একটি বিকট শব্দ, প্রচণ্ড ঝাঁকুনি, তারপর চারদিকে নিস্তব্ধতা। নাটোরের বড়াইগ্রামের বনপাড়ায় মঙ্গলবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে বাস ও বালুবোঝাই ট্রাকের ভয়াবহ সংঘর্ষে প্রাণ হারান ১২ জন। দুর্ঘটনার ধ্বংসস্তূপ থেকে আট বছর বয়সী তাসফিয়ার নিথর দেহ উদ্ধারের সময় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য চোখে পড়ে উদ্ধারকর্মী ও স্থানীয়দের। শিশুটির বুকের সঙ্গে তখনো জড়িয়ে ছিল তার প্রিয় পোষা বিড়ালটি। মৃত্যুও যেন আলাদা করতে পারেনি ছোট্ট তাসফিয়া ও তার খেলার সঙ্গীকে।
পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ থেকে বাবার সঙ্গে রাজশাহীতে খালার বাড়ি যাচ্ছিল তাসফিয়া। প্রিয় বিড়ালটিকে বাড়িতে একা রেখে যেতে চায়নি সে। তাই দীর্ঘ পথের যাত্রায় সঙ্গে নিয়েছিল নিজের পোষা প্রাণীটিকে। পুরো পথ বিড়ালটি ছিল তার কোলেই। গভীর রাতে হয়তো প্রিয় সঙ্গীকে বুকে জড়িয়ে বাসের আসনে ঘুমিয়ে পড়েছিল ছোট্ট মেয়েটি। কিন্তু ভোরের ভয়াবহ দুর্ঘটনা মুহূর্তেই কেড়ে নেয় তার জীবন। এ দুর্ঘটনায় তাসফিয়া ও তার বাবা শহীদুল ইসলামসহ মোট ১২ জনের মৃত্যু হয়।
দুর্ঘটনার পর দুমড়েমুচড়ে যাওয়া বাসের ভেতর উদ্ধারকাজ চালানোর সময় তাসফিয়া ও তার বিড়ালকে একসঙ্গে দেখতে পান উদ্ধারকর্মী ও স্থানীয়রা। শিশুটির নিথর দেহের সঙ্গে বিড়ালটির এভাবে লেপ্টে থাকার দৃশ্য উপস্থিত সবার হৃদয় ছুঁয়ে যায়। ছোট্ট মনিবের বুকেই শেষ আশ্রয় খুঁজে নিয়েছিল অবুঝ প্রাণীটি।
দুর্ঘটনাস্থলের কাছের বাসিন্দা গৃহবধূ মাজেদা পারভীন বলেন, দুর্ঘটনায় মেয়েটির মাথা থেঁতলে গিয়েছিল। কিন্তু বাস থেকে তার মরদেহ নামানোর সময়ও বিড়ালটি তার কোলেই ছিল। মৃত্যুর মুহূর্তেও সে বিড়ালটিকে বুক থেকে সরায়নি।
মঙ্গলবার দিনভর দুর্ঘটনাস্থলে শিশুটির পোষা বিড়ালের মরদেহ পড়ে থাকতে দেখে শোকাহত হন সরকারি কর্মকর্তা, উদ্ধারকর্মী, সংবাদকর্মী ও স্থানীয়রা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকেও ছড়িয়ে পড়ে এই হৃদয়বিদারক দৃশ্য। অনেকেই শোক ও সহমর্মিতা জানিয়ে পোস্ট দেন।
বড়াইগ্রামের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) লায়লা জান্নাতুল ফেরদৌস ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) জুবায়ের জাহাঙ্গীর এ ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেন। তাঁরা জানান, দুর্ঘটনায় অনেক মানুষের মৃত্যু হলেও ছোট্ট শিশু ও তার পোষা বিড়ালের এমন করুণ পরিণতি তাঁদেরও গভীরভাবে ব্যথিত করেছে।
তাসফিয়া ও তার পোষা বিড়ালের এই মৃত্যু কেবল একটি দুর্ঘটনার গল্প নয়; এটি প্রিয়জনের প্রতি নিঃশর্ত মমতা আর এক অবুঝ প্রাণীর নির্ভরতার মর্মস্পর্শী স্মৃতি। যে বন্ধন জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে ছিল সঙ্গী, মৃত্যুর শেষ মুহূর্তেও তা বিচ্ছিন্ন হয়নি।
সড়কে এমন প্রাণহানি যেন আর কোনো পরিবারকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে না দেয়। নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করা হোক, যাতে কোনো শিশুর স্বপ্ন এভাবে অকালে থেমে না যায়।



