রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মনোনয়ন চূড়ান্ত হওয়ার পর জাতীয় সংসদে তার বর্তমান দায়িত্ব ও আসনকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে সামনে এসেছে সরকারি দলের সংসদ উপনেতার পদটিও। মির্জা ফখরুল বঙ্গভবনে গেলে তার বর্তমান দায়িত্বে পরিবর্তন আসবে। তবে তার জায়গায় সংসদ উপনেতা হিসেবে নতুন কাউকে নিয়োগ দেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।
সংসদীয় রীতি অনুযায়ী, সংসদ উপনেতা সাধারণত সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রীর কাছাকাছি আসনে বসেন। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর পাশের আসনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বসতেন। তার পরের আসনে রয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং এরপর সালাহউদ্দিন আহমদ। ফলে নতুন কাউকে সংসদ উপনেতা করা হলে সংসদের আসন বিন্যাসেও পরিবর্তন আনতে হবে।
বিএনপির প্রবীণ নেতা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নাম অতীতে সংসদ উপনেতা ও রাষ্ট্রপতি—দুই পদ নিয়েই আলোচনায় ছিল। তবে বর্তমানে তিনি শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকায় তাকে নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। ফলে মির্জা ফখরুলের পর সংসদ উপনেতার দায়িত্বে কে আসবেন, সেটি এখনো স্পষ্ট নয়।
বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাসে অবশ্য এ পদ দীর্ঘ সময় খালি রাখার নজির রয়েছে। ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের সময় অধ্যাপক ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী সংসদ উপনেতার দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু ২০০১ সালে বিএনপি আবার সরকার গঠন করার পর দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের মধ্যে পদটি নিয়ে প্রতিযোগিতা তৈরি হওয়ায় কাউকে সংসদ উপনেতা করা হয়নি।
সেই সময় বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়া এবং স্থায়ী কমিটির সদস্য এম সাইফুর রহমান ও ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নাম আলোচনায় ছিল। শেষ পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ সমীকরণের কারণে পদটি শূন্যই রাখা হয়।
পরবর্তীতে ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর বিএনপি বিরোধী দলে থাকাকালেও বিরোধীদলীয় উপনেতার পদ নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার ও সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর নাম সামনে এলেও শেষ পর্যন্ত কাউকেই ওই দায়িত্ব দেওয়া হয়নি।
এই অতীত নজিরের কারণে এবারও মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিলে সংসদ উপনেতার পদটি শূন্য রাখা হবে কি না, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা চলছে। তবে এ বিষয়ে বিএনপির আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না।
এদিকে বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাস পূর্ণ হতে যাচ্ছে ১৬ আগস্ট। এর পরদিন ২০ আগস্ট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে দেশের নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। সবকিছু নির্ধারিত অনুযায়ী এগোলে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২০ অথবা ২১ আগস্ট রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিতে পারেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
রাষ্ট্রপতির শপথের পর মন্ত্রিসভায় পরিবর্তন আসতে পারে—এমন আলোচনা এরই মধ্যে রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে। সম্ভাব্য পুনর্গঠনকে ঘিরে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী হওয়ার প্রত্যাশী নেতাদের মধ্যে যেমন তৎপরতা বেড়েছে, তেমনি বর্তমান মন্ত্রিসভার যেসব সদস্য বাদ পড়ার আশঙ্কা করছেন, তারাও নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ করছেন বলে জানা গেছে।
মন্ত্রিসভায় সম্ভাব্য পরিবর্তন নিয়ে বিএনপির নেতাদের মধ্যে নানা আলোচনা চললেও এখন পর্যন্ত সরকারিভাবে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। তবে এরই মধ্যে দলের মিত্র বিজেপির চেয়ারম্যান ও সংসদ সদস্য আন্দালিব রহমান পার্থ মন্ত্রিসভায় যুক্ত হতে পারেন বলে রাজনৈতিক সূত্রে আলোচনা রয়েছে। একই সঙ্গে টেকনোক্রেট কোটায় ড. আসাদুজ্জামান রিপনের নামও আলোচনায় রয়েছে।
সব মিলিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, মির্জা ফখরুলের বঙ্গভবনে যাত্রা এবং সম্ভাব্য মন্ত্রিসভা পুনর্গঠন—এই তিনটি বিষয়কে ঘিরে সরকারের ভেতরে ও বিএনপির রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, মির্জা ফখরুলের বিদায়ের পর সংসদ উপনেতার গুরুত্বপূর্ণ পদে নতুন মুখ আসে, নাকি বিএনপির অতীতের নজির অনুসরণ করে পদটি আবারও খালি রাখা হয়।



