tanaka
প্রচ্ছদসারাদেশডিসেম্বরে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা: রাজনীতি, বিচার ও জবাবদিহির নতুন প্রশ্ন

ডিসেম্বরে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা: রাজনীতি, বিচার ও জবাবদিহির নতুন প্রশ্ন

পতিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর থেকে বিদেশে অবস্থান করা শেখ হাসিনা সম্প্রতি দেশে ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। তবে জুলাই গণআন্দোলনের সময় তার সরকারের ভূমিকা, আন্দোলন দমনে কঠোর অবস্থান, ব্যাপক প্রাণহানি এবং পরবর্তী সময়ে দেশত্যাগের প্রেক্ষাপটে এই প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা নিছক রাজনৈতিক সফর হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিচার, জবাবদিহি এবং তার দীর্ঘ শাসনামলের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের প্রশ্ন।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের রক্তাক্ত স্মৃতি এখনো মানুষের মনে গভীরভাবে রয়েছে। আন্দোলনের সময় সরকারের ভূমিকা নিয়ে যে গুরুতর অভিযোগগুলো উঠেছে, সেগুলোর বিষয়ে শেখ হাসিনার প্রকাশ্য বক্তব্যেও অনুশোচনার প্রশ্নটি বারবার সামনে এসেছে। দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় বিরোধী মত দমন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর চাপ, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহারের অভিযোগও তার শাসনামলের মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে ডিসেম্বরের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন তার জন্য যেমন রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি রাষ্ট্রের জন্যও এটি একটি বড় আইনি ও রাজনৈতিক পরীক্ষা হতে পারে।

জুলাইয়ের হত্যাকাণ্ড ও বিচারের প্রশ্ন

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার প্রসঙ্গে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের সহিংসতার বিচার। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের অনুসন্ধান অনুযায়ী, ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হন। পরবর্তী সরকারি যাচাইয়ে ৮৪৩ জনকে শহীদ এবং ১৪ হাজার ৩৭০ জনকে আহত হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। নিহতদের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে মারা যান। তাদের মধ্যে শিশুও ছিল। অনেকে স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্বের শিকার হয়েছেন, আবার কয়েকশ মানুষ দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন।

প্রতিটি মৃত্যুর সঙ্গে একটি পরিবারের স্বজন হারানোর গল্প জড়িয়ে আছে। প্রতিটি গুরুতর আহত মানুষের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি পরিবারের দীর্ঘমেয়াদি দুর্ভোগ। তাই হতাহতের সংখ্যা শুধু পরিসংখ্যান নয়; এর সঙ্গে রয়েছে বিচার ও দায় নির্ধারণের গভীর দাবি।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ১৯ নভেম্বর পর্যন্ত জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার হত্যার ঘটনায় সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে সারাদেশে ১ হাজার ৭৮৫টি মামলা করা হয়। এর মধ্যে ৮৩৭টি হত্যা মামলা। শেখ হাসিনার নাম আসামি হিসেবে রয়েছে ৬৬৩টি মামলায়, যার মধ্যে ৪৫৩টি হত্যা মামলা।

এই বাস্তবতায় শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তার প্রত্যাবর্তনের সঙ্গে বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রশ্নটি অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত হবে। যারা সন্তান, স্বজন বা শারীরিক সক্ষমতা হারিয়েছেন, তাদের কাছে তার দেশে ফেরা রাজনৈতিক প্রতীকী ঘটনা নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা জবাবদিহির দাবির বাস্তব পরীক্ষা।

দীর্ঘ শাসনামল ও মানবাধিকার বিতর্ক

শেখ হাসিনার প্রায় দেড় দশকের শাসনামল নিয়ে মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতির অভিযোগও দীর্ঘদিনের। এশিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিশনের হিসাবে, ২০০৯ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে ৬২৩ ব্যক্তি গুমের শিকার হন। তাদের মধ্যে ৮৪ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, ৩৮৩ জন জীবিত ফিরে এসেছেন অথবা পরবর্তী সময়ে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। ১৫৩ জন এখনো নিখোঁজ এবং তিনজনের বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

এ ছাড়া বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে শেখ হাসিনার শাসনামলে ২ হাজার ৬১৭ জনের বেশি মানুষের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা কথিত ‘ক্রসফায়ার’ ও ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হওয়ার অভিযোগ উঠে এসেছে। এসব ঘটনায় রাষ্ট্রের দায়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা এবং প্রতিটি ঘটনার স্বতন্ত্র তদন্তের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতাও ছিল বিতর্কের অন্যতম ক্ষেত্র। ২০১৮ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করা হয়, যা পরে সাইবার নিরাপত্তা আইন দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়। ২০১৮ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত এই আইনে ৭ হাজারের বেশি দমনমূলক মামলা দায়েরের তথ্যও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

দুর্নীতি, অর্থপাচার ও ব্যাংকিং সংকট

শেখ হাসিনার শাসনামলের আরেকটি বড় বিতর্কের জায়গা দুর্নীতি ও অর্থপাচার। ২০২৪ সালের শেষ দিকে প্রকাশিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অর্থনৈতিক শ্বেতপত্রে বলা হয়, শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অবৈধভাবে বিদেশে পাচার হয়েছে।

এ ছাড়া যুক্তরাজ্যের Financial Times-এর একটি তথ্যচিত্রে শেখ হাসিনার পুরো শাসনামলে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পাচারের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এসব অর্থপাচারের অভিযোগের প্রকৃত পরিমাণ ও দায় নির্ধারণে যথাযথ আর্থিক তদন্ত প্রয়োজন।

ব্যাংকিং খাতেও দীর্ঘ সময়ে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। ২০২৪ সালে তা বেড়ে প্রায় ১ লাখ ৮২ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়ায়। একই সময়ে এস আলম গ্রুপসহ কয়েকটি বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল অর্থ নেওয়ার অভিযোগ ওঠে।

বড় অবকাঠামো প্রকল্প নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, পদ্মা সেতু এবং বিদ্যুৎ খাতের কুইক রেন্টাল প্রকল্পের ব্যয় ও বাস্তবায়ন নিয়ে বিভিন্ন সময়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। রূপপুর প্রকল্পকে কেন্দ্র করে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার আত্মসাতের অভিযোগও আলোচনায় এসেছে। এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায় নির্ধারণে তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়াই চূড়ান্ত ভিত্তি হতে পারে।

নির্বাচন ও রাজনৈতিক পরিবেশ

২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে নির্বাচন, বিরোধী দলের ওপর দমন-পীড়ন, মানবাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে।

বিশেষ করে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকে গ্রেপ্তার, ভয়ভীতি, দমন-পীড়ন এবং অসম নির্বাচনী পরিবেশ তৈরির অভিযোগ করা হয়। একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচন কেবল ভোট দেওয়ার প্রক্রিয়া নয়। এর সঙ্গে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক সংগঠন করার অধিকার, বিরোধী দলের কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ এবং শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের নিশ্চয়তাও জড়িত।

এসব প্রশ্ন শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে আরও জটিল করে তুলেছে। ফলে তার দেশে ফেরার বিষয়টি শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যাবর্তন নয়; তার শাসনামলের সামগ্রিক মূল্যায়নের প্রশ্নও সামনে নিয়ে আসছে।

ট্রাইব্যুনালের রায় ও দেশে ফেরার আইনি বাস্তবতা

২০২৫ সালের মে মাসে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করা হয়। পরবর্তীতে নির্বাচন কমিশন দলটির নিবন্ধন স্থগিত করে। একই সময়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থান-সংক্রান্ত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনার বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চলতে থাকে।

২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেয়। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত ৪৫৩ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ে অভিযোগ ও আদালতের সিদ্ধান্তের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। শেখ হাসিনা অবশ্য তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং বিচারপ্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনের ২১ ধারায় ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ রয়েছে এবং সাধারণভাবে রায়ের ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করতে হয়। প্রধান প্রসিকিউটর ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে জানিয়েছেন, শেখ হাসিনা নির্ধারিত ৩০ দিনের মধ্যে আপিল না করায় তার আপিলের বিধিবদ্ধ সুযোগ শেষ হয়ে গেছে।

তাই তিনি যদি ডিসেম্বরে দেশে ফেরেন, তার সামনে প্রথম বাস্তবতা হবে আইনি প্রক্রিয়া। বিদ্যমান রায়, গ্রেপ্তার, কারাবাস এবং বিচারিক প্রতিকারের বিষয়গুলো তখন সামনে আসতে পারে। সরকারের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তাকে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে। সরকারের তথ্য উপদেষ্টা জানিয়েছেন, তিনি দেশে ফিরে বিচার মোকাবিলা করলে সরকার তাকে স্বাগত জানাবে এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা হবে।

শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন কি আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তন?

শেখ হাসিনার ব্যক্তিগতভাবে দেশে ফিরে আসা এবং আওয়ামী লীগের রাজনৈতিকভাবে পুনরায় সক্রিয় হওয়া—দুটি আলাদা বিষয়। একজন ব্যক্তির প্রত্যাবর্তনের অর্থ কোনো রাজনৈতিক দলের স্বয়ংক্রিয়ভাবে রাজনৈতিক অধিকার ফিরে পাওয়া নয়।

শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে একদিকে যেমন তার বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোর ভবিষ্যৎ, ট্রাইব্যুনালের রায় এবং বিচারিক প্রতিকারের প্রশ্ন থাকবে, অন্যদিকে আওয়ামী লীগের সামনে থাকবে দলটির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর নিষেধাজ্ঞা, নিবন্ধনের অবস্থা এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার আইনগত প্রশ্ন।

এর পাশাপাশি আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামল নিয়ে ওঠা নির্বাচন, মানবাধিকার, দুর্নীতি, অর্থপাচার, ব্যাংকিং খাত এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির অভিযোগের রাজনৈতিক মূল্যায়নও চলতে থাকবে। ভবিষ্যতে দলটি কীভাবে তার অতীত কর্মকাণ্ডের ব্যাখ্যা দেবে, কী ধরনের সংস্কার ও জবাবদিহির প্রতিশ্রুতি দেবে—সেটিও তার রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

সুতরাং শেখ হাসিনা যদি সত্যিই ডিসেম্বরে দেশে ফেরেন, সেই প্রত্যাবর্তনকে কেবল রাজনৈতিক মঞ্চে ফেরার ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ সীমিত। বরং তার সামনে থাকবে দীর্ঘ শাসনামলের নানা অভিযোগ, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের হত্যাকাণ্ডের বিচার এবং বিদ্যমান আদালতের রায়ের বাস্তবতা। অর্থাৎ এবার তার দেশে ফেরার অর্থ ক্ষমতার কেন্দ্রে ফিরে যাওয়া নয়; বরং রাষ্ট্রীয় বিচার ও জবাবদিহির প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়া।

লেখক: উপ-রেজিস্টার, প্রশাসন ও সংস্থাপন-২, শেকৃবি, ঢাকা।