tanaka
প্রচ্ছদজাতীয়নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্যে নাকাল মানুষ, কমছে না বাজারের অস্বস্তি

নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্যে নাকাল মানুষ, কমছে না বাজারের অস্বস্তি

সরকারি হিসাবে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও নিত্যপণ্যের দাম এখনো উচ্চ পর্যায়ে থাকায় বাজারে স্বস্তি ফিরছে না। বরং আয় বাড়ার তুলনায় পণ্যের দাম বেশি বাড়ায় জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে সাধারণ মানুষ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি কমে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে গড় মজুরি বেড়েছে ৮ দশমিক ২২ শতাংশ। ফলে টানা ৫৩ মাস ধরে মজুরি বৃদ্ধির হারের চেয়ে মূল্যস্ফীতি বেশি রয়েছে।

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকার গড় মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। তবে জুলাই পর্যন্ত ছয় মাসের গড় মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৯২ শতাংশে, যা সরকারের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে এখনো উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

ফেব্রুয়ারিতে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংকটের প্রভাব বিশ্ববাজারে পড়ে। এর প্রভাব পড়ে দেশের জ্বালানি খাতেও। এপ্রিলের মাঝামাঝি বিশ্ববাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাড়ানো হয় জ্বালানি তেলের দাম। এরপর জুন-জুলাইয়ে চট্টগ্রামে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়। সবশেষ চলতি মাসে মহেশখালীতে ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে (এফএসআরইউ) আগুন লাগার ঘটনায় দেশজুড়ে লোডশেডিং দেখা দেয়। জ্বালানি সংকটে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এর প্রভাব পড়ছে নিত্যপণ্যের বাজারেও।

চড়া দামের মধ্যেও মূল্যস্ফীতি কমার বিষয়টি নিয়ে গত ১২ আগস্ট এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, চাল ও মাংসের দাম কমার কারণেই জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি আট মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন হয়েছে। তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতির তথ্য পুনরায় যাচাই করা হয়েছে এবং তা সঠিকভাবেই প্রকাশ করা হয়েছে।

ছয় মাসে মূল্যস্ফীতির ওঠানামা

বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, সরকারের প্রথম মাস ফেব্রুয়ারিতে আগের মাসের তুলনায় মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। ওই মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল আগের ১০ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। ফেব্রুয়ারিতে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৩০ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ০১ শতাংশ। একই সময়ে জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ০৬ শতাংশ।

মার্চে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৮ দশমিক ৭১ শতাংশে দাঁড়ায়। ওই মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২৪ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ০৯ শতাংশ। জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ০৯ শতাংশ।

এপ্রিলে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর মূল্যস্ফীতি আবারও ঊর্ধ্বমুখী হয়। ওই মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক ০৪ শতাংশে দাঁড়ায়। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩৯ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক ৫৭ শতাংশে পৌঁছায়। এ সময়ে জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ১৬ শতাংশ।

মে মাসে মূল্যস্ফীতি আরও বেড়ে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে দাঁড়ায়, যা আগের ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। ওই মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক ০৬ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৭১ শতাংশে পৌঁছায়। বিপরীতে জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ২১ শতাংশ।

জুনে মূল্যস্ফীতি আবার কমতে শুরু করে। ওই মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমে ৯ দশমিক ১৬ শতাংশে দাঁড়ায়। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৬০ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৬১ শতাংশে নেমে আসে। এ সময়ে জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ১৮ শতাংশ।

জুনে ১২ মাসের চলমান গড় মূল্যস্ফীতিও কমেছে। ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ১২ মাসে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৬৮ শতাংশ। এর আগের বছরের একই সময়ে, অর্থাৎ ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত এ হার ছিল ১০ দশমিক ০৩ শতাংশ।

জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি আরও কমে আট মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামে। ওই মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়ায় ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমে ৭ দশমিক ১৬ শতাংশে, যা নয় মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি কমে ৯ দশমিক ২৮ শতাংশে দাঁড়ায়। একই সময়ে জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ২২ শতাংশ।

বাড়ছে নিত্যপণ্যের দাম

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার বাজার ঘুরে দেখা গেছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা জানান, আগে প্রতি কেজি চিনি পাইকারিতে ১০০ টাকা দরে কিনে ১২০ টাকায় বিক্রি করতেন। এখন সেই চিনি পাইকারিতেই ১২০ টাকা দরে কিনতে হচ্ছে। ডিমের দামও ১৩০ টাকা থেকে বেড়ে ১৬০ টাকা হয়েছে।

সিদ্ধ চালের দাম বেড়েছে ৫ থেকে ১০ টাকা। পোলাওয়ের চালের দাম আগে ১৭৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৯৫ টাকা হয়েছিল; এখন তা আরও বেড়ে কেজিপ্রতি ২৩০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া গায়ে দেওয়ার সাবান, ডিটারজেন্ট পাউডারসহ প্রায় সব ধরনের নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে।

সবজির বাজারেও একই চিত্র। অধিকাংশ সবজি কেজিপ্রতি ৬০ টাকার নিচে পাওয়া কঠিন। শীতের মৌসুমে শিম ২০ থেকে ৩০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হলেও এখন তা বেড়ে ১৪০ টাকায় উঠেছে। বেগুনের দামও বেড়ে ১৫০ টাকা হয়েছে। তবে আলুর দামে তুলনামূলক কম পরিবর্তন হয়েছে। বর্তমানে প্রতি কেজি আলু প্রায় ৩০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে, যা আগে ছিল ২০ টাকা।

রাজধানীর সবুজবাগ এলাকার মুদি দোকানি শাহ আলম বলেন, ‘এই কয়েক দিনে হঠাৎ করেই বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। আগে কোনো পণ্যের দাম ৫ থেকে ১০ টাকা বাড়ত, এখন প্রায় সব পণ্যের দামই ২০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। আমরা খুচরা ব্যবসায়ী। পণ্যের দাম হঠাৎ এভাবে বেড়ে গেলে ক্রেতারা আমাদের ওপরই ক্ষুব্ধ হন।’

বনশ্রী এলাকার বেসরকারি চাকরিজীবী সাব্বির আহমেদ বলেন, ‘নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব পণ্যের দামই বেড়েছে। শাকসবজি থেকে শুরু করে সাবান, শ্যাম্পু, চাল, চিনি—সবকিছুর দাম বেড়েছে। এভাবে দাম বাড়তে থাকলে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কী হবে? বাজারে পণ্যের দাম বাড়লেও আমাদের বেতন তো বাড়েনি।’

উচ্চ মূল্যস্তরেই আটকে আছে মানুষ

অর্থনীতিবিদ ও বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের নিচে নেমেছে। তবে মূল্যস্তর এখনো অনেক উঁচুতে রয়েছে।

তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতির হার কমার অর্থ এই নয় যে পণ্যের দাম কমেছে। বরং উচ্চ মূল্যস্তরের ওপর নতুন করে মূল্যস্ফীতির হার যোগ হচ্ছে। ফলে মূল্যস্তর আগের তুলনায় উঁচুতেই থাকছে। মজুরি বৃদ্ধির হারের চেয়ে মূল্যস্ফীতি বেশি থাকায় মানুষের জীবনমানের যে অবনমন হয়েছে, তা অব্যাহত আছে।

তাঁর মতে, জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও এতে সাধারণ মানুষের খুব একটা স্বস্তি আসছে না। বিনিয়োগ চাঙ্গা করা, সরবরাহ বাড়ানো এবং বাজার ব্যবস্থাপনা আরও উন্নত করা গেলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে।

কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, গত ছয় মাসে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে বা বেড়েছে—এতে জীবনযাত্রায় খুব বড় প্রভাব পড়েনি। তবে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে পরিবহন ও বিদ্যুতের খরচ বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে দ্রব্যমূল্যের ওপর।

জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি কমার বিষয়ে তিনি বলেন, দেশের পরিসংখ্যানের ওপর মানুষের আস্থা নেই। উৎপাদন, ভোগ বা অন্যান্য বিষয়ে প্রকাশিত পরিসংখ্যানের সঙ্গে অনেক সময় বাস্তবতার মিল পাওয়া যায় না। ফলে মূল্যস্ফীতি কমছে বলা হলেও বাজারে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।

তবে বিবিএসের ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টিং উইংয়ের পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. সাহাবুদ্দীন সরকার বলেন, দ্রব্যমূল্য বেড়েছে—এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বিবিএসের তথ্যেও বিষয়টি প্রতিফলিত হয়েছে।

তিনি বলেন, জুলাইয়ে আগের মাসের তুলনায় খাদ্য মূল্যস্ফীতি ২ দশমিক ৫৭ শতাংশীয় পয়েন্ট বেড়েছে, যা অনেক বেশি। তবে সার্বিক মূল্যস্ফীতি হিসাব করা হয় পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট পদ্ধতিতে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানের তথ্য তুলনা করা হয়। জুলাইয়ের মূল্যস্ফীতি হিসাবের ক্ষেত্রে ২০২৬ সালের জুলাইয়ের সঙ্গে ২০২৫ সালের জুলাইয়ের তুলনা করা হয়েছে। সে হিসাবে মূল্যস্ফীতি কমেছে। তাই এখানে ভুল বা অসত্য তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।