বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় ৬০টি দেশের পণ্যের ওপর নতুন শুল্ক আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। জোরপূর্বক শ্রম (Forced Labour) প্রতিরোধে ব্যর্থতার অভিযোগে ট্রাম্প প্রশাসন এ পদক্ষেপ নিয়েছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ ও ১২.৫ শতাংশ হারে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হবে। অস্থায়ী ১০ শতাংশ বৈশ্বিক শুল্কের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর বৃহস্পতিবার (২৪ জুলাই) প্রকাশিত ফেডারেল রেজিস্টারের এক বিজ্ঞপ্তিতে নতুন এ শুল্কের ঘোষণা দেওয়া হয়।
ডোনাল্ড ট্রাম্প পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর বৈশ্বিক বাণিজ্যে যে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে, এই সিদ্ধান্তকে তারই সর্বশেষ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
যেসব পণ্যে শুল্ক কার্যকর হবে
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের মোট আমদানির প্রায় ৯৯.৪ শতাংশই নতুন শুল্কের আওতায় আসবে। তবে তেল-গ্যাস, সার, নির্দিষ্ট কিছু খাদ্যপণ্য এবং কয়েকটি প্রয়োজনীয় পণ্য এ শুল্কের বাইরে থাকবে।
নতুন শুল্ক বিদ্যমান আমদানি শুল্কের অতিরিক্ত হিসেবে আদায় করবে যুক্তরাষ্ট্রের কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। উদাহরণ হিসেবে, বর্তমানে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর গড়ে ১৫ শতাংশ শুল্ক রয়েছে। এর সঙ্গে নতুন ১০ শতাংশ যোগ হলে মোট শুল্ক দাঁড়াবে ২৫ শতাংশ। একই নিয়ম অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে।
বাংলাদেশের ওপর কতটা প্রভাব পড়বে?
রপ্তানিকারকদের মতে, বাস্তবে বাংলাদেশের ওপর তাৎক্ষণিক কোনো অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে না। কারণ, গত ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন আদালতে পাল্টা শুল্ক স্থগিত হওয়ার পর ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইন প্রয়োগ করে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছিল। সেই ১৫০ দিনের মেয়াদ শেষ হওয়ায় একই হারে নতুন শুল্ক কার্যকর করা হচ্ছে।
ফলে মোট শুল্কহারে উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন আসছে না। তবে ট্রাম্প প্রশাসন আরও একটি বাণিজ্য তদন্ত পরিচালনা করছে। ভবিষ্যতে সেই তদন্তের ভিত্তিতে নতুন কোনো শুল্ক আরোপ করা হলে তখন পরিস্থিতি বদলাতে পারে বলে মনে করছেন রপ্তানিকারকরা।
যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাখ্যা
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি (ইউএসটিআর) জেমিসন গ্রিয়ার এক বিবৃতিতে বলেন, প্রায় এক শতাব্দী ধরে জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানির ওপর যুক্তরাষ্ট্রে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে এবং তা কঠোরভাবে কার্যকর করা হচ্ছে।
তার ভাষায়, নতুন এই পদক্ষেপ মানবাধিকার লঙ্ঘন ও বাণিজ্য বিকৃতিকারী কর্মকাণ্ড নিরুৎসাহিত করবে এবং বিশ্বজুড়ে শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষায় সহায়ক হবে।
পাল্টা শুল্কের পটভূমি
২০২৫ সালের ২ এপ্রিল ডোনাল্ড ট্রাম্প বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। শুরুতে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ হার ছিল ৩৭ শতাংশ। পরে তা তিন মাসের জন্য স্থগিত করা হয়।
পরবর্তীতে ৭ জুলাই শুল্কহার ৩৫ শতাংশে নামানো হয় এবং আরও আলোচনার পর ২ আগস্ট তা কমিয়ে ২০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। ৭ আগস্ট থেকে সেই শুল্ক কার্যকর হয়।
এরপর ৯ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তিতে পৌঁছায়, যার ফলে বাংলাদেশের ওপর পাল্টা শুল্ক ১৯ শতাংশে নেমে আসে। কিন্তু কিছুদিন পর মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের আরোপিত পাল্টা শুল্ককে অবৈধ ঘোষণা করলে প্রশাসন ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইন ব্যবহার করে নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে, যা ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর হয়।
আইন অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট সর্বোচ্চ ১৫০ দিনের জন্য এ ধরনের শুল্ক আরোপ করতে পারেন। সেই মেয়াদ শেষ হওয়ার পরই বর্তমান নতুন শুল্ক কার্যকর হচ্ছে।
কোন দেশের ওপর কত শুল্ক?
ইউএসটিআরের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশ, ভারত, আর্জেন্টিনা, যুক্তরাজ্য, কম্বোডিয়া, কানাডা, ইকুয়েডর, এল সালভাদর, গুয়াতেমালা, হন্ডুরাস, ইন্দোনেশিয়া, জর্ডান, মালয়েশিয়া, মেক্সিকো, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগোসহ ১৭টি দেশের পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে।
অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), তাইওয়ান, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও সুইজারল্যান্ডের ক্ষেত্রে মোট শুল্ক হবে ১০ অথবা ১২.৫ শতাংশ।
এ ছাড়া চীন, ভিয়েতনাম, তুরস্ক, ব্রাজিল, মিসরসহ আরও ৩৮টি দেশের পণ্যের ওপর ১২.৫ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে।
ব্যবসায়ীদের প্রতিক্রিয়া
স্প্যারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম বলেন, নতুন শুল্ক সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান অনেকটাই অক্ষুণ্ন রয়েছে। বৈশ্বিক বাণিজ্যের বর্তমান চ্যালেঞ্জের মধ্যেও এটি বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক দিক।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, প্রতিযোগী দেশগুলোর শুল্কহার প্রায় অপরিবর্তিত থাকায় বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে নতুন করে বড় ধরনের চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা নেই। তবে জোরপূর্বক শ্রমের অভিযোগের ভিত্তিতে বাংলাদেশকে এ শুল্কের আওতায় আনা হয়েছে, যা তিনি অন্যায় ও অযৌক্তিক বলে মন্তব্য করেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নতুন ব্যবস্থায় অন্য অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশ সর্বনিম্ন শুল্ক হারের আওতায় রয়েছে। শুক্রবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়, নতুন শুল্কহার ১০ থেকে সর্বোচ্চ ১২.৫ শতাংশ পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে, যা আগে কার্যকর থাকা অস্থায়ী ১০ শতাংশ বৈশ্বিক শুল্ক ব্যবস্থার পরিবর্তে কার্যকর হবে।
মন্ত্রণালয়ের মতে, এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকসহ অন্যান্য রপ্তানি পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।
বাণিজ্যমন্ত্রীর বক্তব্য
বাণিজ্য, শিল্প, পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, ১৫০ দিনের মেয়াদ শেষ হওয়ায় আগের শুল্ক নতুন নামে পুনর্বহাল করা হয়েছে। এটি মূলত পুরোনো ব্যবস্থারই প্রতিস্থাপন, নতুন কোনো অতিরিক্ত শুল্ক নয়। ফলে বাস্তব পরিস্থিতিতে শুল্কের বোঝা বাড়ছে না।
শুক্রবার সিলেট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে এক অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
বিজিএমইএর মূল্যায়ন
বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের ওপর শুল্কের হার বেশি না হলে দেশের রপ্তানি সক্ষমতা বজায় থাকবে। তবে ভবিষ্যতে যদি প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশকে বেশি শুল্ক দিতে হয়, তাহলে রপ্তানিকারকদের জন্য তা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।



