কম্পিউটারের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করা কিংবা মোবাইল ফোন ব্যবহারের সময় দীর্ঘক্ষণ মাথা নিচু করে রাখার অভ্যাস শরীরের স্বাভাবিক ভঙ্গিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এতে ঘাড়, কাঁধ ও পিঠের পেশিতে চাপ বাড়ে। সময়ের সঙ্গে দেখা দিতে পারে পেশির শক্তভাব, ব্যথা এবং শরীরের নমনীয়তা কমে যাওয়ার মতো সমস্যা। তবে নিয়মিত কিছু যোগাসন অনুশীলন ও দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিবর্তন এনে শরীরের ভঙ্গি উন্নত করা এবং পেশির নমনীয়তা ধরে রাখতে সহায়তা পাওয়া যায়।
শরীরের সঠিক ভঙ্গি বজায় রাখা শুধু দেখতে সুন্দর লাগার বিষয় নয়, এটি পেশি ও অস্থিসন্ধির স্বাভাবিক কার্যকারিতার সঙ্গেও সম্পর্কিত। সঠিকভাবে বসা, দাঁড়ানো ও হাঁটার অভ্যাস মেরুদণ্ডের স্বাভাবিক অবস্থান বজায় রাখতে এবং শরীরের ভারসাম্যপূর্ণ বণ্টনে সাহায্য করে।
বিশেষ করে পিঠ, কাঁধ, কোমর ও পেটের পেশিকে সক্রিয় রাখে এমন যোগাসন শরীরের স্থিতিশীলতা বাড়াতে পারে। দীর্ঘক্ষণ ডেস্কে বসে কাজ করেন এমন ব্যক্তিদের জন্য উপকারী ছয়টি আসন হলো—
১. তাড়াসন (মাউন্টেন পোজ)
তাড়াসন দেখতে সহজ হলেও এটি সোজা হয়ে দাঁড়ানোর অভ্যাস গড়ে তুলতে সাহায্য করে। যারা দীর্ঘ সময় বসে কাজ করেন কিংবা মোবাইল ব্যবহারের সময় মাথা সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে রাখেন, তাঁদের জন্য এই আসন উপকারী হতে পারে।
যেভাবে করবেন: দুই পায়ের মধ্যে স্বাভাবিক দূরত্ব রেখে সোজা হয়ে দাঁড়ান। হাত দুটি শরীরের পাশে রাখুন এবং থুতনি মেঝের সমান্তরালে রাখুন। কাঁধ স্বাভাবিক অবস্থায় রেখে ধীরে ধীরে শ্বাস নিন। এভাবে ৩০ থেকে ৬০ সেকেন্ড থাকুন। পুরো সময় শরীর সোজা রাখার দিকে খেয়াল করুন।
২. মার্জারাসন-বিতিলাসন (ক্যাট-কাউ পোজ)
এই আসনে পিঠ পর্যায়ক্রমে বাঁকানো ও গোলাকার করা হয়। দীর্ঘক্ষণ একই ভঙ্গিতে বসে থাকার কারণে পিঠে যে জড়তা তৈরি হতে পারে, তা কমাতে এই অনুশীলন সাহায্য করতে পারে।
যেভাবে করবেন: হাত ও হাঁটু মেঝেতে রেখে অবস্থান নিন। কবজি কাঁধের নিচে এবং হাঁটু কোমরের নিচে রাখুন। শ্বাস নেওয়ার সময় পেট সামান্য নিচে নামিয়ে বুক সামনে তুলুন। এরপর শ্বাস ছাড়ার সময় পিঠ ওপরের দিকে গোল করে মাথা আলতোভাবে নিচু করুন। ধীরে ধীরে এভাবে ৮ থেকে ১০ বার করুন।
৩. ভুজঙ্গাসন (কোবরা পোজ)
ভুজঙ্গাসনে বুকের ওপরের অংশ ধীরে ধীরে তোলা হয়। এতে পিঠের পেশি সক্রিয় হওয়ার পাশাপাশি বুক ও পেটের সামনের অংশে হালকা প্রসারণ তৈরি হয়।
যেভাবে করবেন: উপুড় হয়ে শুয়ে বুকের দুই পাশে হাতের তালু রাখুন। কনুই শরীরের কাছাকাছি রাখুন। এরপর ধীরে ধীরে মাথা ও বুকের ওপরের অংশ তুলুন। কোমরে অতিরিক্ত চাপ না দিয়ে শরীরের নিচের অংশ মেঝেতে রাখুন। কাঁধ কান থেকে দূরে রাখুন। ১০ থেকে ২০ সেকেন্ড পর ধীরে ধীরে আগের অবস্থায় ফিরে আসুন।
৪. অধোমুখ শ্বানাসন (ডাউনওয়ার্ড-ফেসিং ডগ)
এই যোগাসনে শরীরের একাধিক পেশি একসঙ্গে প্রসারিত হয়। নিয়মিত ও সঠিকভাবে করলে কাঁধ, পিঠ এবং উরুর পেছনের অংশের নমনীয়তা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।
যেভাবে করবেন: প্রথমে হাত ও হাঁটুর ওপর ভর দিয়ে থাকুন। পায়ের আঙুল মেঝেতে ভাঁজ করে কোমর ধীরে ধীরে ওপরে তুলুন, যাতে শরীর উল্টো ‘ভি’ আকৃতি নেয়। পিঠ যতটা সম্ভব লম্বা রাখুন। ১৫ থেকে ৩০ সেকেন্ড স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিতে নিতে অবস্থানটি ধরে রাখুন। গোড়ালি জোর করে মেঝেতে নামানোর প্রয়োজন নেই।
৫. সেতুবন্ধাসন (ব্রিজ পোজ)
নিতম্ব, পেটের কেন্দ্রীয় পেশি এবং কোমরের আশপাশের পেশি শরীরের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ। সেতুবন্ধাসন এসব পেশিকে সক্রিয় করতে সাহায্য করে।
যেভাবে করবেন: চিত হয়ে শুয়ে হাঁটু ভাঁজ করুন এবং দুই পা মেঝেতে সমানভাবে রাখুন। পা দুটি কোমরের সমান দূরত্বে রাখুন। হাত শরীরের পাশে রেখে পায়ের পাতায় হালকা চাপ দিন। এরপর ধীরে ধীরে কোমর ও নিতম্ব ওপরে তুলুন। ১০ থেকে ২০ সেকেন্ড ধরে রেখে আস্তে আস্তে নিচে নামুন।
৬. বালাসন (চাইল্ডস পোজ)
দীর্ঘক্ষণ ডেস্কে বসে কাজ করার পর পিঠ ও কোমরে অস্বস্তি অনুভূত হলে বালাসন আরামদায়ক একটি অনুশীলন হতে পারে। এই আসনে শরীরকে বিশ্রামের ভঙ্গিতে রাখা হয় এবং পিঠের পেশিতে হালকা প্রসারণ তৈরি হয়।
যেভাবে করবেন: মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসুন। নিতম্ব ধীরে ধীরে গোড়ালির দিকে নামিয়ে আনুন। হাত দুটি সামনের দিকে প্রসারিত করে শরীর যতটা আরামদায়ক হয়, ততটা সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে দিন। কপাল মাদুরে রাখুন। ৩০ থেকে ৬০ সেকেন্ড ধীরে শ্বাস নিতে নিতে এ অবস্থায় থাকুন।
যোগাসনের পাশাপাশি যে অভ্যাসগুলো জরুরি
শুধু যোগাসন করলেই শরীরের ভঙ্গির সব সমস্যা দূর হবে, এমন নয়। দৈনন্দিন কাজের ধরনেও কিছু পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।
- দীর্ঘক্ষণ একটানা বসে না থেকে নিয়মিত বিরতিতে উঠে হাঁটাচলা করুন।
- কম্পিউটারের পর্দা চোখের কাছাকাছি উচ্চতায় রাখুন, যাতে বারবার মাথা নিচু করতে না হয়।
- বসার সময় পিঠের যথাযথ সমর্থন নিশ্চিত করুন এবং কাঁধ স্বাভাবিক অবস্থায় রাখুন।
- মোবাইল ফোন ব্যবহারের সময় দীর্ঘক্ষণ ঘাড় নিচু করে রাখা এড়িয়ে চলুন।
- নিয়মিত হালকা শরীরচর্চা ও পেশি শক্তিশালী করার ব্যায়াম করুন।
যোগাসন করার সময় ব্যথা বা অস্বস্তি হলে জোর করে অবস্থান ধরে রাখবেন না। আগে থেকে ঘাড়, পিঠ বা কোমরে সমস্যা থাকলে অনুশীলন শুরুর আগে চিকিৎসক কিংবা প্রশিক্ষিত যোগাসন শিক্ষকের পরামর্শ নেওয়া ভালো। নিয়মিত অনুশীলন, কাজের মাঝে বিরতি এবং সঠিকভাবে বসা-দাঁড়ানোর অভ্যাস একসঙ্গে শরীরের ভঙ্গি ও নমনীয়তা বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে।



