tanaka
প্রচ্ছদসারাদেশভীতি, রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণে সংকুচিত সংস্কৃতিচর্চা, উদ্বিগ্ন সাংস্কৃতিক অঙ্গন

ভীতি, রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণে সংকুচিত সংস্কৃতিচর্চা, উদ্বিগ্ন সাংস্কৃতিক অঙ্গন

দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ভয়ের পরিবেশ, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও বাণিজ্যিকীকরণের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন নাট্য ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা। তাঁদের মতে, এসব কারণে লোকজ সংস্কৃতির চর্চা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে সংস্কৃতির সম্পর্ক ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। সমাজের অস্থিরতা কাটিয়ে সাংস্কৃতিক বিকাশ নিশ্চিত করতে বিদ্যমান পরিস্থিতির পরিবর্তন জরুরি বলে মনে করেন তাঁরা।

নাট্যসংগঠন ‘নাট্যকেন্দ্র’র ৩০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত ‘সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতার ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক উন্মুক্ত আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন। রোববার বিকেলে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালার সেমিনার কক্ষে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

আলোচনায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন তৌকীর আহমেদ। প্রবন্ধটি উপস্থাপনা করেন সংগীতা চৌধুরী। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন নাট্যকেন্দ্রের সদস্য ইকবাল বাবু।

আলোচনায় নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ বলেন, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সংস্কৃতিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। এ বিষয়ে রাজনৈতিক দলের কর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। এমনকি কমিউনিস্ট পার্টির কর্মীদের সঙ্গেও বিষয়টি নিয়ে কথা বলা যায় না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

মামুনুর রশীদের ভাষ্য, সমাজে অস্থিরতা বাড়লেও মানুষের কাছে সংস্কৃতির আলো পৌঁছাচ্ছে না। নাচ, গান ও কবিতার প্রকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। লেখকদের ধর্মীয় পরিচয়ে ভাগ করা হচ্ছে, পাশাপাশি কে বাংলাদেশি আর কে বিদেশি—এমন বিভাজনও তৈরি হচ্ছে। এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে মোহাম্মদ বারী বলেন, দেশ গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতিতে কালো রং লাগানোর ঘটনাও তাঁদের দেখতে হয়েছে। তাঁর মতে, এমন পরিস্থিতিতে সাংস্কৃতিক কর্মীদের অনেক সময় শুধু ঘটনার নীরব সাক্ষী হয়ে থাকতে হচ্ছে।

নাট্যকার মাসুম রেজা বলেন, ইউনূসের সময়েও গণপিটুনির বিরুদ্ধে থিয়েটারকর্মীরা প্রতিবাদ জানিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে কালো রং লাগানোর পর এক রিকশাচালক পানি এনে সেটি পরিষ্কার করেছিলেন। কুষ্টিয়ায় এখনো হারমোনিয়াম বাজছে, গানও হচ্ছে; তবে অনেক ক্ষেত্রে তা গোপনে করতে হচ্ছে। তাই সংস্কৃতিচর্চা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে বা সংস্কৃতি হারিয়ে গেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বাবুল বিশ্বাসের মতে, রাষ্ট্র প্রথমে মানুষের মধ্যে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে। এরপর করপোরেট ও এনজিও সংস্কৃতির প্রভাব মানুষকে নিজস্ব সাংস্কৃতিক শিকড় থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। এর পরিণতিতে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সংস্কৃতির সম্পর্ক ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়ে।

কচি খন্দকার বলেন, সংস্কৃতির ওপর রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হলে বিপর্যয় দেখা দেয় এবং মানুষের সঙ্গে সংস্কৃতির বিচ্ছিন্নতা বাড়ে। রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে কালো রং লাগানোর প্রসঙ্গ তুলে তিনি প্রশ্ন করেন, ওই কালিমার প্রভাব কি শেষ পর্যন্ত আমাদের ওপরও পড়েনি?

আখতারুজ্জামান বলেন, তাঁরা বর্তমানে অত্যন্ত কঠিন সময় পার করছেন। কী লেখা যাবে আর কী লেখা যাবে না, তা নিয়ে ভাবতে গিয়েই অনেক সময় ব্যয় হচ্ছে। একসময় প্রতিদিন সন্ধ্যায় নাটক নিয়ে আড্ডা হতো, কিন্তু বর্তমান অনিশ্চয়তায় সেই পরিবেশ আর আগের মতো নেই। পরিস্থিতি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘পাগল হয়ে যাওয়া কেবল বাকি আছে।’

অনুষ্ঠানে উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে তৌকীর আহমেদ বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। সাধারণ মানুষের সঙ্গে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সম্পর্ক, দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা এবং ভবিষ্যতে সংস্কৃতিচর্চার সম্ভাবনা নিয়ে সেখানে আলোচনা করা হয়।

এ ছাড়া আলোচনায় অংশ নেন আশীষ খন্দকার, ঠাণ্ডু রায়হান, আলোক বসু, অধ্যাপক ইউসুফ হাসান অর্ক, অপূর্ব কুমার কুণ্ডু ও ড. ইসলাম শফিকসহ নাট্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের আরও কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি।