tanaka
প্রচ্ছদআন্তর্জাতিকতারেক রহমানের দিল্লি সফর ভারতের কাছে কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

তারেক রহমানের দিল্লি সফর ভারতের কাছে কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

চলতি মাসের শুরুতে ভারতের রাষ্ট্রপতির দপ্তর থেকে পাঠানো একটি বার্তা কূটনীতিক ও সাংবাদিকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করে। বার্তায় জানানো হয়, রাষ্ট্রপতি ভবনের নিয়মিত ‘চেঞ্জ অব গার্ড’ অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়েছে। কারণ, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানানোর মহড়া আয়োজন করা হচ্ছে।

তবে তখন পর্যন্ত তারেক রহমানের ভারত সফরের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা আসেনি। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ওই ই-মেইলটি প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। তবে এর মধ্য দিয়ে তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফর নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা জল্পনা আরও জোরালো হয়। একই সঙ্গে বাংলাদেশের নতুন সরকারপ্রধানকে দিল্লিতে আমন্ত্রণ জানাতে ভারতের আগ্রহও প্রকাশ্যে আসে।

তবে এখনো তারেক রহমান ভারতের সফরের আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য নেই। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব এএমএম সালেহ জানিয়েছেন, সফর নিয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

তারেক রহমানকে আলোচনার জন্য দিল্লিতে স্বাগত জানাতে আগ্রহী ভারত। সফরের সম্ভাব্য সময়ও গুরুত্বপূর্ণ। ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বিপুল জয় পাওয়ার পর সরকার গঠনের পর এটিই হবে তারেক রহমানের প্রথম ভারত সফর।

মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের উল্লেখযোগ্য অবনতি ঘটে। এখন দিল্লির প্রত্যাশা, তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার দুই দেশের গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক নতুন করে গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি করবে।

তবে এ ক্ষেত্রে বড় একটি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ভারতে শেখ হাসিনার অবস্থান। বাংলাদেশ সরকার শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার জন্য ভারতের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে। গণঅভ্যুত্থানের সময় বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব এএমএম সালেহ বলেন, বাংলাদেশ একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরির আহ্বান জানিয়েছে এবং শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ দ্রুত করার বিষয়ে ভারতের প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।

ভারত জানিয়েছে, বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ অনুরোধটি তারা বিবেচনা করছে।

তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই ভারত তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে দিল্লি সফরের আমন্ত্রণ জানায়। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বাংলাদেশের বিভিন্ন কর্মকর্তার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেও এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন।

তারেক রহমান ভারত সফরে গেলে তাকে সর্বোচ্চ সম্মান দেওয়া হবে এবং স্মরণীয়ভাবে স্বাগত জানানো হবে বলেও জানিয়েছেন ত্রিবেদী।

প্রতিবেশী কোনো দেশের সরকারপ্রধানকে স্বাগত জানানোর ক্ষেত্রে ভারতের এমন প্রকাশ্য আগ্রহকে কিছুটা ব্যতিক্রমী হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব শ্যাম শরণ মনে করেন, শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণ না করায় দিল্লিতে কিছুটা হতাশা তৈরি হয়ে থাকতে পারে।

তিনি বলেন, হাসিনাকে হস্তান্তরের বিষয়টি বাদ দিলে ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে ভারত ইতোমধ্যে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে।

তার মতে, বাংলাদেশে তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটাতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ এবং চিকিৎসা ভিসা দেওয়ার মতো বিষয়গুলোতে ভারত সহযোগিতা অব্যাহত রেখেছে। একই সঙ্গে দুই দেশের বাণিজ্য সহজ করতে নেওয়া কিছু দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থাও পুনরায় চালু করা হয়েছে।

দুই দেশের স্বার্থই জড়িত

ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কের গুরুত্ব কেবল রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়। দুই দেশের মধ্যে ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। রয়েছে দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত যোগাযোগ। গত বছর দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ১২ বিলিয়ন ডলারের বেশি ছিল, যার বড় অংশই ভারতের পক্ষে ছিল।

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ সহজ করার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এদিকে গত ৫ আগস্ট দিল্লিতে দক্ষিণ এশিয়ার ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ভারতের মাটিতে হাসিনাকে প্রকাশ্যে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়ায় বাংলাদেশ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানায়।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অবশ্য জানিয়েছে, ওই অনুষ্ঠানে তাদের কোনো ভূমিকা ছিল না। অনুষ্ঠানে দেওয়া কোনো বক্তব্য—বিশেষ করে বাংলাদেশের সাংবিধানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত সরকারের বিষয়ে করা মন্তব্য—ভারত সমর্থন করে না বলেও জানানো হয়েছে।

সময়টিও ছিল অত্যন্ত স্পর্শকাতর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিন বলেন, শেখ হাসিনা ওই অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার আগে তারেক রহমানের দিল্লি সফরের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে—এমন খবর পাওয়া যাচ্ছিল।

তার মতে, হাসিনার বক্তব্য বাংলাদেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। এর ফলে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ দুই দেশের সম্পর্ক নতুন করে গড়ে তোলার বিষয়ে কতটা আন্তরিক, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

দিল্লি সফরে তারেক রহমানের রাজনৈতিক হিসাব

শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করার সময় তারেক রহমানের দিল্লি সফর বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভিন্ন ধরনের বার্তা তৈরি করতে পারে। ফলে এ সফর নিয়ে তারেক রহমানকেও রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক হিসাব-নিকাশ করতে হচ্ছে।

তবে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে শুধু শেখ হাসিনার বিষয়টিই নয়, আরও কিছু পরিবর্তন দিল্লির জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর বাংলাদেশ ভারতের দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের সঙ্গেও সম্পর্ক পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে।

ঢাকা ও ইসলামাবাদের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের সামরিক সফর বিনিময় হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও দুই দেশ প্রকাশ্যে আগ্রহ দেখিয়েছে। দিল্লি এসব উন্নয়ন ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

সম্প্রতি সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘মক্কা চুক্তি’ নিয়েও বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। চুক্তিটির বিস্তারিত এবং এর আওতায় প্রতিটি দেশের দায়িত্ব এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। তবে এটিকে ন্যাটোর সম্মিলিত প্রতিরক্ষা নীতির আদলে গঠিত একটি ব্যবস্থা হিসেবে দেখা হচ্ছে—যেখানে কোনো এক সদস্যের ওপর হামলাকে সব সদস্যের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

বাংলাদেশের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন কবির চলতি সপ্তাহে সাংবাদিকদের বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে উঠলে তাতে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের বিষয়টি বিবেচনা করা অস্বাভাবিক নয়। তিনি বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন বলে জানান।

সৌদি আরবও তারেক রহমানকে দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছে। তবে বাংলাদেশকে ওই প্রতিরক্ষা চুক্তিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিন মনে করেন, এ ধরনের বিষয়ে ঢাকার সতর্কতার সঙ্গে এগোনো উচিত। তার মতে, শুধু ভারতকে অসন্তুষ্ট করার বিষয়টি বিবেচনায় না নিয়ে বাংলাদেশকে কিছুটা সময় নিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে হবে এবং যেকোনো সিদ্ধান্ত দেশের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা দেখতে হবে।

বদলে যাচ্ছে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক

সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ ভারতকে মনে করিয়ে দিচ্ছে, বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক একটি পরিবর্তনশীল পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। শেখ হাসিনার সরকারের সময় দুই দেশের মধ্যে যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল, দিল্লি এখন আর সেটিকে স্বাভাবিক বা নিশ্চিত বলে ধরে নিতে পারছে না।

অন্যদিকে তারেক রহমানের সরকারেরও দেখাতে হবে যে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি বৃহৎ প্রতিবেশী ভারতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল নয়।

অধ্যাপক ইয়াসমিনের মতে, সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের আগে তারেক রহমানের দিল্লি সফর হলে তা দুই দেশের সম্পর্কের জন্য ইতিবাচক হতে পারে। তিনি মনে করেন, প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে যোগাযোগ ও আলোচনার কোনো বিকল্প নেই।

এর মধ্যেই আরেকটি সম্ভাব্য সুযোগ তৈরি হচ্ছে। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি ভারত ব্রিকস সম্মেলনের আয়োজন করতে যাচ্ছে এবং বাংলাদেশকে সেখানে বিশেষ অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

কয়েক সপ্তাহ ধরে আমন্ত্রণ, কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং আগেভাগে প্রকাশিত একটি ই-মেইলকে ঘিরে যে আলোচনা চলছে, তাতে এখন দিল্লির প্রত্যাশা—শেষ পর্যন্ত তারেক রহমান ভারত সফরে যাবেন এবং দুই দেশের সম্পর্ক নতুনভাবে এগিয়ে নেওয়ার পথ তৈরি হবে।

সূত্র: বিবিসি