মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর হুঁশিয়ারির পর শুক্রবার (২৪ জুলাই) ইরানের দক্ষিণ থেকে উত্তর পর্যন্ত বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এর পাল্টা জবাবে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলার দাবি করেছে ইরান। নতুন করে শুরু হওয়া এই সংঘাতে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও বেড়ে গেছে।
দুই সপ্তাহ আগে কার্যকর হওয়া অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর ফের সংঘর্ষ শুরু হয়েছে। ইরান জানিয়েছে, প্রতিবেশী আরব দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে তারা হামলা চালিয়েছে। একই সঙ্গে সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, মার্কিন বাহিনী যদি কোনো বেসামরিক স্থাপনাকে সামরিক কাজে ব্যবহার করে, তাহলে সেসব ভবনও বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচিত হবে।
এদিকে ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠী সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধের ঘোষণা দিয়েছে। এর ফলে হরমুজ প্রণালির ঝুঁকি এড়িয়ে সৌদি আরব পাইপলাইনের মাধ্যমে লোহিত সাগরে তেল পরিবহনের ওপর আরও বেশি নির্ভর করছে।
প্রায় পাঁচ মাস ধরে চলমান এই সংঘাতে ইতোমধ্যে হাজারো মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা ও মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা নতুন করে বেড়েছে।
হুথি হামলায় তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়াল
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে হুথি যোদ্ধারা সৌদি আরবের দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালায়। এর পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৭ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার অতিক্রম করে, যা মে মাসের পর সর্বোচ্চ।
তবে শুক্রবার বিকেলের দিকে বাজার কিছুটা স্থিতিশীল হলে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৪ ডলারের বেশি কমে ব্যারেলপ্রতি ৯৬ ডলারের সামান্য ওপরে নেমে আসে।
জাহাজের রুট পরিবর্তন, বেড়েছে পরিবহন ব্যয়
হুথিদের হামলার কারণে অনেক তেলবাহী জাহাজ লোহিত সাগরের ঝুঁকিপূর্ণ পথ এড়িয়ে দীর্ঘ বিকল্প রুট ব্যবহার করছে। ফলে আফ্রিকা ঘুরে এশিয়ায় যেতে হওয়ায় সময় ও পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
একই সঙ্গে দক্ষিণ লোহিত সাগর দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের বিমা ব্যয়ও অনেক ক্ষেত্রে দ্বিগুণ হয়েছে।
বৃহস্পতিবার বাব আল-মান্দেব প্রণালি অতিক্রম করা ১৮টি জাহাজের মধ্যে ৯টি ছিল অপরিশোধিত তেলবাহী, যার দুটি ছিল চীনের সুপারট্যাংকার। অন্যদিকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে ওই দিন মাত্র একটি তেলবাহী জাহাজ চলাচল করেছে, যা ৭ মে-র পর সর্বনিম্ন।
এদিকে ইরান ও ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ফোনালাপে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছেন।
ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি, কড়া জবাব ইরানের
ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেছেন, ইয়েমেনের হুথিদের ভবিষ্যতের যেকোনো হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করা হবে।
তিনি লিখেছেন, “ইরান এবং অবশ্যই হুথিদের বড় ধরনের সামরিক শাস্তির মুখে পড়তে হবে।”
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে আরও বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর বিষয়টি তিনি বিবেচনা করছেন।
তার ভাষায়, “তারা এখনো যথেষ্ট মূল্য দেয়নি।”
অন্যদিকে ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জুনের শেষ দিকে সংঘর্ষ পুনরায় শুরু হওয়ার পর এখন পর্যন্ত ৫৯ জন নিহত এবং ৬৬৬ জন আহত হয়েছেন।
ইরানের শীর্ষ যৌথ সামরিক কমান্ডের প্রধানের বরাত দিয়ে দেশটির গণমাধ্যম জানিয়েছে, একজন ইরানি নিহত হলে তার বদলে একজন মার্কিন সেনাকে হত্যা করার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
এদিকে পেন্টাগনের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত এই সংঘাতে ১৮ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। ৭ জুলাইয়ের পর আহত হয়েছেন আরও ১০০ জন সেনা, যাদের মধ্যে ৯৬ শতাংশ আবার দায়িত্বে ফিরেছেন।
কুয়েত, বাহরাইন, জর্ডান ও ইরাকে হামলার দাবি
ইরান দাবি করেছে, তারা কুয়েতে অবস্থিত কয়েকটি মার্কিন সামরিক স্থাপনা, বাহরাইনে যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম নৌবহরের একটি নজরদারি টাওয়ার, জর্ডানে মার্কিন সেনা ব্যারাক ও যুদ্ধবিমান এবং ইরাকের কুর্দি অঞ্চলের এরবিলে মার্কিন সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে।
তবে জর্ডানের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা সাতটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ছয়টি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। এতে কোনো হতাহত বা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেনি।
এদিকে বাগদাদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছে।
ইরানের উত্তরাঞ্চলেও মার্কিন হামলা
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র গিলান প্রদেশের জিবা কেনার এলাকায় অবস্থিত ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) নৌবাহিনীর সদর দপ্তরে আঘাত হেনেছে। পাশাপাশি বন্দরনগরী বান্দার আনজালিতেও হামলার খবর পাওয়া গেছে।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন আইআরআইবি জানিয়েছে, আহভাজ শহরে মার্কিন হামলায় চারজন নিহত এবং পাঁচজন আহত হয়েছেন।
এদিকে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড এক বিবৃতিতে উপসাগরীয় দেশগুলোর জনগণকে সতর্ক করে বলেছে, মার্কিন সেনারা যদি কোনো শহরের বেসামরিক স্থাপনাকে সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে, তাহলে সেসব স্থানও হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে।
সূত্র: রয়টার্স



