রাজধানীর মহাখালী বাস টার্মিনালের যানজট কমাতে পূর্বাচলে চালু করা অস্থায়ী বাস ডিপোতে যেতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না অধিকাংশ চালক। উদ্বোধনের প্রায় দুই সপ্তাহ পার হলেও বেশির ভাগ পরিবহন ডিপোটি ব্যবহার না করায় মহাখালী এলাকায় আগের মতোই সড়কের পাশে বাস পার্কিং করা হচ্ছে। ফলে যানজট নিরসনে ডিপো চালুর মূল উদ্দেশ্য এখনো পূরণ হয়নি।
কালবেলার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১৬ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে পূর্বাচলের অস্থায়ী বাস ডিপোটি উদ্বোধন করা হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, দূরপাল্লার বাসগুলো নির্ধারিত সময়ের কয়েক ঘণ্টা আগে পূর্বাচলে অবস্থান করবে। পরে সিরিয়াল অনুযায়ী মহাখালী টার্মিনালে গিয়ে যাত্রী নিয়ে গন্তব্যের উদ্দেশে ছেড়ে যাবে। এতে মহাখালী এলাকায় অপ্রয়োজনীয় বাসের অবস্থান কমার পাশাপাশি যানজটও নিয়ন্ত্রণে আসার কথা।
তবে মঙ্গলবার পূর্বাচলের ৩ নম্বর সেক্টরে অবস্থিত ডিপোটি ঘুরে দেখা যায়, বিশাল জায়গাজুড়ে মাত্র ২০টির মতো বাস রাখা হয়েছে। অথচ সেখানে শতাধিক বাস রাখার সক্ষমতা রয়েছে। বিলাশ, আহনাল, ইকবাল, সাভার, দিশারী, গ্রিন বাংলা, হাজী ট্রাভেল, পিংকি ও হানিফ পরিবহনের কিছু বাস ডিপোতে থাকলেও অধিকাংশ পরিবহন এখনো আগের ব্যবস্থাতেই চলছে।
পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু ডিপো উদ্বোধন করলেই হবে না; সব পরিবহনকে কার্যকরভাবে এই ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে। তা না হলে মহাখালীর যানজট কমানোর কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে না।
কুড়িগ্রাম রুটের পিংকি পরিবহনের চালক আলমগীর বলেন, দূরবর্তী জেলার কিছু বাস বর্তমানে পূর্বাচলে রাখা হচ্ছে। তবে সব বাস সেখানে যাচ্ছে না। অনেক বাস ট্রিপ শেষ করে অন্যত্র চলে যায়। তিনি আরও বলেন, চার দিন ধরে ডিপোতে অবস্থান করলেও খাবারের ব্যবস্থা না থাকায় চালক-শ্রমিকদের ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
আহনাল পরিবহনের সুপারভাইজার বাবু জানান, মহাখালী টার্মিনালে সমিতিভুক্ত নয়—এমন বাস রাখলে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয়। এ কারণেও কিছু পরিবহন পূর্বাচলের ডিপো ব্যবহার শুরু করেছে।
চালক-শ্রমিকদের অভিযোগ, ডিপোতে এখনো প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। খাবারের ব্যবস্থা নেই, আশপাশে কোনো রেস্তোরাঁও নেই। পাশাপাশি মানসম্মত টয়লেটের সংকট রয়েছে। বিলাশ পরিবহনের চালক মেহেদী হাসান বলেন, বাস রাখার ব্যবস্থা থাকলেও খাবারের জন্য কয়েক কিলোমিটার দূরে যেতে হচ্ছে।
তবে ট্রাফিক পুলিশের উদ্যোগে চালক-শ্রমিকদের জন্য অস্থায়ী তাবু, খাট, বিছানা ও ফ্যানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের উদ্যোগে বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থাও করা হয়েছে। কিন্তু ডিপোর মেঝে এখনো কাঁচা থাকায় বালুর কারণে চলাচলে ভোগান্তি হচ্ছে। দিনের বেলায় তাবুর ভেতরের তীব্র গরমেও দুর্ভোগ বাড়ছে।
দায়িত্বরত ট্রাফিক কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, প্রতিদিনই ডিপোতে বাসের সংখ্যা বাড়ছে। বুধবার দুপুর পর্যন্ত আগের দিনের তুলনায় আরও ১৪টি বাস সেখানে প্রবেশ করেছে। নিরাপত্তা পরিস্থিতিও স্বাভাবিক রয়েছে। দ্রুত খাবারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে এবং দুটি রেস্তোরাঁ চালুর প্রস্তুতি চলছে। পাশাপাশি মূল সড়ক থেকে ডিপোতে প্রবেশের পথে থাকা গর্ত ভরাটের কাজও চলছে।
রাজউকের দায়িত্বপ্রাপ্ত আনসারের সহকারী কমান্ডার মো. রুবেল হোসেন জানান, প্রয়োজন অনুযায়ী ১০ থেকে ১৬ জন আনসার সদস্য পালাক্রমে ডিপোতে দায়িত্ব পালন করছেন। বর্তমানে রাজউকের ১৫ জন আনসার সদস্য, ট্রাফিক বিভাগের তিনজন এবং পুলিশ লাইনের ১৮ সদস্য নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছেন।
রাজউকের হয়ে মাঠ উন্নয়নের দায়িত্বে থাকা কনভয় সার্ভিসের প্রকৌশলী সুদীপ্ত সরকার বলেন, বর্তমানে প্রায় ১৫০ ফুট বাই ৬০০ ফুট এলাকা বাস রাখার উপযোগী করা হচ্ছে। আগামী ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। প্রায় ১০ একর জায়গাজুড়ে স্থায়ী বাস টার্মিনালে শেড, ওয়েটিং রুম, ক্যান্টিন, ওয়াশরুম, নামাজের স্থান ও আধুনিক বাস ডিপো নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে সরেজমিনে দেখা গেছে, রাজউকের উচ্ছেদ অভিযান ও বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে উন্নয়নকাজ ধীরগতিতে এগোচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূর না হওয়া পর্যন্ত অধিকাংশ পরিবহনকে ডিপো ব্যবহারে উৎসাহিত করা কঠিন হবে।
ঢাকা জেলা বাস-মিনিবাস সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত সহসভাপতি ইউসুফ মির্জা বলেন, বৃষ্টি না হলে আগামী ১৫ আগস্টের মধ্যে ডিপোটি পুরোপুরি যানবাহন রাখার উপযোগী হবে। তখন আরও বেশি বাস সেখানে স্থানান্তর করা হবে। আগস্টের মধ্যেই খাবারের ব্যবস্থা, গ্যারেজসহ প্রয়োজনীয় অন্যান্য সুবিধা চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।



