আরও বলেন, কিছুদিন আগে তারাপীঠের একটি হোটেলে অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে যে ধরনের গাফিলতির অভিযোগ উঠেছিল, মির্জা গালিব স্ট্রিটের হোটেলেও একই ধরনের অনিয়মের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জামের অভাব এবং নিরাপত্তাবিধি না মানার বিষয়গুলো তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে।

এদিকে, দুর্ঘটনার পর মির্জা গালিব স্ট্রিট ও আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। নিহতদের পরিচয় নিশ্চিতকরণ ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে কলকাতায় বাংলাদেশ উপ-হাইকমিশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে স্থানীয় প্রশাসন। একই সঙ্গে হোটেলটির লাইসেন্স, অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং অনুমোদনের বিষয়গুলোও তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে।