বিএনপির রাজনীতিতে দীর্ঘ সময় একসঙ্গে থাকার পর অধ্যাপক ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী ও কর্নেল (অব.) অলি আহমদের রাজনৈতিক পথ আলাদা হয়ে যায়। পরে দুজনই বিএনপি ছেড়ে পৃথক রাজনৈতিক দল গঠনের সঙ্গে যুক্ত হন। এবার তাদের সেই রাজনৈতিক বিচ্ছেদের পেছনের কারণ ও পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে নিজের বক্তব্য তুলে ধরেছেন অলি আহমদ।
সম্প্রতি সাংবাদিক ও উপস্থাপক খালেদ মুহিউদ্দীনের ‘ঠিকানা’ টকশোতে অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। অলি আহমদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিএনপির সঙ্গে নানা বিষয়ে মতপার্থক্য তৈরি হওয়ার পর তারা নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
তিনি জানান, বদরুদ্দোজা চৌধুরী, শেখ রাজ্জাক ও তিনি এক বৈঠকে বসে বিএনপির বাইরে আলাদা রাজনৈতিক দল গঠনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেন। অলি আহমদের দাবি, বিএনপির ভেতরে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ এবং অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের দল থেকে সরিয়ে দেওয়ার পক্ষে তারা অবস্থান নিয়েছিলেন। কিন্তু এসব বিষয়ে প্রত্যাশিত পদক্ষেপ না হওয়ায় তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়।
অলি আহমদ বলেন, নতুন দল গঠনের বিষয়ে আলোচনা চললেও এর মধ্যেই বদরুদ্দোজা চৌধুরী ‘বিকল্পধারা বাংলাদেশ’ গঠন করেন। পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক পরিস্থিতির একপর্যায়ে বিএনপির নেতাকর্মীদের ধাওয়ার মুখে বি. চৌধুরী আহত হওয়ার পর তার সঙ্গে যোগাযোগের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
অলি আহমদের বর্ণনা অনুযায়ী, সে সময় ব্রিগেডিয়ার গিয়াস তার কাছে গিয়ে বদরুদ্দোজা চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করার অনুরোধ জানান। পরে রাতে তিনি রাজ্জাক আলীকে সঙ্গে নিয়ে বি. চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করেন। ওই সাক্ষাতে আগের রাজনৈতিক পরিকল্পনার কথা মনে করিয়ে দিলে বদরুদ্দোজা চৌধুরী নতুন দলের নাম হিসেবে ‘লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি’ বা এলডিপির কথা জানান বলে দাবি করেন অলি।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, বদরুদ্দোজা চৌধুরীর সঙ্গে থাকা মেজর মান্নান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পাটোয়ারীসহ কয়েকজনও পরবর্তী সময়ে এলডিপিতে যোগ দেন।
তবে দল গঠনের শুরু থেকেই তাদের মধ্যে কিছুটা ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়েছিল বলে দাবি করেন অলি আহমদ। তার অভিযোগ, একটি দলীয় কার্যালয় থাকার কথা বলা হলেও পরে সেখানে গিয়ে তিনি জানতে পারেন সেটি আসলে বদরুদ্দোজা চৌধুরীর বাসা ছিল। বিষয়টিকে তিনি শুরুতেই তৈরি হওয়া একটি আস্থার সংকট হিসেবে উল্লেখ করেন।
অলি আহমদ আরও জানান, তিনি বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে বলেছিলেন, সাবেক রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি দলের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির দায়িত্ব পালন করবেন, আর দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম অন্যদের ওপর ছেড়ে দেবেন। তার দাবি, বি. চৌধুরী এ বিষয়ে সম্মতও হয়েছিলেন।
পরবর্তী সময়ে বি. চৌধুরীর ছেলে মাহি বি. চৌধুরীকে ঘিরেও তাদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয় বলে দাবি করেন অলি আহমদ। তার ভাষ্য, মাহি তার বাবাকে জানিয়েছিলেন যে বিভিন্ন টেলিভিশন ও গণমাধ্যমে অলি আহমদ বেশি প্রচার পাচ্ছেন এবং বি. চৌধুরীকেও রাজনৈতিকভাবে আরও সক্রিয়ভাবে সামনে আসা প্রয়োজন। অলি বলেন, তারা তখন সেই প্রস্তাবও মেনে নিয়েছিলেন।
তবে ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আসন সমঝোতার সময় দুই পক্ষের মধ্যে বড় ধরনের মতবিরোধ তৈরি হয় বলে দাবি করেন তিনি। অলি আহমদের বক্তব্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে একাধিক আসনে সমঝোতার সুযোগ তৈরি হলেও একটি নির্দিষ্ট আসনকে কেন্দ্র করে বি. চৌধুরীর সঙ্গে দলের অন্য নেতাদের মতবিরোধ দেখা দেয়।
ওই আসনকে কেন্দ্র করে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ ওঠে বলেও দাবি করেন অলি আহমদ। তার ভাষ্য, এ ঘটনায় এলডিপির নেতারা বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে সম্মানের সঙ্গে দল থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার অনুরোধ করেছিলেন।
অলি আহমদের বক্তব্য অনুযায়ী, তারা বি. চৌধুরীকে বলেছিলেন যে তাকে অসম্মান করার কোনো ইচ্ছা তাদের নেই এবং তিনি চাইলে নিজের পুরোনো রাজনৈতিক দল বিকল্পধারায় ফিরে যেতে পারেন। তার দাবি, এসব ঘটনার পরই দুজনের রাজনৈতিক সম্পর্কের দূরত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
তবে অলি আহমদের এসব বক্তব্য তার নিজের বর্ণনা ও অভিযোগের ভিত্তিতে দেওয়া। সংশ্লিষ্ট অন্য পক্ষের বক্তব্য বা এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।



