আইন, বিচার ও সংসদবিষয়কমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, সরকার মানবাধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে এবং ইতোমধ্যে বেআইনি গ্রেপ্তার ও মামলা বাণিজ্য অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে এসেছে। একই সঙ্গে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার সংস্কৃতি বন্ধে সরকার কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
মঙ্গলবার (১০ মার্চ) রাজধানীর বাংলাদেশ সামরিক জাদুঘর মিলনায়তনে আন্তর্জাতিক নারী দিবস–২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত ‘সকল নারী ও বালিকার জন্য অধিকার, বিচার ও বাস্তবায়ন’ শীর্ষক এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। মানবাধিকার সংগঠন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন এ সেমিনারের আয়োজন করে।
আইনমন্ত্রী বলেন, সরকার জনগণের কল্যাণ, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং নারীর ক্ষমতায়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। এ লক্ষ্যেই সরকার দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ২১ দিনের মাথায় জাতীয় পর্যায়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি চালু করেছে।
তিনি জানান, প্রাথমিকভাবে পাইলট প্রকল্প হিসেবে প্রায় ৩৭ হাজার ফ্যামিলি কার্ড ইস্যু করা হয়েছে। এসব কার্ডের মালিকানা পরিবারের গৃহকর্ত্রী বা নারী সদস্যের নামে দেওয়া হয়েছে, যাতে নারীরা সরাসরি সামাজিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সহায়তার সুবিধা পেতে পারেন।
আইনমন্ত্রী বলেন, নারীর প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ জাগ্রত করা এবং তাদের অধিকার নিশ্চিত করাই এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য। নারীদের অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করা গেলে সমাজে তাদের অবস্থান আরও সুদৃঢ় হবে।
গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় ১১৭টি জনসভায় নারীদের জাগরণের জন্য উদ্বুদ্ধ করার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, নীতিগতভাবে তিনি নারী কমিশন গঠনের পক্ষে। তবে দেশে একের পর এক কমিশন গঠনের ফলে অনেক সময় তাদের দায়িত্বের মধ্যে দ্বন্দ্ব বা ওভারল্যাপ তৈরি হয়, যা কার্যকারিতাকে দুর্বল করে দিতে পারে।
তিনি আরও বলেন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন সম্পর্কিত একটি নতুন অর্ডিন্যান্স জারি হয়েছে, যেখানে গুম তদন্তের জন্য একটি গুম কমিশন অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এতে মানবাধিকার কমিশনকে গুম সংক্রান্ত তদন্তে বেশি সময় ব্যয় করতে হতে পারে, ফলে মানবাধিকার রক্ষার অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে বিষয়টি নতুন করে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে। তবে সরকারের লক্ষ্য স্পষ্ট—দেশে গুমের ঘটনা শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনা।
নারী কমিশনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে আইনমন্ত্রী বলেন, দেশে মৌলবাদী গোষ্ঠীর লক্ষ্যবস্তুতে প্রায়ই নারীরা পরিণত হচ্ছেন। তাই নারীদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করা অত্যন্ত জরুরি। সরকার বিভিন্ন কর্মসূচি ও সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে নারীদের সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। নারীরা সচেতন হলে দেশের উন্নয়ন আরও গতিশীল হবে।
নারীর অধিকার প্রসঙ্গে ব্যক্তিগত উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, তার দুই মেয়ে রয়েছে কিন্তু ছেলে সন্তান নেই। শরিয়া আইনের বিধান অনুযায়ী তিনি যে সম্পদ অর্জন করবেন, তার পুরোটা মেয়েরা উত্তরাধিকার হিসেবে পাবে না। তাই এ বিষয়ে বিকল্প আইনগত ব্যবস্থার বিষয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বেআইনি গ্রেপ্তারের বিষয়ে তিনি বলেন, সরকার ইতোমধ্যে বেআইনি গ্রেপ্তার ও গ্রেপ্তার বাণিজ্যের প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছে। একই সঙ্গে মিথ্যা মামলার সংস্কৃতিও ধীরে ধীরে কমে আসছে। এ ক্ষেত্রে প্রশাসন ও বিচার বিভাগের পাশাপাশি নাগরিক সমাজের সহযোগিতা প্রয়োজন।
দুর্নীতি প্রতিরোধের প্রসঙ্গ তুলে ধরে আইনমন্ত্রী বলেন, সরকারের মন্ত্রী ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা যেন তথাকথিত ‘বেগম পাড়া’ সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন, সে জন্য নাগরিক সমাজকে ওয়াচডগ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে।
তিনি উল্লেখ করেন, টাইম ম্যাগাজিন–এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১৬ বছরে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে। এই অর্থ দিয়ে কানাডা, যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর ও দুবাইয়ে তথাকথিত ‘বেগম পাড়া’ গড়ে উঠেছে। পাশাপাশি মালয়েশিয়ায় ‘সেকেন্ড হোম’ কর্মসূচির আওতায় এবং ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে বিভিন্ন রিসোর্টেও বিনিয়োগ করা হয়েছে।
আইনমন্ত্রী বলেন, বিদেশে অর্থ পাচার বন্ধ করা গেলে এবং সেই অর্থ দেশের উন্নয়ন ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে ব্যবহার করা গেলে নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করা সম্ভব হবে। ফ্যামিলি কার্ডের মতো উদ্যোগের মাধ্যমে নারীরা আর্থিক সহায়তা পেলে তারা অজ্ঞতা ও বৈষম্যের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে এসে নিজেদের অধিকার সম্পর্কে আরও সচেতন হবে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, নারীদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা গেলে তারা মৌলবাদের লক্ষ্যবস্তু থেকেও মুক্ত হবে এবং দেশের সার্বিক উন্নয়ন আরও শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে।
সেমিনারে শাহীন আনাম–এর সঞ্চালনায় আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশে নিযুক্ত সুইজারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত রেটো রেঙ্গলি, এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালক মো. দাউদ মিয়া, বাংলাদেশে জাতিসংঘের নারী প্রতিনিধি গীতাঞ্জলি সিং, জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক আইরিন খান এবং মানবাধিকার সংগঠন বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (BLAST)–এর নির্বাহী পরিচালক ব্যারিস্টার সারা হোসেন।



