tanaka
প্রচ্ছদসারাদেশএক শতাব্দীর বেশি বয়সেও থামেনি সমসু মিয়ার মানবসেবা

এক শতাব্দীর বেশি বয়সেও থামেনি সমসু মিয়ার মানবসেবা

বয়স ১১০ বছর। শরীরের শক্তি কমেছে, হাঁটাচলার জন্য নির্ভর করতে হয় লাঠির ওপর। তবু মানুষের প্রতি ভালোবাসা আর নিঃস্বার্থ সেবার মানসিকতা এখনো অটুট। জীবনের দীর্ঘ সময় ধরে কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই শতাধিক মানুষের শেষ ঠিকানা কবর খুঁড়েছেন হবিগঞ্জের মাধবপুর পৌরসভার শিবপুর গ্রামের সমসু মিয়া।

গ্রামে কারও মৃত্যুর খবর পেলেই কোদাল-শাবল নিয়ে ছুটে যেতেন তিনি। প্রচণ্ড রোদ, বৃষ্টি কিংবা শীত—কোনো প্রতিকূলতাই তাঁকে দায়িত্ব থেকে সরাতে পারেনি। বিনিময়ে অর্থ পাওয়ার প্রত্যাশা ছিল না তাঁর; সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টি অর্জন আর বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর তাগিদ থেকেই বছরের পর বছর এই কাজ করে গেছেন তিনি।

শিবপুর ও আশপাশের এলাকায় কারও মৃত্যু হলে সমসু মিয়াকে খবর দেওয়া হতো। শোকাহত পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে কবরের স্থান ঠিক করা থেকে শুরু করে নিজের হাতে মাটি কাটার কাজও করতেন। নীরবে ও নিঃস্বার্থভাবে পালন করতেন মৃত ব্যক্তির শেষ বিদায়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

স্থানীয় প্রবীণদের মতে, সমসু মিয়ার অবদান শুধু কবর খননের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি অনেক তরুণকে নিয়ম মেনে কবর খোঁড়ার পদ্ধতিও শিখিয়েছেন। তাঁর কাছে এটি কখনো জীবিকা অর্জনের মাধ্যম ছিল না; বরং মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ ও ভালোবাসারই বহিঃপ্রকাশ।

তবে বয়সের ভারে এখন আর আগের মতো কঠোর পরিশ্রম করা সম্ভব হয় না। ১১০ বছর বয়সে শক্ত মাটি খুঁড়ে কবর তৈরি করার সামর্থ্য কমে গেলেও মৃত্যুর খবর পেলে এখনো সেখানে যাওয়ার চেষ্টা করেন। নিজ হাতে কবর খুঁড়তে না পারলেও পাশে থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও নির্দেশনা দেন।

শারীরিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও নিয়মিত ধর্মীয় জীবন চালিয়ে যাচ্ছেন সমসু মিয়া। লাঠিতে ভর দিয়ে প্রায় ৬০ মিটার দূরের মসজিদে গিয়ে এখনো জামাতে নামাজ আদায় করেন তিনি।

জীবন ও মৃত্যু সম্পর্কে তাঁর উপলব্ধিও গভীর। সমসু মিয়ার বিশ্বাস, পৃথিবীতে মানুষের জীবন ক্ষণস্থায়ী এবং একদিন সবাইকে চলে যেতে হবে। তাই মানুষের শেষযাত্রায় পাশে থাকতে পারাকেই জীবনের অন্যতম বড় তৃপ্তি হিসেবে দেখেন তিনি।

শিবপুর গ্রামের সাংবাদিক সাব্বির হাসান জানান, গ্রামবাসীর কাছে সমসু মিয়া এখন নিছক একজন প্রবীণ মানুষ নন; তিনি নিঃস্বার্থতা ও পরোপকারের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও তাঁর মধ্যে নেই কোনো আত্মপ্রচার কিংবা প্রতিদানের প্রত্যাশা।

মানুষের জীবনের শেষ গন্তব্য কবর। আর সেই কবর খুঁড়েই জীবনের একটি বড় অংশ কাটিয়েছেন সমসু মিয়া। কোনো স্বীকৃতি বা বিনিময়ের আশা না করে মানুষের পাশে থাকার এই দীর্ঘ ইতিহাস তাঁকে শিবপুর গ্রামের মানুষের কাছে স্মরণীয় করে রাখবে।