ডয়চে ভেলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সেনাবাহিনী থাকবে অন্যান্য বাহিনীর মতোই পূর্ণ ক্ষমতায়। শুধু ‘স্ট্রাইকিং ফোর্স’ হিসেবে নয়, এবার তারা ম্যাজিস্ট্রেসি ও পুলিশি ক্ষমতাসহ সরাসরি দায়িত্ব পালন করবে বলে জানানো হয়েছে। এজন্য নির্বাচন কমিশন (ইসি) গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ (আরপিও) সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে এবং সংশোধিত প্রস্তাবটি প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরের মাধ্যমে সরকারের কাছে পাঠানো হচ্ছে।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ ডয়চে ভেলেকে বলেন, “আমরা আরপিওতে সংশোধনী এনে সেনাবাহিনীকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত করেছি। আগে এ তালিকায় ছিল শুধু পুলিশ, কোস্টগার্ড, বিজিবি, আনসার প্রভৃতি। এবার সেনাবাহিনীকেও যুক্ত করা হয়েছে। প্রস্তাবটি এ সপ্তাহের মধ্যেই সরকারের কাছে পাঠানো হবে।”
তিনি আরও বলেন, “১৬ বছর আগে সেনাবাহিনীকে আরপিও থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। এবার নতুন করে অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা ব্যবস্থায় জনগণের আস্থা ফেরানো সম্ভব হবে বলে আমরা মনে করি।”
আইনি কাঠামোতে সেনাবাহিনীর ক্ষমতা নিশ্চিত
২০০১ সালে সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে প্রথমবার সেনাবাহিনীকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংজ্ঞায় আনা হয়। তখন আরপিওর ৮৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়, নির্বাচনকালে আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর সদস্য—যিনি পুলিশ না হলেও—বিনা পরোয়ানায় কাউকে গ্রেফতার করতে পারবেন। তবে ২০০৮ সালে নবম জাতীয় নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ সরকার সেনাবাহিনীকে সেই সংজ্ঞা থেকে বাদ দেয়, ফলে তারা পূর্ণ ক্ষমতা হারায়।
বর্তমান কমিশন আবারও সেই ক্ষমতা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে, যাতে সেনাবাহিনী নিজস্ব কমান্ডের অধীনে, সরাসরি কমিশনের চাহিদায় মোতায়েন হয়ে, নিরপেক্ষভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে পারে।
ম্যাজিস্ট্রেসি ও পুলিশের ক্ষমতা পাবেন সেনা সদস্যরা
সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম বলেন, “এই সংশোধনী হলে সেনা সদস্যরা আর শুধুই স্ট্রাইকিং ফোর্স থাকবে না। তারা সরাসরি মাঠে নামবে এবং ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি ছাড়াই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারবে।”
তিনি বলেন, “আগে নির্বাচন কমিশন সেনাবাহিনী চাইলেও পেত না। এখন সরাসরি সেনা সদর দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করে তারা মোতায়েন নিশ্চিত করতে পারবে। প্রশাসনের রাজনৈতিক প্রভাব এড়াতে এটি বড় পদক্ষেপ।”
বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে সেনাবাহিনীর ভূমিকা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ মনে করেন, “বাংলাদেশের নির্বাচনি বাস্তবতায় সেনাবাহিনীর উপস্থিতি অত্যন্ত জরুরি। তাদের শুধু স্ট্রাইকিং ফোর্স নয়, পূর্ণ ক্ষমতায় নিয়োগ দিতে হবে। এতে করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হবে এবং আস্থার সংকট দূর হবে।”
তিনি বলেন, “২০১৮ সালের নির্বাচনে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন উঠেছে। এরপর বিভিন্ন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশের ওপর জনগণের আস্থা কমেছে। এ অবস্থায় সেনাবাহিনীর সক্রিয় অংশগ্রহণ নির্বাচনকে আরও গ্রহণযোগ্য করতে পারে।”
আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে পরিবর্তনের গুরুত্ব
নির্বাচন আইন বিশেষজ্ঞ অ্যাডভোকেট আহসানুল করিম বলেন, “সেনাবাহিনীকে যদি ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতাসহ আইনের আওতায় আনতে পারা যায়, তবে তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবে। তবে বারবার উপ-নির্বাচনের জন্য সেনাবাহিনী মোতায়েন কতটা বাস্তবসম্মত হবে, সেটা ভেবে দেখতে হবে।”
তিনি যোগ করেন, “শেষ পর্যন্ত সুষ্ঠু নির্বাচন নির্ভর করে সরকারের সদিচ্ছা, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা এবং প্রশাসনের নিষ্ঠার ওপর।”
আইনের অধীনে দায়িত্ব পালনের পথ সুগম
ইসি কমিশনার মাছউদ বলেন, “বর্তমানে নির্বাচন নিয়ে জনমনে যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে, সেটি কাটানোর লক্ষ্যেই সেনাবাহিনীকে আইনি কাঠামোর মধ্যে এনে নির্বাচন কমিশনের অধীনে কার্যকরভাবে নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এখন থেকে অন্যান্য বাহিনীর মতো সেনাবাহিনীকেও প্রয়োজন অনুযায়ী চাওয়া যাবে এবং তারা পূর্ণ ক্ষমতায় কাজ করতে পারবে।”



