ভারত সরকারের সঙ্গে আলোচনার পরও শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে অনড় রয়েছে তেলাপোকা জনতা পার্টি (সিজেপি)। দলটির দাবি, আগামী দু-এক দিনের মধ্যে শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ না করলে দেশজুড়ে আরও বৃহৎ আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।
শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলনের মধ্যে শুক্রবার দিল্লির কনস্টিটিউশন ক্লাবে সরকারের সঙ্গে বৈঠকে বসেন সিজেপি প্রতিনিধিরা। নিরপেক্ষ স্থানে আলোচনার দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই এই স্থান নির্ধারণ করা হয়। সরকারের পক্ষে বৈঠকে অংশ নেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে পি নাড্ডা এবং প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং। অন্যদিকে সিজেপির প্রতিনিধিত্ব করেন দলের জাতীয় মুখপাত্র সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কা। প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী বৈঠকে প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় সরকারের নেওয়া ও ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে সিজেপি তাদের দাবিগুলো লিখিত আকারে সরকারের কাছে হস্তান্তর করে।
সূত্রের দাবি, আন্দোলনকারীদের বেশ কয়েকটি দাবি নীতিগতভাবে মেনে নিলেও শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে আরও কিছু সময় চেয়েছে সরকার।
বৈঠক শেষে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে পি নাড্ডা বলেন, আন্দোলনকারীদের তিনটি মূল দাবি এবং পরীক্ষা ব্যবস্থার পাঁচটি সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। শনিবার আবারও বৈঠকে বসে সরকারের অবস্থান জানানো হবে।
সিজেপির নেতা আশুতোষ রাঙ্কা জানান, ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের বিষয়ে সরকার শনিবার বিকাল পর্যন্ত সময় চেয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সরকার দ্রুত শিক্ষামন্ত্রীকে অপসারণ করবে। পাশাপাশি আত্মহত্যায় মারা যাওয়া নিট পরীক্ষার্থীদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ এবং আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা এফআইআর ও মামলাগুলো প্রত্যাহারের দাবিও নীতিগতভাবে গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
সরকার শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা না নেওয়া এবং পরীক্ষার অনিয়মে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আশ্বাস দেওয়ার পরই সিজেপি আলোচনায় বসতে সম্মত হয়।
আন্দোলনের সমর্থক সোনম সরকারের অনশনও সরকারের লিখিত আশ্বাস পাওয়ার পর শেষ হয়েছে। টানা ২৫ দিন অনশন শেষে তিনি জানান, আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে না বলে সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
তবে আলোচনার আগেই সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপ স্পষ্ট করে বলেন, শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ ছাড়া এই আন্দোলনের কোনো সমাধান সম্ভব নয়। তিনি অভিযোগ করেন, সরকার শুক্রবার রাতেই আন্দোলনকারীদের আটক বা গ্রেপ্তারের চেষ্টা করতে পারে। তার ভাষায়, এ ধরনের পদক্ষেপ আন্দোলনকে আরও বিস্তৃত করে তুলবে।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল এবং প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রেখে একটি নতুন বিল অনুমোদন করেছে। পাশাপাশি উচ্চশিক্ষা সচিব বিনীত যোশীকে অন্য মন্ত্রণালয়ে বদলি এবং শিক্ষা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে নতুন কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
শুক্রবারও নিট প্রশ্নপত্র ফাঁস ইস্যুতে উত্তপ্ত ছিল ভারতের সংসদ। বিরোধী দলের বিক্ষোভ ও স্লোগানের মুখে লোকসভা ও রাজ্যসভার কার্যক্রম বারবার মুলতবি করা হয়। কংগ্রেসসহ বিরোধী দলগুলো সংসদে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে এ বিষয়ে বক্তব্য দেওয়ার আহ্বান জানায়।
নিট পরীক্ষায় অনিয়ম এবং আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের পদক্ষেপের প্রতিবাদে শুক্রবার মধ্য দিল্লিতে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে কংগ্রেস। একই সঙ্গে বিভিন্ন বিরোধী দল দেশজুড়ে মোমবাতি মিছিল ও সত্যাগ্রহ কর্মসূচির ডাক দেয়।
কলকাতাতেও শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে বামপন্থি ছাত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে যৌথভাবে বিক্ষোভে অংশ নেয় সিজেপি। পুলিশের অনুমতি না পেলেও শিয়ালদহ থেকে এসপ্ল্যানেড পর্যন্ত মিছিল করে আন্দোলনকারীরা। তারা ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ, ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (এনটিএ) বিলুপ্তি এবং আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের জন্য ন্যায়বিচারের দাবি জানান। অন্যদিকে এবিভিপিসহ সংঘ পরিবারের ঘনিষ্ঠ সংগঠনগুলোও পাল্টা কর্মসূচি নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
এদিকে সুপ্রিম কোর্টও নিট-ইউজি পরীক্ষাকে ঘিরে ধারাবাহিক অনিয়মের ঘটনায় কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে জবাব চেয়েছে। বিচারপতি পি এস নরসিংহ ও অলোক আরাধের বেঞ্চ সরকারকে জানতে চেয়েছে, কবে পুরোপুরি কম্পিউটার-ভিত্তিক পরীক্ষায় রূপান্তর করা হবে এবং পরীক্ষার তথ্য কীভাবে নিরাপদ রাখা হবে।
জবাবে ভারতের সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা আদালতকে জানান, সরকার সমস্যা সমাধানে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে এবং একটি সমন্বিত পরিকল্পনা আদালতের সামনে উপস্থাপনের জন্য আরও কিছু সময় প্রয়োজন। তবে সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, এ ধরনের অনিয়ম আর চলতে দেওয়া হবে না। মামলার পরবর্তী শুনানির তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ২৭ জুলাই।



