tanaka
প্রচ্ছদইসলাম ও জীবনঘুষ দিয়ে ঠিকাদারি ব্যবসা করা কি বৈধ?

ঘুষ দিয়ে ঠিকাদারি ব্যবসা করা কি বৈধ?

সরকারি ও বিভিন্ন সংস্থার অর্থায়নে রাস্তা, ব্রিজ, কালভার্টসহ বিভিন্ন নির্মাণকাজের জন্য নির্ধারিত নিয়মে টেন্ডার আহ্বান করা হয়। বৈধ লাইসেন্সধারীরা নির্ধারিত ফি দিয়ে টেন্ডারের ফরম সংগ্রহ করে তাতে অংশ নেন। এরপর লটারি বা নির্ধারিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যোগ্য ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

কিন্তু কোনো কোনো এলাকায় স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা সরকারি নিয়ম অনুসরণ না করে নিজেদের মধ্যে এসব কাজ ভাগাভাগি করে নেন। বাইরে থেকে কেউ টেন্ডারে অংশ নিতে চাইলে তার কাছ থেকে ফরমের মূল্য ও অতিরিক্ত অর্থ নিয়ে কাজ করার সুযোগ করে দেওয়া হয়। অনেক বৈধ লাইসেন্সধারীও এসব ব্যক্তির সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে কাজ নিয়ে তা সম্পন্ন করেন এবং এর বিনিময়ে লাভ করেন।

এখন প্রশ্ন হলো—

১. এভাবে সরকারি নির্ধারিত প্রক্রিয়ার বাইরে স্থানীয় প্রভাবশালীদের মাধ্যমে কাজ গ্রহণ করা কি শরিয়তসম্মত?

২. এভাবে কাজ সম্পন্ন করে অর্জিত লাভ কি হালাল হবে?

শরিয়তের বিধান

ইসলামি শরিয়ত ও দেশের প্রচলিত আইন—উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই ঘুষের মাধ্যমে অবৈধ সুবিধা নেওয়া বৈধ নয়। ঘুষ দেওয়া ও নেওয়া উভয়ই গুরুতর অপরাধ এবং শরিয়তে তা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘুষদাতা ও ঘুষগ্রহীতা উভয়ের ব্যাপারে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন। হাদিসে এসেছে, ‘ঘুষদাতা ও ঘুষগ্রহীতার ওপর আল্লাহর লানত।’

অতএব, সরকারি নির্ধারিত নিয়মকে পাশ কাটিয়ে কাজ পাওয়ার জন্য কিংবা অন্যের প্রাপ্য অধিকার নষ্ট করে কোনো কাজ নেওয়ার উদ্দেশ্যে ঘুষ দেওয়া নিঃসন্দেহে হারাম। একইভাবে প্রভাব খাটিয়ে বা ঘুষ গ্রহণ করে সরকারি কাজ নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়াও শরিয়তসম্মত নয়।

তবে নিরুপায় হয়ে নিজের অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে বিধান

তবে এমন পরিস্থিতি আলাদা, যখন কোনো ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে নিজের ন্যায্য অধিকার পাওয়ার যোগ্য, কিন্তু জুলুম বা অন্যায় বাধার কারণে তা পাচ্ছেন না। নিজের অধিকার আদায় কিংবা জুলুম থেকে বাঁচার জন্য তিনি যদি একেবারে নিরুপায় হয়ে অর্থ দিতে বাধ্য হন, তাহলে কিছু ফকিহের ব্যাখ্যা অনুযায়ী অর্থ প্রদানকারীর ওপর ঘুষের গুনাহ বর্তাবে না। তবে যিনি অর্থ গ্রহণ করবেন, তিনি গুনাহগার হবেন।

এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো—অর্থ প্রদানের মাধ্যমে অন্যের অধিকার হরণ করা যাবে না এবং কোনো অবৈধ সুবিধা নেওয়া যাবে না।

ফিকহের গ্রন্থে বলা হয়েছে—

دفع المال للسلطان الجائر لدفع الظلم عن نفسه، وماله، ولا يستخراج حق له ليس برشوة يعنى فى الدافع

অর্থাৎ, জালিম শাসক বা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নিজের জীবন, সম্পদ বা ন্যায্য অধিকার রক্ষার জন্য বাধ্য হয়ে অর্থ প্রদান করা হলে, প্রদানকারীর ক্ষেত্রে তা ঘুষ হিসেবে গণ্য হবে না—যদি এর মাধ্যমে অন্যের অধিকার হরণ বা অবৈধ সুবিধা নেওয়ার উদ্দেশ্য না থাকে।

—রদ্দুল মুহতার, ৯/৬০৭; আল-বাহরুর রায়েক, ৬/৪৪০-৪৪১; আল-ফাতাওয়াল হিন্দিয়া, ৪/৪৩১

অন্য একটি ফিকহি গ্রন্থে বলা হয়েছে—

أما إذا اعطى ليوتصل به إلى حق، أو ليدفع به عن نفسه ظلما، فلا بأس به

অর্থাৎ, ‘নিজের অধিকার আদায় করার জন্য অথবা নিজের ওপর থেকে জুলুম প্রতিহত করার উদ্দেশ্যে কাউকে কিছু প্রদান করা হলে তাতে কোনো দোষ নেই।’

—মিরকাতুল মাফাতিহ, ৭/২৯৫, হাদিস ৩৭৫৩

ঠিকাদারি কাজের ক্ষেত্রে বিষয়টি কীভাবে প্রযোজ্য?

প্রশ্নে বর্ণিত পরিস্থিতিতে যদি কোনো ব্যক্তি শুধু নিজের বৈধ অধিকার রক্ষার জন্য নয়, বরং সরকারি টেন্ডারের নির্ধারিত প্রক্রিয়া পাশ কাটিয়ে স্থানীয় প্রভাবশালীদের মাধ্যমে কাজ পাওয়ার জন্য অতিরিক্ত অর্থ প্রদান করেন, তাহলে এটিকে নিরুপায় হয়ে অধিকার আদায়ের ঘটনা বলা যাবে না। বরং এটি অবৈধ সুবিধা গ্রহণের পর্যায়ে পড়বে।

বিশেষ করে যদি ওই প্রক্রিয়ার কারণে অন্য কোনো যোগ্য ঠিকাদার তার ন্যায্য সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন, তাহলে বিষয়টি আরও গুরুতর হবে। কারণ এতে ঘুষের পাশাপাশি অন্যের অধিকার নষ্ট করার গুনাহও যুক্ত হয়।

অন্যদিকে, কোনো ঠিকাদার বৈধভাবে কাজ পাওয়ার পর যথাযথভাবে কাজ সম্পন্ন করলে সেই কাজের বিনিময়ে পাওয়া পারিশ্রমিক বা লাভ মূলত হালাল। শুধু কাজের সঙ্গে কোনো অনিয়ম ঘটেছে—এমন কারণে কাজের বিনিময়ে প্রাপ্য বৈধ পারিশ্রমিক স্বয়ংক্রিয়ভাবে হারাম হয়ে যায় না। তবে ঘুষ, প্রতারণা, আত্মসাৎ, নিম্নমানের কাজ বা চুক্তির শর্ত লঙ্ঘনের মাধ্যমে অর্জিত অতিরিক্ত অর্থ বৈধ হবে না।

সংক্ষেপে

  • সরকারি টেন্ডারের নিয়ম ভেঙে প্রভাবশালীদের মাধ্যমে কাজ ভাগাভাগি করে নেওয়া বৈধ নয়।
  • কাজ পাওয়ার জন্য অবৈধ সুবিধা দিতে ঘুষ দেওয়া হারাম।
  • ঘুষ গ্রহণ করাও হারাম এবং গুরুতর গুনাহ।
  • তবে জুলুম থেকে বাঁচতে বা নিজের নিশ্চিত ন্যায্য অধিকার আদায়ে একেবারে নিরুপায় হয়ে অর্থ দিতে বাধ্য হলে, শর্তসাপেক্ষে প্রদানকারীর জন্য তা ঘুষের গুনাহ হিসেবে গণ্য নাও হতে পারে।
  • এই ব্যতিক্রমের সুযোগ নিয়ে অন্যের অধিকার নষ্ট করে কাজ নেওয়া যাবে না।
  • বৈধভাবে পাওয়া কাজ সঠিকভাবে সম্পন্ন করে অর্জিত বৈধ লাভ মূলত হালাল; কিন্তু ঘুষ, প্রতারণা, আত্মসাৎ বা চুক্তিভঙ্গের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ হালাল হবে না।

সুতরাং, নিজের বৈধ অধিকার রক্ষার জন্য নিরুপায় হয়ে অর্থ দেওয়া এবং অবৈধভাবে সরকারি কাজ পাওয়ার জন্য ঘুষ দেওয়া—এ দুটিকে এক করে দেখা যাবে না। ঠিকাদারি ব্যবসায় শরিয়তসম্মত পন্থা হলো স্বচ্ছ ও বৈধ প্রক্রিয়ায় টেন্ডারে অংশ নেওয়া, অন্যের অধিকার নষ্ট না করা এবং ঘুষ-দুর্নীতি থেকে সম্পূর্ণভাবে বিরত থাকা।